মোংলা বন্দরের রাজস্ব আয়ে নতুন রেকর্ড
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০৭
মোংলা বন্দরের রাজস্ব আয়ে নতুন রেকর্ড
মোংলা প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

রাজস্ব আয়, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংসহ বিভিন্ন সূচকে সাফল্য দেখিয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৪৭৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৯ কোটি ৫১ লাখ ২০ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আয় বেড়েছে ৪০৮ কোটি ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা, যা ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি।


মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১ টায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অডিটরিয়ামে বাগেরহাট ও মোংলা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব তথ্য তুলে ধরেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এসব অর্জনের তথ্য জানানো হয়েছে।


বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে মোট ৮১৫টি জাহাজ এসেছে। একই সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন বা ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।


কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ হাজার টিইইউজ। এর বিপরীতে ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউজ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে ৮ হাজার ২৫৮ টিইইউজ বা ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।


এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দর দিয়ে ১২ হাজার ৭৫টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি।


বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে বন্দর ব্যবহারকারী, স্টেকহোল্ডার, শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডরসহ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় ও বৈঠক করছেন। জাহাজ আগমন বাড়ানোর লক্ষ্যে ইন্টারনাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।


বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি ও কার্যক্রমে গতি আনতে বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত সভা করে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকারের নির্দেশনা ও নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনাও বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।


প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর বন্দরের উন্নয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।


একইভাবে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী তিনি বর্তমানে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও রয়েছেন।


মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বন্দরের বার্ষিক জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ হাজার ৫০০টি, কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ লাখ টিইইউজ এবং গাড়ি হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ২০ হাজার ইউনিট।


বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোংলা বন্দরের জন্য সহায়ক জলযান সংগ্রহ, আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট, কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড ও ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম।


সহায়ক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় দুটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার জন্য নির্ধারিত রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রগামী জাহাজ হ্যান্ডলিং, নিরাপদ চ্যানেল ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।


পশুর চ্যানেলের ইনার বারে ড্রেজিং প্রকল্পের মাধ্যমে ৭ দশমিক ৫ মিটার সিডি নাব্যতা অর্জনের লক্ষ্যে ২৩৭ দশমিক ০৬ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে জেটি পর্যন্ত ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সুবিধা সৃষ্টি হওয়ার কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পটির ডিলিস্টিং কার্যক্রম বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।


এদিকে ভারতীয় এলওসি-৩-এর অর্থায়নে আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড, কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ডসহ অন্যান্য সুবিধা সৃষ্টি করা হবে। এসব অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে বন্দরকেন্দ্রিক শিপিং, সিএন্ডএফ, স্টিভেডরিং ও শ্রম খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।


পরিবেশ সুরক্ষায়ও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। মোংলা বন্দর এলাকায় চলাচলকারী বিভিন্ন জলযান ও শিল্পকারখানা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ এবং নিঃসৃত তেল অপসারণের লক্ষ্যে আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুনে শেষ হয়েছে।


এ প্রকল্পের মাধ্যমে জাহাজের বর্জ্য নদী ও সমুদ্রে নিক্ষেপ রোধ, সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষা, সমুদ্রগামী জাহাজের বর্জ্য থেকে সুন্দরবনকে সুরক্ষা এবং পশুর চ্যানেলসহ আশপাশের নদ-নদীকে নিঃসৃত তেলের দূষণ থেকে রক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।


মোংলা বন্দরের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ১৪৪ কিলোমিটার চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ। এ জন্য ক্যাপিটাল ও সংরক্ষণ ড্রেজিং, নিরাপদ ও দূষণমুক্ত পরিবেশবান্ধব চ্যানেল নিশ্চিত করা, পুরোনো সহায়ক জলযান প্রতিস্থাপন, নতুন জলযান সংগ্রহ, বিদ্যমান জলযান ও ইকুইপমেন্ট মেরামতের সুবিধা সৃষ্টি এবং দক্ষ ও পর্যাপ্ত জনবল তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


এর পাশাপাশি বন্দর ব্যবহারকারীদের মোংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করা, মোংলা বন্দরকে ফার্স্ট কলিং পোর্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা, কনটেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং রপ্তানীকৃত পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, এ বন্দর দিয়ে নিয়মিত রপ্তানির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ রয়েছে।


সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বন্দরে মোংলা থেকে ফিডার জাহাজের সরাসরি নিয়মিত চলাচল নিশ্চিত করা এবং খুলনা-মোংলা ও খুলনা-ভাঙ্গা মহাসড়ক কমপক্ষে চার লেনে উন্নীত করার বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে খুলনা-মোংলা রেলপথে পণ্য পরিবহনের জন্য নিয়মিত ওয়াগন ও কনটেইনার পরিবহন সার্ভিস চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।


মোংলা বন্দরের মাধ্যমে বর্তমানে খাদ্যশস্য, সার, গাড়ি, এলপি গ্যাস, লাইমস্টোন, সয়াবিন ও ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেল, জিপসাম, মেশিনারি, কাঠের লগ, কয়লা, পাথর, ক্লিংকার, পামওয়েল, ফ্লাই অ্যাশ, আয়রন, অয়েলসিড ও চিটাগুড়সহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হচ্ছে। অন্যদিকে গার্মেন্টস পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, চিংড়ি, সাদামাছ, শুকনা মাছ, কাঁকড়া, কটন ইয়ার্ন, হিমায়িত সবজি ও অন্যান্য সাধারণ পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।


বন্দর কর্তৃপক্ষের এসব পরিকল্পনা ও চলমান কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


বিবার্তা/জাহিদ/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com