পাঁচ ব্যাংকের অনৈতিক সিদ্ধান্তে অসহায় আমানতকারীরা
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪২
পাঁচ ব্যাংকের অনৈতিক সিদ্ধান্তে অসহায় আমানতকারীরা
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের হিসাব থেকে আগে দেওয়া মুনাফা কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে সংকটে থাকা পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের আমানতকারীরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাদের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা পাবেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অসহায় আমানতকারীরা।


এদিকে, মুনাফা না পাওয়ার খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমানাতকারীরা তাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ কেউ সশরীরে ব্যাংকে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।


আমানতকারীরা জানিয়েছেন, ব্যাংকে আমানত রেখে যেন ভুল হয়েছে। আমরা তো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ব্যাংকেই আমানত রেখেছিলাম।


আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার নামে গভর্নরের দেওয়া বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তারা গভর্নরের পদত্যাগও দাবি করেন তারা।


গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের দুই বছরের মুনাফা ‘হেয়ারকাট’ (আমানতের একটি অংশ কেটে রাখা) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই দিনে এই সিদ্ধান্তের কথা পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসককে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সব আমানতকারীর আমানত হিসাব আবার গণনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


একীভূত পাঁচ ব্যাংক হলো- সেগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজুলেশন ডিপার্টমেন্ট পাঁচটি ব্যাংকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, রেজুলেশন স্কিমের সুষম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সব আমানত হিসাব ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের অবস্থান অনুযায়ী পুনর্গণনা করা হবে। এ পুনর্গণনায় ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য কোনো আমানতের ওপর মুনাফা ধরা হবে না। চিঠিতে আরও বলা হয়, অনুমোদিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজন হলে আমানতের ওপর ‘হেয়ারকাট’ বা কর্তন কার্যকর করা হবে এবং সে অনুযায়ী আমানতের চূড়ান্ত স্থিতি নির্ধারণ করা হবে। রেজুলেশন স্কিম বাস্তবায়ন নির্বিঘ্ন করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুনর্গণনা প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, নিরীক্ষায় দেখা গেছে গত দুই বছরে এই পাঁচটি ব্যাংক কোনো মুনাফা অর্জন করতে পারেনি। এ কারণেই আমানতকারীদের মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নৈতিকতার দিক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কেননা যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় ব্যাংকগুলো লস করার পরও মুনাফা দেয়, তাহলে এর দায় তো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালকদের, যা কোনোভাবেই বিনিয়োগকারীদের ওপর বর্তায় না। এটা একটা অনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা অনেকটা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে অবস্থা। এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করবে। কারণ ব্যাংক হয়তো সব বিনিয়োগকারীকেই মুনাফা দিয়েছিল। এর মধ্যে যারা টাকাটা উঠিয়ে নিয়েছেন অথবা বন্ধ করে দিয়েছেন তাদের কাছ থেকে তো আর কাটার সুযোগ নেই। আর যারা নানাভাবে এখনো বিনিয়োগ বহাল রেখেছেন, তারা জরিমানার শিকার হবেন।


তিনি আরও বলেন, যেহেতু ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত, তাই এই দুই বছরে ব্যাংকগুলো মুনাফার ভিত্তিতে সরকারকে করও দিয়েছে। তাহলে সরকার কি সেটা ফেরত দেবে?


একই বিষয়ে জানতে চাইলে অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নুরুল বলেন, এতে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। এমনিতেই অনেক আমানতকারী নিজেদের জমাকৃত অর্থ নিজেদের প্রয়োজনে তুলতে পারছেন না। তার ওপর তাদের আমানত থেকে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফা কেটে নেওয়া হবে। ফলে তারা মুনাফা থেকেও বঞ্চিত হবেন। আর যারা ইতোমধ্যে আমানত তুলে নিয়েছেন, তাদের মুনাফা তো আর কাটা সম্ভব হবে না। তারা সুবিধাপ্রাপ্ত পেলেন। এখানে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। সব আমানতকারীর জন্য সমান বিচার হচ্ছে না। ব্যাংক রেজ্ল্যুশন অধ্যাদেশের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতাবলে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। রেজল্যুশনে বলা আছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। সেই ক্ষমতাবলেই তারা নানা ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।


এ বিষয়ে এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক শাহানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের তো কিছু করার নেই। আমরা তো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জিম্মি হয়ে গেছি।’ তিনি বলেন, যারা টাকা তুলে নিয়েছেন, তাদেরটা তো আর কেটে নিতে পারবে না। তবে তাদের হিসাব হয়তো নেগেটিভ করে দিতে পারে।


একই ব্যাংকের অপর গ্রাহক মেহনাজ বেগম বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ধীরে ধীরে আমাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমার টাকা ব্যাংকে রেখেও আমি বাবার চিকিৎসার জন্য টাকা তুলতে পারছি না। তারা এখন বলছে আমি ঋণ নিতে পারব। আমি কেন আমার টাকা না তুলে ব্যাংকের ঋণ নেব?’


বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংক পাঁচটি বড় অঙ্কের লোকসান করেছে। এ জন্য আমানতকারীরা এই দুই বছরের জন্য তাদের আমানতের বিপরীতে কোনো মুনাফা পাবেন না। ব্যাংকগুলোতে ৭ থেকে ৯ শতাংশ মুনাফার আমানত রয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে আমানতকারীদের হিসাবে দুই বছরে যে মুনাফা যুক্ত হয়েছে, তা কমে যাবে। আমানতের স্থিতিও কমে আসবে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। তার বিপরীতে এসব ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে।


গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেন, ‘সম্পূর্ণ শরিয়াহ আইন মেনেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমাদের পুনর্মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে শরিয়াহ আইন মেনেই তাদের মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত যে মুনাফা দেওয়া হয়েছে সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ।’


গভর্নরের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমানতকারীরা পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেছেন, গভর্নর কেন ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে হিসাব করছেন? ব্যাংক যদি মুনাফা করতে না পারে তাহলে দুই বছর আমানতকারীদের মুনাফা কীভাবে দিল? সরকার মুনাফার ওপর ট্যাক্স কেটে নিয়েছে। সরকার কি কেটে নেওয়া সেই টাকা ফেরত দেবে? শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে মুনাফা কর্তনের কোনো নিয়ম শরিয়াহ আইনে আছে কি না, তাও জানতে চান তারা।


বঞ্চিত আমানতকারীরা কোনোভাবেই মুনাফা কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন না বলে জানিয়েছেন। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে তীব্র আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন


বিবার্তা/এমবি


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com