‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’: এমন একটি বইয়ের জন্যই অপেক্ষা করছিল বাংলাভাষী পাঠকগণ
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:৩৬
‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’: এমন একটি বইয়ের জন্যই অপেক্ষা করছিল বাংলাভাষী পাঠকগণ
অনিকেত রাজেশ
প্রিন্ট অ-অ+

এবারের বইমেলার একেবারে শেষের দিকে একটি বই এসেছে। বইটি পড়তে গিয়ে নিশ্চিতভাবেই মনে হবে, এই বইটিই আপনি পড়তে চাচ্ছিলেন। আর পড়ার পর নিজে থেকে আগ্রহী হয়েই অন্য অনেককে হয়তো এটি পড়তে বলবেন। এটি তেমনই একটি বই। বইটির নাম ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’। লেখক সুজন দেবনাথ।


সাহিত্য, ট্রাজেডি ও কমেডি নাটক, ইতিহাস, গণতন্ত্র, বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা শাস্ত্র এসবের জন্ম কিভাবে হলো সেই গল্প নিয়ে বইটি।


বইয়ের নামটা শুনলেই সক্রেটিসের কথা মনে আসে। সক্রেটিস হেমলক বিষ পানে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। হ্যাঁ, মূল চরিত্র সক্রেটিস। এই উপন্যাসের কোনো চরিত্রই কাল্পনিক নয়। সক্রেটিসের সাথে আছেন তার প্রধান শিষ্য দার্শনিক প্লেটো; ইতিহাসের জনক হেরোডটাস; ট্রাজেডি নাটকের তিন পিতা– সফোক্লিস, ইউরিপিডিস এবং এস্কিলাস; কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফানিস; চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক হিপোক্রাটিস এবং সক্রেটিসের স্ত্রী জেনথিপি।


যারা ইউরোপীয় সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করেছেন, তাদের এই উপন্যাসে রক্ত-মাংসে জীবন্ত করেছেন লেখক। এটি সুজন দেবনাথের প্রথম উপন্যাস। তিনি তিন বছর এথেন্সে থাকার সময় গ্রিসে ক্লাসিকাল সময়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখেছেন খ্রিস্টের জন্মের আগের পঞ্চম শতকটি। এই শতকেই সক্রেটিস বেঁচে ছিলেন। পৃথিবীর জ্ঞানের জগতের অনেক কিছুর শুরু এসময়। সেই শুরুর কথাই স্যাটায়ার আর উইট মিশিয়ে একটিমাত্র সুখপাঠ্য গল্পে নিয়ে এসেছেন সুজন দেবনাথ। নাম দিয়েছেন ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’।


কয়েকজন প্রতিভাবান মানুষ অদ্ভুত এক পাগলামি শুরু করেছিল। তাদের পাগলামিতে মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে জন্ম হয়েছিল সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণতন্ত্র, চিকিৎসা, দর্শনসহ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় সবকিছু। অন্ধকার থেকে জন্ম নিয়েছিলো আলো। এটি ঘটেছিল প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। এথেন্স নামের ছোট্ট একটি শহরে। তাদের সেই পাগলামি আর আলোর জন্মকথা একটি মাত্র গল্পে নিয়ে এসেছেন সুজন দেবনাথ। গল্পের নাম ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’।


এই গল্পে সক্রেটিস দুষ্টুমি আর রসিকতায় সুন্দর জীবনের কথা বলছেন। সেই রসিকতা থেকেই প্লেটো শিখছেন দর্শন, শিখছেন জীবনের মানে। তাদের কথা থেকে জন্ম নিচ্ছে দর্শন, জন্ম হচ্ছে জ্ঞান। একইসাথে সক্রেটিস তুমুল প্রেমিক মানুষ। তিনি স্ত্রীর সাথে খুনসুটি করছেন, করছেন তুমুল ঝগড়া। চুপিচুপি গল্প করছেন সময়ের সবচেয়ে বুদ্ধিমতী মেয়ে আসপাশিয়ার সাথে। এক বয়সী নারীর কাছে শিখছেন - প্রেম কি জিনিস। আসামী হয়ে দাঁড়িয়েছেন আদালতে। শান্তভাবে চুমুক দিচ্ছেন হেমলক পেয়ালায়। প্লেটো খুঁজে পাচ্ছেন-শরীরের আকর্ষণ ছাড়া সাধু সন্ন্যাসী ধরণের এক প্রেম। যার নাম প্লেটোনিক প্রেম। রাগে দুঃখে কবি প্লেটো তার কবিতা, নাটক সব পুড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি কবি থেকে হয়ে যাচ্ছেন কঠিন এক দার্শনিক। প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবি-সাহিত্যিকদের নির্বাসন দিচ্ছেন। এভাবে গল্পের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে খুলে যাচ্ছে মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান শুরুর ঘটনা।


