‘অচেনা’ সমুদ্র সৈকতের খোঁজে
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৭:৩৪
‘অচেনা’ সমুদ্র সৈকতের খোঁজে
মোস্তাফিজুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশে সমুদ্র সৈকত ক'টি? উত্তরে বেশিরভাগ মানুষই বলবেন কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, পতেঙ্গা বা কুয়াকাটার নাম। অথচ দেশের পুরো দক্ষিণ দিক জুড়ে রয়েছে বেশ কিছু সমুদ্র সৈকত। সেগুলোর খোঁজেই বেরিয়েছিলাম আমি।


টেকনাফের শামলাপুর, শিলখালি আর হাজামপাড়া – প্রায় গায়ে গা লাগানো এই তিনটি সমুদ্র সৈকত নতুন চালু হওয়া কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পাশ দিয়ে চলে গেছে৷ আগে এ সৈকত তিনটিতে মানুষের বিশেষ আনাগোনা ছিল না৷ অবশ্য আগে তেমন সুযোগ-সুবিধাও ছিল না৷ কিন্তু মেরিন ড্রাইভ চালু হবার পর, এই সৈকতগুলোতেও এখন পর্যটকের ঢল নামে, নিয়মিতই৷


২০০৯ সালে টেকনাফের গেম রিজার্ভে বুনো হাতি দেখতে গিয়েছিলাম। টেকনাফের হোয়াইখং থেকে তৈঙ্গা পাহাড় অতিক্রম করে রাতের অন্ধকারে এসে তাঁবু গেড়েছিলাম শামলাপুর সৈকতের বেলাভূমিতে। ওখানে ছিল হাতির ভয়। কিন্তু এতোই ক্লান্ত ছিলাম যে, হাতির ভয়ও ক্লান্তি তাড়াতে পারেনি। নির্জন সৈকতে খাটানো সেই তাঁবুতে ডুবে গিয়েছিলাম গভীর ঘুমে। এক ঘুমেই রাত কাবার। সকালে ঘুম ভেঙেছিল একদল কৌতূহলী মানুষের হল্লায়।


সেবার শামলাপুর সৈকত মনে ধরেছিল খুব এর পরে তাই কখনো কক্সবাজার গেলেই নানান উৎরাই পেরিয়ে তাই চলে যেতাম জায়গাটিতে। একবার শামলাপুর বেড়াতে গিয়ে দেখা পাই শিলখালি আর হাজামপাড়া সৈকতের। শিলখালি সৈকতে তাঁবুবাসের সুযোগও হয়েছিল। ঘুম ভেঙে দেখেছিলাম তাঁবুর চারপাশটায় লাল কাঁকড়ার দল কিলবিল করছে। হাজামপাড়া সৈকত দেখে তো প্রথমে ভ্রমই হয়েছিল, সেন্ট মার্টিনে এসে পড়িনি তো!


কক্সবাজারে আরো তিনটি অপূর্ব সমুদ্র সৈকত দেখেছি। মানুষজন খুবই কম যান জায়গা দু'টিতে। এর একটি সোনাদিয়া দ্বীপ। যাতায়াত কষ্টসাধ্য বলেই পর্যটকরা তেমন ভেড়েন না ওই দিকে৷ শীতের মৌসুমে ‘স্পিডবোট’-এ সোনাদিয়া যাওয়া যায়। তখনো মহেশখালী চ্যানেল আর সমুদ্রের মোহনায় বিস্তর ঢেউ থাকে। বর্ষা মৌসুমে তো মহেশখালী যাওয়াই বন্ধ হয়ে যায়। মনে আছে ২০০৮ সালে প্রথম গিয়েছিলাম সেই দ্বীপে। ভীষণ নির্জন সৈকতে নাম-না-জানা অসংখ্য পাখির বিচরণ দেখেছিলাম। এরপরও কয়েকবার গেছি দ্বীপটায়।


মহেশখালীর ধলঘাটা সমুদ্র সৈকতের নাম হয়ত শোনেননি অনেকেই।


কক্সবাজার জেলার আরেক দ্বীপ কুতুবদিয়া। সুন্দর দ্বীপ কুতুবদিয়া। দ্বীপটির পশ্চিমপ্রান্ত পুরোটাই সমুদ্র সৈকত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি এখানকার মানুষের জীবনযাত্রাও বিচিত্র। প্রাকৃতির নানা বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে আজন্ম লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর জীবনযাত্রা উপভোগ করা যায় ছোট্ট এই দ্বীপে। আগে অবশ্য হোটেল-রেস্তোরাঁ ছিল না, এখন সেসব হয়েছে। প্রাচীন বাতিঘর, বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শুঁটকি কেন্দ্র, সৈকতজুড়ে ঝাউবনসহ আরো অনেক কিছুই আছে এই দ্বীপে। বন্ধুর বাড়ি থাকার সুবাদে বহু বার যাওয়া হয়েছে জায়গাটিতে। এ সৈকতেও পর্যটকদের খুব-একটা দেখা পাইনি৷


