কেমন দেশ বারব্যাডোজ
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৮, ১৯:৪৯
কেমন দেশ বারব্যাডোজ
আবু এন. এম. ওয়াহিদ
প্রিন্ট অ-অ+

বারব্যাডোজ যাওয়ার পথে টরেন্টোতে নেমে যখন শাটল ধরার জন্য বাইরে এসে দাঁড়ালাম, তখন ঘড়িতে বাজে রাত ১২টা, আর ঠাণ্ডায় আমার নিজের বাজল বারোর ওপর তেরোটা।


মাথায় উলের টুপি, গলায় স্কার্ফ, পায়ে জুতো তো আছেই, তার ভেতর পুরু গরম মোজা, প্যান্টের নিচে থার্মাল আন্ডারওয়ার, বুকে-পিঠে চারপ্রস্থ কাপড়, এতকিছু নিয়েও থরথর করে কাঁপছি। মার্চ মাসের শেষে টরেন্টোর এই জমে-যাওয়া শীত দেখে আমি তো একেবারে হতবাক!


অপেক্ষা করছি আর ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি - দশ মিনিট, বিশ মিনিট, তিরিশ মিনিট, শাটল তো আর আসে না, অথচ তাদের কথামতো আধঘন্টা পরপর চলার কথা।


আমি স্যুটকেস খুলে আরেকটা সুয়েটার বের করলাম, জ্যাকেট খুলে সেটাও পরলাম, তারপর আবার জ্যাকেট গায়ে চড়ালাম। এমন সময় দেখি একটি মেয়ে গুটিসুটি মেরে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরণে একটা পাতলা ট্রাউজারের সাথে ট্রাভেলস গেঞ্জি। তার মাঝে কোনো অস্থিরতা নেই, তবে ঠাণ্ডায় যে একেবারে কাবু হয়ে আছে তা বোঝা যাচ্ছিল। গোলাপি ঠোঁটযুগল নীল বর্ণ ধারণ করেছে। একটুখানি উষ্ণতা পাওয়ার আশায় আমার গা ঘেঁষে জবুথবু হয়ে আছে। দেখে অবাক হলাম!


প্রায় এক ঘণ্টা পর অবশেষে শাটল এল। পনেরো মিনিটের মধ্যেই হোটেলে পৌঁছে গেলাম - তখন ঘড়িতে প্রায় দেড়টা বাজে। কথা না বাড়িয়ে চেক ইন সেরে কার্ড কী নিয়ে উপরে উঠে গেলাম। তার আগে ভোর সাড়ে পাঁচটায় ওয়েকআপ কলের অনুরোধ জানালাম এবং বললাম, শ্যাল আই ডিপেন্ড অন ইউ? ছেলেটি হেসে বলল, ‘শিওর’।


রুমে গিয়ে দেরি না করে নরম বিছানায় আশ্রয় নিলাম। ঘণ্টাতিনেক পরে সোয়া পাঁচটার দিকে আপনা থেকেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। কাপড়চোপড় পরে বেরিয়ে যাব এমন সময় দরজায় ঠকঠক্ শব্দ, কে যেন বলছে, ‘ওয়েকআপ কল, ওয়েকআপ কল’। ডিজিটাল যুগে এমন ম্যানুয়েল ‘ওয়েকআপ’ কল শুনে হাসি পেল।


এয়ারপোর্টে সময়মতোই এলাম, কিন্তু লাগেজ চেক ইন করতে গিয়ে আরেক ঝামেলায় পড়লাম। এয়ার কানাডার চেক ইন ক্লার্ক আমার কাছে পঁচিশ ডলার ফি চাইল।


আমি বললাম, চেক ইনে দেব না, স্যুটকেসটা আমি সাথে করে ক্যাবিনে নিয়ে যাব।


মেয়েটি বলল, ‘তোমার সঙ্গে কোনো কাঁচি আছে?’


