একজন প্রফেশনাল থেরাপিস্টের স্বপ্নযাত্রা
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:০৬
একজন প্রফেশনাল থেরাপিস্টের স্বপ্নযাত্রা
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

পরিবার ও সমাজ অনেক ক্ষেত্রে একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে (প্রতিবন্ধী) বোঝা মনে করে।কেউ কেউ আচার-ব্যবহার দিয়ে এমন শিশুদের মনে কষ্ট দিয়ে থাকে। আবার কেউ তাদের অবহেলা, অবজ্ঞা করে। অসম্মান করে। এমনকি অনেক সময় পরিবারের সদস্যরাও তাদের মনের কষ্টগুলো তেমনভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না। নিজের একটা পা কিছুটা দুর্বল হওয়ায় ছোটবেলায় সমাজের মানুষের কাছ থেকে এই ব্যবহার পেয়েছেন তিনি।


সমাজের আরো পাঁচজন বিশেষ শিশুরা যেনো এই বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার না হয় সেই লক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দীর্ঘদিনের লালিত সেই ইচ্ছে পূরণ হয় পরিণত বয়সে। এখন তার নিজের একটা স্কুল আছে। জীবনে আলোর মুখ দেখাচ্ছেন অসংখ্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের। পেয়েছেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিও।


বলছিলাম ‘পজেটিভ থিংকিং সার্ভিসেস ফর স্পেশাল নিডস চিলড্রেন’ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং আত্মপ্রত্যয়ী নারী অকুপেশনাল থেরাপিস্ট নুরুন্নাহার নুপুরের কথা। তার অকুপেশনাল থেরাপিস্ট হয়ে উঠার পেছনে রয়েছে অনেক কাঠখড় পুড়ানোর গল্প।


গ্রামের বাড়ি ভোলায় হলেও স্বপ্নের রাজধানী ঢাকায় জন্ম নুপুরের। বাবা পেশায় ছিলেন একজন ব্যবসায়ী (মৃত)। মা ছিলেন গৃহিনী (মৃত)। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট নুপুর।


রাজধানীর মোহাম্মদপুর গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও বাংলাদেশ রাইফেলস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল ফ্যাকাল্টির আন্ডারে সাভারের সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি) প্রতিষ্ঠান থেকে অকুপেশনাল থেরাপিতে বিএসসি অনার্স এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।



খুব ছোটবেলায় পোলিও রোগের কারণে নুপুরের বাম পা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন অন্য পাঁচটা সাধারণ শিশুর মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা, দৌড়ানো, ছোটাছুটি করতে অসুবিধা হতো। তবে তিনি যে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ সেটা তিনি নিজেই জানতেন না। সময়ের সাথে সাথে সমাজের মানুষ তাকে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে। সবাই তাকে আলাদাভাবে দেখতে ও ভাবতে শুরু করে। সবার কাছে নুপুরের শারীরিক ভিন্নতাই মুখ্য ছিলো।


নিজের অক্ষমতার বিষয়ে আক্ষেপ করে নুপুর বলেন, যখন বুঝতে পারি আমি সবার মতো না। আমার শারীরিক ভিন্নতা আছে। সবাই আমাকে একটু ভিন্ন চোখে দেখে। বিষয়টা আমাকে ভাবাতো। অন্যদিকে বাবা-মা আমাকে সুস্থ করার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান, থেরাপি দেন, নানা ধরনের চিকিৎসা চালিয়ে যান। একটা অপারেশনও করান। তখন আমি ভাবতাম এরা সবাই ডাক্তার। বড় হয়ে আমাকেও এরকম একজন ডাক্তার হতে হবে, যাতে শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসা করতে পারি। কেননা নিজের জীবন দিয়েই উপলব্ধি করতে পারি এই ধরনের শিশুদের মনে কতো কষ্ট! কারণে-অকারণে মানুষ আমাকে ল্যাংড়ি বলছে। আমার নাম ধরে কেউ আর ডাকছে না। তখন আমার মনে হয়েছে বড় হয়ে আমি যদি ১০টা বাচ্চাকে এই অবস্থা থেকে বের করে আনতে পারি তাহলেই আমার জীবন স্বার্থক। তখন কল্পনায় ছিলো বড় হয়ে ডাক্তার হবো।