নোয়াখালীর হাতিয়ায় অবস্থিত নিঝুম দ্বীপ। প্রচুর হরিণ দেখা যায় এ দ্বীপের প্যারাবনে। আমিও গিয়েছিলাম হরিণ দেখতে। বনে বনে ঘোরার পর এখানকার সমুদ্র সৈকত দেখে সত্যিই বিমোহিত হয়েছিলাম। নিঝুম দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তজুড়ে বিস্তীর্ণ বেলভূমি। সেখানে লাল কাঁকড়া আর সামুদ্রিক পাখিদের নির্ভয় বিচরণ। নিঝুম দ্বীপের সৈকতে দেখা সূর্যাস্তের সেই মায়াময় রূপ ভোলা সম্ভব নয় কখনোই।


পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে সোনারচর। উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের পানপট্টি থেকে ছোট লঞ্চে চেপেছিলাম তাপসী দ্বীপের উদ্দেশে। পথে আগুনমুখা মোহনার ভয়াবহতা টের পেয়েছিলাম। তাপসী দ্বীপে নেমে ঘণ্টাখানেক হেঁটে পৌঁছেছিলাম সোনারচরে। সৈকতে পা ফেলেই দীর্ঘ ভ্রমণের সব ক্লান্তি ভুলেছিলাম। প্রায় দশ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতে মানুষের দেখা নেই। সদ্য জোয়ারে ধুয়ে যাওয়া বেলাভূমিতে একদল জেলের জাল তোলা দেখে কাছে গিয়েছিলাম। জানতে পেরেছিলাম এ সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত – দু'টোই দেখা যায়।


বরগুনার লালদিয়া সুমদ্র সৈকতও কম সুন্দর নয়। হরিণঘাটা জঙ্গলের শেষ প্রান্তে এই সৈকত। বন ধরে হেঁটে গেলে সমুদ্রে পৌঁছাতে সময় লাগে ঘণ্টা দুয়েক। সৈকতটি খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু সৌন্দর্যের কোনো কমতি নেই।


বাংলাদেশের সুন্দরবন লাগোয়াও বেশ কয়েকটি সমুদ্র সৈকত আছে। নির্জনতা, বাঘের ভয়, সুন্দরী-গড়ান-কেওড়ার জড়াজড়ি মিলিয়ে অন্যরকম এক জায়গা। অতিপ্রাকৃত, অপার্থিব। পক্ষির চর থেকে ডিমের চর, কচিখালী থেকে জামতলা, টিয়ার চর থেকে দুবলার চর আর মান্দারবাড়িয়া থেকে পুটনি দ্বীপ। একেকটি সৈকত যেন একেকটি বিস্ময়।


সুন্দরবনে দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় কাজ করার সুবাধে সবগুলো সৈকতেই যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে, তাও বারবার। কোনো কোনো সৈকতে দিনভর বেড়িয়েছি, অথচ বেশিরভাগ সময়ই কোনো মানুষের দেখা পাইনি।


আমার দেখা বাংলাদেশের এ সব ‘অচেনা' সমুদ্র সৈকতগুলোতে খুবই কম পর্যটকই যান। তাদের না যাওয়ার প্রধান কারণ মনে হয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাব। এসব সৈকতে যাতায়াতব্যবস্থা যেমন খুবই খারাপ, তেমনি অভাব আছে হোটেল-মোটেলেরও। দেশের দক্ষিণ দিকজুড়ে প্রকৃতির অমূল্য দান এসব সমুদ্র সৈকতে পর্যটক টানতে হলে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে। কারণ, উন্নত যাতায়াতব্যবস্থাই পর্যটন উন্নয়নের পূর্বশর্ত। পাশাপাশি হোটেল-মোটেল নির্মাণে এগিয়ে আসতে হবে বেসরকারি উদ্যেক্তাদেরও।


বিবার্তা/হুমায়ুন/সোহান

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com