ছোট্ট একখানা আছে বটে, কথাটা শুনেই তার গলায় জোর বেড়ে গেল, ‘ফি দিয়ে চেক ইন করতেই হবে’।


মনে মনে বললাম, পারমাণবিক বোমার পাহাড় গড়েছ, অথচ আড়াই ইঞ্চি একখানা কাঁচিকেও ভয় পাও, এই তোমাদের বাহাদুরি!


বড় ভাবনার মাঝে জরুরি ছোট কথাটা ভুলে গেলাম। কাঁচিটা স্যুটকেস থেকে বের করে ফেলে দিতে পারতাম, তা না করে জরিমানা গুণেই হাজারো যাত্রীর সাথে সিকিউরিটির লাইনে গিয়ে যোগ দিলাম।


এত পেরেশানির পর গেট এরিয়াতে এসে দু’দণ্ড বিশ্রামের সুযোগ পেলাম। সময়মতো বিমানে উঠে দেখি তিন ভাগের এক ভাগ সিট খালি। সিটবেল্টের হলুদ বাতি নিভে গেলে মাঝখানের এক রো-তে হাতা তুলে শুয়েবসে আরাম করে গেলাম। এক সময় ঘুমোবার চেষ্টা করে কোনো ফল পেলাম না। তার আগে আমার সামনের সারিতে বসা এক শ্বেতাঙ্গ নারীর সাথে পরিচয় হলো।


তিনি বারব্যাডোজ-এর নাগরিক। ঔপনিবেশিক যুগে তাঁর পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন ইউরোপ থেকে। ১৯৬৬তে যখন দেশ স্বাধীন হয় তখন তাঁরা আর স্বদেশে ফিরে যাননি, রয়ে গেছেন বারব্যাডোজ-এ। বারব্যাডোজকে ভালোবেসে নিজেদের দেশ করে নিয়েছেন।


জানতে চাইলাম, তাঁর মতো আরো মানুষ এখনো বারব্যাডোজে থাকেন কিনা।


বললেন, ‘অনেক’।


শুনে আমার মনে হলো, এক সময় ভারতবর্ষের ৩০ কোটি মানুষকে শাসন করেছে দু’লাখ ইংরেজ। ১৯৪৭এর পরপরই এদের প্রায় সবাই তো ফিরে গেল সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে। বারব্যাডোজের মতো করে তো তেমন কেউ রয়ে গেল না ভারতে, কিংবা পাকিস্তানে, কিংবা বাংলাদেশে।


বারব্যাডোজ-এ ‘জিকা’ ভাইরাস-এর প্রাদুর্ভাব নিয়ে আমার কিছু ভয় ছিল। ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপে সে ভয় কেটে গেল। তিনি আমাকে অভয় দিলেন।


পাঁচ ঘণ্টার উড়ালে উড়োজাহাজে দু’বার ঠাণ্ডা-গরম পানীয় দেয়া হলো। একবার একটা ভেজিটেবল ফেলাফেল কিনে খেলাম। মনে পড়ল ৩০ বছর আগের কথা। উইনিপেগের ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন মিসরীয় ব্রাদার হেলমির দোকানে প্রথম খেয়েছিলাম ফেলাফেল। সেটা ছিল ফ্রেশ রুটির সাথে তেলে ভাজা গরম গরম তাজা ফেলাফেল, কচি শসা দিয়ে। ওটা ছিল স্বাদে অতুলনীয়! ঠাণ্ডা বাসি খাবারে কি আর সেই মজা পাওয়া যায়!


অবতরণের সময় যখন ঘনিয়ে এল, তখন সিট খালি দেখে এক জানালার পাশে গিয়ে বসলাম, ওপর থেকে বারব্যাডোজকে কেমন লাগে দেখার জন্য।


নিচের দিকে তাকিয়ে গভীর নীল পানি দেখছি, ছোট ছোট ঢেউ, ঢেউয়ের মাথায় সাদা সাদা ফেনা শিং-খাড়া ষাঁড়ের মতো এলোপাথাড়ি ছুটোছুটি করছে।