নুপুরের পায়ের অপারেশনের কারণে ক্লাস ওয়ানের বার্ষিক পরীক্ষা আর দেয়া হয়ে উঠেনি। তবে পরের বছরে তাকে ডাবল প্রোমশন দিয়ে ক্লাস টুতে নেয়া হয়। এরপর ক্লাস টু থেকে টিচারদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হয়। তারা ভাবেন যে, ওর যেহেতু পায়ে সমস্যা, তার মানে মাথায়ও সমস্যা রয়েছে। টিচারদের এই মনোভাব তার জন্য তখন অনেক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কীভাবে বোঝাবেন যে তার পায়ের সমস্যার সাথে তার বুদ্ধিমত্তার কোনো সম্পর্ক নেই। অন্য সব ছাত্রীদের মতো তারও হোম-ওয়ার্কের খাতায় ‘ভেরিগুড’ মন্তব্য পেতে ইচ্ছে করে। লেখাপড়া করতে তার ভাল লাগে। তার সক্ষমতা প্রমাণ করতে বেশি পড়াশোনা করে ভাল রেজাল্ট করতে হয়েছে।


ধীরে ধীরে শিক্ষকদের মনোভাব বদলাতে লাগলো। এ বিষয়ে নুপুরের ভাষ্য, পরে যখন আমি পরীক্ষায় ভালো করছি, ভালো কবিতা আবৃত্তি করছি, তখন স্কুলে পরিদর্শকরা আসলে ওই শিক্ষকরাই তাদের কাছে আমার সুনাম করতেন। আমাকে দিয়ে আবৃত্তি করাতেন। ধীরে ধীরে স্কুলের সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামে অভিনয়, আবৃত্তি, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ্রগ্রহণ করা শুরু করি। পুরস্কারও পেতে শুরু করি। পুরো স্কুলটাই আমাকে সব দিক থেকে সাপোর্ট দেয়া শুরু করে।


ক্লাস সেভেন পর্যন্ত তার টার্গেট ছিলো ডাক্তার হওয়ার। টিচাররাও বলতেন নুপুর একদিন তুই খুব ভাল ডাক্তার হবি। তোর মধ্যে অনেক মায়া আছে। সায়েন্স বিভাগ থেকে এইচএসসি পাসও করেন আত্মপ্রত্যয়ী এই কিশোরী। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পালা। বাড়ি থেকে বলা হলো মেডিকেলে পরীক্ষা দাও। তখন তিনি বেঁকে বসেন। বলেন না, আমি ডাক্তার হতে চাই না। তখন তিনি বুঝতে পেরেছেন যে প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কাজ শুধু ডাক্তাররাই করেন না। আরো অনেক প্রফেশনালরা আছেন। তখন বাবা-মা বললেন, তুমি তো ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার হতে চেয়েছো। এখন হবা না কেনো? তার সোজাসাপ্টা জবাব আমি অকুপেশনাল থেরাপিস্ট হতে চাই।


থেরাপিস্ট হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সিআরপিতে ভর্তি পরীক্ষা দেন নুপুর। সিআরপি প্রতিষ্ঠার পর সেখানে শুধু একটা ব্যাচ অকুপেশনাল থেরাপি নিয়ে ডিপ্লোমা শেষ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ওই বছরেই তারা বিএসসি স্টুডেন্ট নিয়েছে। লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষা ভালো দিয়েও অনেকটা যুদ্ধ করেই ভর্তি হতে হয় তাকে। শুরু হয় অকুপেশনাল থেরাপি নিয়ে বিএসসি-এর যাত্রা।


কেনো ফিজিওথেরাপির বদলে অকুপেশনাল থেরাপি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন? জবাবে নুপুর জানালেন, ওই সময়ে সারাদেশে ফিজিওথেরাপি খুব বেশি জনপ্রিয় না হলেও মোটামুটি প্রচলন ছিলো। আমি ক্লাস এইট থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছি, যেমন- এসএআরপিভি, সিডিডি ইত্যাদি। ওই সময়ে লড়া ক্রাফটিং নামে একজন কানাডিয়ান সিডিডিতে কাজ করতেন। তিনি একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট। উনি প্রথম এ দেশে অকুপেশনাল থেরাপির পাঠ্য কারিকুলাম তৈরি করেছেন। আমার সবচেয়ে কাছের ও প্রিয় মেন্টর, বন্ধুতুল্য বড় আপা আনিকা রহমান লিপিও সিডিটিতে কাজ করতেন। আমি উনার কাছে যেতাম আর ট্রান্সলেশনের কাজ করতাম। ওখানে লড়া ক্রাফটিংয়ের কাজ, জীবনাদর্শ, মূল্যবোধ দেখে আমি মন স্থির করি যে ফিজিওথেরাপিস্ট না হয়ে অকুপেশনাল থেরাপিস্ট হবো।