সাহিত্য এবং নাটকের জন্মের কাহিনী লেখক নিয়ে এসেছেন অনেক সাবলীলভাবে। মহাকবি হোমার কিভাবে তার ইলিয়াদ ও অডিসি বই দুটি লিখলেন, আর এ দুটো মহাকাব্যের মধ্য দিয়েই তিনি কিভাবে ইউরোপীয় সাহিত্যের মূলধারাটি তৈরি করে দিলেন, সেটিও গল্পের মধ্য দিয়ে বলা যায়, তা এই বইতে লেখক দেখিয়েছেন। হোমারের সময় ছাড়িয়ে থিয়েটার এবং ট্রাজেডি ও কমেডির নাটক কিভাবে শুরু হলো সে বিষয়টি উঠে এসেছে গল্পে। এই বইতে ট্রাজেডি নাটকের জনক এস্কিলাস মঞ্চে অভিনয় করছেন ‘প্রমিথিউস বাউন্ড’। সফোক্লিস লিখতে বসলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ট্রাজেডি নাটক 'রাজা ইদিপাস'। তিনি কেন লিখলেন ইদিপাস? তার চোখে কে ইদিপাসের মতো ব্যাভিচারী? সে হলো এথেন্সের গণতন্ত্রের প্রধান মানুষ পেরিক্লিস। পেরিক্লিসকে মানুষের কাছে ইদিপাস হিসেবে তুলে ধরছেন নাট্টকার। পেরিক্লিস বিয়ে করতে পারেননি সময়ের সবচেয়ে বুদ্ধিমতী নারী আসপাশিয়াকে? অথচ তাদের সন্তান আছে। এই ব্যাভিচারের জন্যই তিনই ইদিপাস। তার পাপেই এথেন্স ধ্বংস হবে। নাট্টকার ইউরিপিডিস একটি গুহায় বসে লিখছেন নাটকের ‘ট্রয়ের মেয়েরা’। কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফানিস লিখছেন সক্রেটিসকে নিয়ে প্রহসন নাটক ‘মেঘ’।


পৃথিবীতে ইতিহাস লিখা কিভাবে শুরু হলো, সেটি এই বইতে নিঁখুতভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। ইতিহাসের জনক হেরোডটাস এথেন্সে আসছেন। তিনি লিখতে শুরু করেছেন - পৃথিবীর প্রথম ইতিহাস বই। শুরু হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম রক্তপাতহীন লড়াই - অলিম্পিক গেমস। অলিম্পিক গেমসে গিয়ে হেরোডটাস বলছেন ম্যারাথন যুদ্ধের কথা। তিনি এথেন্সেই প্রকাশ করছেন পৃথিবীর প্রথম ইতিহাস বই। বিজ্ঞানের জনক থেলিস বের করছেন - পৃথিবীর প্রথম যুক্তি। পিথাগোরাস বের করছেন জ্যামিতির সূত্র, গোল্ডেন রেশিও। সেসব ব্যবহার করে স্থপতি ও ভাস্কর ফিডিয়াস ডিজাইন করছেন দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর ভবন পার্থেনন। নগর পরিকল্পনা শাস্ত্রের জনক হেপোডেমাস বের করলেন প্রথম গ্রিড প্লান নির্ভর নকশা। চিকিৎসাবিদ্যার জনক হিপোক্রাটিস প্রথমবারের মত ঘোষণা দিচ্ছেন - দেবতার অভিশাপ নয়, রোগের কারণ - মানুষের শরীর, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ; তিনি শুরু করছেন পৃথিবীর প্রথম চিকিৎসা বিদ্যালয়, ছাত্রদের নিয়ে লিখছেন হিপোক্রাটিক কর্পাস, বের করছেন ডাক্তারদের জন্য 'হিপোক্রাটিক শপথ', চিকিৎসা বিষয়ক আইন।