তাকিয়ে আছি তো আছিই। হঠাৎ মনে হলো পানির তলদেশ থেকে সাগরের বুকে ভেসে উঠল একটা ছোট্ট গ্রাম, নিচে নামছি, দৃষ্টিসীমা প্রসারিত হচ্ছে, বাড়ছে গ্রামের পরিধি, বাড়তে বাড়তে গোটা দেশটাই যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল চোখের সামনে। বিমান মাটি ছুঁই ছুঁই, দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পুরো একটা দেশ আমার নজরে, যেন হাতের মুঠোয়। এমন চাঞ্চল্যকর ও উত্তেজনাপূর্ণ অনুভুতি আগে কখনো হয়নি!


হলেই বা কী? দেখা এক জিনিস আর জানা আরেক জিনিস। যে বারব্যাডোজ আমি মিনিটের মধ্যে দেখে ফেললাম, সে বারব্যাডোজকে, তার মানুষ, সমাজ ও সভ্যতাকে জানতে গেলে আমার বছরের পর বছর সময় লাগবে, চেনাজানা তাও শেষ হবে না। দেখা এবং জানার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক আছে, অনেক সময় তা আমরা বুঝি না; আর বুঝি না বলে কোনো কোনো সময় অসুবিধাও হয়।


ওই সময় আরো মনে হলো সেইন্ট লুশা-র কথা। সেটা আরেকটা ক্যারিবিয়ান দেশ। সেদেশে আমি আগে গিয়েছি। সেটা ঘন জঙ্গল আর উঁচু উঁচু পাহাড়ে ভরা। সে তুলনায় বারব্যাডোজ সমতলে বিছানো একটি দেশ, সামান্য একটু টিলাটক্কর আছে বটে, কিন্তু বনজঙ্গল তেমন একটা নেই।


এ রকম ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি বারব্যাডোজ চোখের সামনে থেকে হারিয়ে গেল, বিমান স্থির হয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট একটি টার্মিন্যালঘর। সবার সাথে লাইন ধরে গিয়ে উঠলাম সে ঘরে। ঝামেলা ছাড়া অতি সহজে ইমিগ্রেশন-কাস্টমস্ পেরিয়ে এলাম।


বাইরে সুন্দর রোদঝলমল দুপুর, তবে ভীষণ গরম। গা থেকে কাপড়-চোপড় একটু কমালাম। গিয়ে উঠলাম ট্যাক্সিতে।


ট্যাক্সি চলছে আর আমি দু’চোখ ভরে দেখছি নতুন দেশ, বারব্যাডোজ। চারদিকে অথৈ সাগর, নীল জল, রাশি রাশি, তবু দেশটা কেন যেন মরুভুমির মত লাগছে। গাছপালা বেশি নেই, নেই ঘাস। আগাছায় ভরা মাঠের পর মাঠ অনাবাদি পড়ে আছে, বৃষ্টির অভাবে তৃণগুল্মের আহাজারি বাতাসকে ভারী করে ফেলেছে। আরব দেশ হলে পানি ছিটাতো, বারব্যাডোজ-এর কি আর সে সামর্থ আছে? পরিবেশবিদদের ভয়, দিয়াশলায়ের একটি কাঠির ঘষা লাগলেই সব পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। এ যেন পানিতে ভাসমান কচুরিপানা, পানিরই অভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।


রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব ভালো নয় - আছে, মোটামুটি। চলতে চলতে এক সময় লোকালয়ে চলে এলাম। হঠাৎ রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভার নামলেন এক দোকানে, আমিও তাঁকে অনুসরণ করলাম। দোকানি এক নারী। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি ভারতীয়?