সিআরপিতে অকুপেশনাল থেরাপি নিয়ে পড়ালেখা করতে গিয়ে জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলে যায় নুপুরের। তার ভাষ্য, আমি হাতে-কলমে কাজের জায়গাটা যেমন শিখেছি, তেমনি এই পেশার জন্য ব্যক্তিমানুষের জায়গাটাতেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমি তৈরি হয়েছি, আমার দৃষ্টিভঙ্গি, কাজের ধরণেরও বদল হয়েছে।


সিআরপি থেকে অনার্স শেষ করার সাথে সাথেই তাকে মিরপুরের সিআরপির ব্রাঞ্চে শিশু বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেখানে শিশু বিভাগটা চালু করে এটাকে পরিপূর্ণ বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিলো তার কাজ। অনার্স পড়ার সময়ে ভলান্টিয়ার হিসেবে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজও করেছেন। সে অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে আন্তরিক চেষ্টা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সেটা পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করে। এরপর আরেকটি বিশেষ স্কুলে কাজ করেছেন। সেখানে নতুন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা হয়েছে। কাজ করলেও মনের যেনো তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না।


নিজ থেকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য কিছু করার ভাবনা আসে মাথায়। একজন বিশেষ শিশুর জন্য যে উপযুক্ত শিক্ষা ও সেবা সেটা দিতে গেলে সেটা তাইকে বানাতে হবে। কী সেটা। ভাবতে থাকেন। তখন মাথায় আসে ‘পজেটিভ থিংকিং’ বিষয়টি। নামটা সুন্দর। কাজের সাথে বিষয়টাও চমৎকার। তখন বিশেষ শিশুদের স্কুলিং, থেরাপি, সোশ্যাল বিহেভিয়ার এই সব কিছু মিলিয়ে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার পরিকল্পনা করেন আত্মপ্রত্যয়ী এই থেরাপিস্ট।


২০০৪ সালের দিকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য যেসব স্কুলগুলো ছিলো সেগুলো ছিলো ডে-কেয়ারের ধারণার বা পদ্ধতির। যেমন- বাচ্চারা স্কুলে আসবে, খাবে, খেলাধুলা করবে, যে যতটুকু লিখতে পারে, লিখবে। কাগজ কেটে এটাসেটা বানাবে। নির্দিষ্ট সময়ের পরে তারা বাসায় চলে যাবে। এই ধারণাকে ছাপিয়ে নতুন ধারার অকুপেশনাল থেরাপিটিক বেইজড স্কুল চালু করার পরিকল্পনা করেন তিনি। ২০০৫ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রস্তুতি নেন। ২০০৯ সালে স্বপ্নবাজ এই উদ্যোক্তা নিজের অর্থায়নে দেশে প্রথমবারের মতো চালু করেন অকুপেশনাল থেরাপিটিক বেইজড স্কুল। এর পরে যেসব থেরাপিটিক স্কুল হয়েছে সেগুলো তার ধারণার আদলে করেছে।


পজেটিভ থিংকিং সার্ভিসেস ফর স্পেশাল নিডস চিলড্রেন হলো আটিজম ও অন্যান্য নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার আক্রান্ত শিশুদের জন্য পরিচালিত একটা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সার্বিক উন্নয়ন এবং শিশু ও অভিভাবকদের সন্তুষ্টিই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান লক্ষ্য। এখানে যেসব সেবা দেয়া হয়ে থাকে সেগুলো হলো, সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য অ্যাসেসমেন্ট, করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দেয়া, বিশেষ স্কুল সেবা, সাধারণ প্রি-স্কুল ব্যবস্থা, সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণ, যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণ (ভাষাগত ও ইশারা), আচরণগত দক্ষতা প্রশিক্ষণ, প্রত্যহিক কাজে দক্ষতা প্রশিক্ষণ, বৃত্তিমূলক কাজ প্রশিক্ষণ, নিয়মিত সেনসুরি ইন্টিগ্রেশন থেরাপি সেবা, হোম ভিজিট, ঢাকার বাইরে ক্লায়েন্টদের জন্য প্যাকেজ প্রোগ্রামের ব্যবস্থা, বিশেষ শিক্ষা পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, ভ্রমণ ও নিয়মিত বনভোজনের ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ উপকরণ ও সহায়ক উপকরণ সরবারহ, উইকেন্ড স্কুল ব্যবস্থা (যেসকল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু সাধারণ স্কুলে যায় তাদের জন্য স্পেশাল ক্লাস), গবেষণা পরিচালনা এবং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা।