এথেন্সের মানুষ আবিষ্কার করছে গণতন্ত্র। একটি পাহাড়ের উপরের বসছে পৃথিবীর প্রথম সংসদ। সেখানে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের উচ্চারিত হচ্ছে সমান অধিকারের কথা, আইনের শাসনের কথা। সক্রেটিস যাচ্ছেন সেই গণতন্ত্র দেখতে। তার ভালো লাগছে না। তার ভাল না লাগাটা ছড়িয়ে পড়ছে প্লেটোর মধ্যে। কিছু মানুষের স্বার্থে হত্যা করা হলো সক্রেটিসকে। তিনি হলেন জ্ঞানের জগতের প্রথম শহীদ।


এই পুরো বিষয়গুলোকে একটি গল্পে নিয়ে এসে লেখক যে সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, সেটি এককথায় অনন্য। বাংলা ভাষায় এরকম কাজ আগে হয়নি। গ্রিসের পুরো ক্লাসিকাল সময়কে একটি বড় উপন্যাসে ধারণ করা, আগে কখনও হয়নি। শুধু বাংলা ভাষায় নয়, যে কোনো ভাষায়ই একাধারে সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, গণতন্ত্র, চিকিৎসা শাস্ত্রের জন্মের বিষয় নিয়ে উপন্যাস বিরল।


আমি যতোই বইটি পড়েছি, ততোই মনে হয়েছে, এমন একটি বইয়ের জন্যই অনেক বছর অপেক্ষা করছিল বাংলাভাষী পাঠকগণ। যতদূর জানি – বইমেলায় পাঠকগণ অনেক আগ্রহের সাথেই গ্রহণ করেছে বইটিকে। অন্বেষা প্রকাশনে বইটি এসেছে একুশে ফেব্রুয়ারির দিন। সেই থেকেই প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পাঠক বইটি কিনছেন। মননশীল, রুচিশীল পাঠকেরা যে ভালো বই খোঁজেন, সেটি আবারো প্রমাণ হলো।


বইটি পড়তে গিয়ে প্রতি পাতায় লেখকের পরিশ্রম আর মুন্সিয়ানা টের পাওয়া যায়। সুজন দেবনাথ থিয়েটার শুরুর গল্প বলেছেন থিয়েটারের ঢঙে। ট্রাজেডি রচয়িতাদের মঞ্চে এসে নিজেরাই দেখাচ্ছে –কিভাবে ট্রাজেডি লেখা শুরু হয়েছে। আমি যেটিতে অবাক হয়েছি – সক্রেটিসকে আমরা যেরকম রাশভারী, গম্ভীর দার্শনিক মনে করি, এই বইয়ের সক্রেটিস মোটেও তা নয়। সে রক্ত-মাংসের মানুষ। সে পথে চলতে চলতে মানুষকে পিন দিচ্ছে, তার কথায় কথায় আইরনি, প্রতি বাক্যে স্যাটায়ার। মজা করে কঠিন কঠিন কথা বলছেন। তার মজা মানতে পারছে না অনেকে। তার শত্রু হয়ে যাচ্ছে। লেখক যেভাবে প্রতিটি ঘটনার খুঁটিনাটি তুলে এনেছেন, তাতে মনে হয় – উনি বুঝি সক্রেটিসের আদালতে ছিলেন।


বইটির নামের ব্যাপারে লেখক পরিচিতিতে একটি সুন্দর কথা বলা আছে। সেই সক্রেটিসের সময় থেকেই যারাই জ্ঞানের জন্য আত্মনিয়োগ করেছেন, তারাই কোনো না কোনোভাবে ভয়াবহ বিপদে পড়েছেন। তাদের জন্য অজান্তেই প্রস্তুত হয়েছে এক পেয়ালা হেমলক। যারা অজানাকে জানতে চেয়েছেন, তারাই হেমলকের নিমন্ত্রণ পেয়েছেন। তবু পথ ছাড়েননি পৃথিবীর জ্ঞান পিপাসুরা। হেমলকপ্রেমীরাই পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। বাংলাভাষী সব হেমলকপ্রেমীদের জন্য সুজন দেবনাথের উপন্যাস ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’।


আমারও মনে হয়েছে – বাংলাভাষী সব জ্ঞানপ্রেমীদের জন্য একটি দারুণ জিনিস নিয়ে এসেছে ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’। কালের সীমাকে জয় করে এই বইটি যে একটি জায়গা করে নিবে তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এমন কিছু বইয়ের জন্যই পাঠকরা অপেক্ষা করেন।


বিবার্তা/জাহিদ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com