বললেন তিনি গায়ানিজ।


ভাবলাম, ওই একই কথা। আদম-হাওয়া (আঃ) যখন পৃথিবীতে আবির্ভুত হন, তখন একটা মাত্র ক্ষুদ্র জায়গায় তাঁরা বসত করেন, বংশবিস্তার শুরু করেন। তারপর কালের আবর্তে আদমসন্তানেরা বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত হয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। গড়ে তোলে স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্র। এখানেই শেষ নয়। কোনো এক সময় তারা আবার উন্নত জীবনের সন্ধানে স্ব স্ব দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাতে শুরু করে ভিন্ন ভিন্ন দেশে। এভাবে জনবসতির ওলট-পালট, অদলবদল চলতে থাকে, এবং চলবে অনাদিকাল ধরে, স্রোতের তোড়ে গড়িয়ে যাওয়া নদী-জলের মত। শেষ পরিণতি কী হবে - আল্লাহ্ই মা’লুম।


দোকান থেকে এক বোতল পানি কিনলাম, কলাও নিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পেলাম না। তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই হোটেল র‌্যাডিসনে এসে হাজির।


ট্যাক্সি ড্রাইভারকে তাঁর পাওনা চুকিয়ে দিয়ে বাক্সপেটরা নিয়ে লবিতে গেলাম। চমৎকার লবি এরিয়া। এমন হোটেল-লবি আগে আর কোথাও দেখিনি। দু’পাশটা পুরো উন্মুক্ত। পশ্চিম দিক থেকে সাগরের শিরশিরে শীতল বাতাস বাধাহীনভাবে লবিতে ঢুকে হু হু করে পূব দিকে বেরিয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে সবাই বুক ভরে টেনে নিচ্ছে নির্মল হাওয়া। মনে হলো সফরের সমস্ত ক্লান্তি যেন নিমেষে দূর হয়ে গেল।


রিসিপশন ক্লার্ক জানালেন, আমার রুম রেডি হয়নি। সোফায় বসতে বললেন। কিছুক্ষণের মধ্যে একজন বেয়ারা আমাকে দিয়ে গেল এক গ্লাস ফ্রুটপাঞ্চ। এমন মজাদার পাঞ্চ আমি ইতিপূর্বে কোথাও খাইনি। মনে হলো, যেন যতদিন বারব্যাডোজ থাকব ততদিন বুঝি আর তৃষ্ণা পাবে না।



লবিতে বসে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। সবার আগে যে জিনিসটা আমার দৃষ্টি কাড়লো তা একটি অচেনা বড় ফুল গাছ। গোড়াটা কাঁঠাল গাছের মত একেবেঁকে ওপর দিকে উঠে গেছে, পাতাগুলো ছাতিমের মতন। সবুজের মাঝে সাদা ফুল রোদের আলোয় হীরের মত চমকাচ্ছে। গাছটা যেন লবির ভেতরে ঢোকার জন্য অস্থির হয়ে আছে। শরতের ভোরবেলা যেমন গাছতলায় শেফালি শোভা পায় তেমনি অসংখ্য মাঝারি আকারের সাদা সাদা তাজা ফুল চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে গাছের নিচে। একটা ফুল তুলে দেখলাম মাঝখানটায় হালকা হলুদ রেখা। শুঁকলাম। ঘ্রাণ আছে, তবে গোলাপের মত নয়। লবি থেকে বেরিয়ে মালির কাছে গাছটির নাম জানতে চাইলাম। আমাকে বলল, ‘ডেজার্ট রোজ’, অর্থাৎ মরুগোলাপ।


ঝরেপড়া গোলাপটা হাতে নিয়ে একাকি এক কোণে এসে বসলাম লবির চেয়ারে। খোলা লবি দিয়ে পশ্চিমে নজর গেল সাগরের দিকে। বিশাল নীল জলরাশি। দেখতে দেখতে আঁখি দু’টি ক্লান্ত হয়ে আসে, তবু দৃষ্টি ফেরাবার নয়। ভাবি, কোথাকার মানুষ, কোথায় থাকি, আর বউ-ছেলে-মেয়ে ছেড়ে এখন কতদূর, কোথায় এসেছি! ভাবলাম, আমিও তো জন্মাতে পারতাম ছোট্ট এ দ্বীপদেশে, হতে পারতাম এঁদেরই একজন!


লেখক : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, ইউএসএ


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com