অকুপেশনাল থেরাপি হলো একটি বিজ্ঞান সম্মত চিকিৎসা যা একজন ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত সমস্যা দূর করার মাধ্যমে তাকে দৈনন্দিন কাজে যথাসম্ভব স্বর্নিভর করার লক্ষ্যে চিকিৎসা সেবা দেয়া। অকুপেশনাল থেরাপি চিকিৎসা সেবা সে সকল রোগীদের জন্য প্রয়োজন যাদের দৈনন্দিন জীবনের কাজ কর্ম কোন না কোন ধরণের প্রতিবন্ধকতার কারণে যেমন শারীরিক অক্ষমতা বা বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশজনিত সমস্যার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।


নুপুরের ভাষ্য, অকুপেশনাল থেরাপিস্টরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের যেমন- অটিজম, অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার-অ্যাকটিভ ডিস-অর্ডার বা এডিএইচডি, ডাউন সিনড্রোম, সেরিব্রাল পালসি, স্পাইনা বাইফিডা, বাঁকানো পা বা ক্ল্যাব ফিট, গুলেন বারি সিনড্রোম বা জিবিএস, মেনিনজাইটিস, এনসেফালাইটিস ইত্যাদির চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন। একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট প্রথমে পর্যবেক্ষণ করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে রোগ শনাক্তকরণ, শিশুর মেডিক্যাল ইতিহাস বা জন্ম নেওয়ার আগে গর্ভাবস্থায় মায়ের শারীরিক অবস্থা এবং জন্মের পর থেকে শিশুর বিকাশজনিত বিভিন্ন সমস্যার বিস্তারিত ইতিহাস, শারীরিক বিকাশ, বুদ্ধিগত বিকাশ, শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টের মুভমেন্ট, হাতের ছোট ছোট মাংশপেশির শক্তি, শরীরের বড় বড় মাংসপেশির শক্তি, শরীরের বিভিন্ন অনুভূতি যেমন, দেখা, শোনা, ধরা, ঘ্রাণ, স্বাদ ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করা। এ ছাড়া খাবার খাওয়ার দক্ষতা, যোগাযোগের দক্ষতা ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন।


থেরাপিস্টরা চিকিৎসার মাধ্যম হিসেবে খেলাকে ব্যবহার করে থাকেন। খেলার মাধ্যমেই থেরাপিগুলো দেওয়া হয়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক করার জন্য অকুপেশনাল থেরাপিস্টরা বিভিন্ন ধরনের টেকনিক অবলম্বন করেন। ফলে শিশু সঠিকভাবে খেলনা ধরতে ও ছাড়তে শেখে। এই থেরাপিতে লেখার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রাক-লেখার দক্ষতার ধাপগুলো আয়ত্ত করা হয়, যার মাধ্যমে শিশু হাত দিয়ে লিখতে শেখে।


শিশুকে দৈনন্দিন কাজগুলো যেমন- খাওয়া, গোসল করা, টয়লেট করা, জুতা পরা, জামা পরা ইত্যাদি কাজ অ্যাকটিভিটি অ্যানালিসিসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শিশুকে খারাপ আচরণের পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের পজিটিভ আচরণ শেখানো হয়। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণগুলোর পরিবর্তন হয়। যেমন- যে শিশু অন্যকে আঘাত করে, সেই শিশু যদি বাসায় ছোট ছোট কাজে অংশগ্রহণ ও উৎসাহ দেওয়া হয়, তাহলে তার এই আচরণগুলো পরিবর্তন হবে ধীরে ধীরে। অকুপেশনাল থেরাপিস্ট শিশুকে নিজের হাত দিয়ে খাবার খাওয়া, লেখা ইত্যাদি শিখিয়ে দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি যেমন- চামচ, গ্লাস, চিরুনি ইত্যাদির মাধ্যমে নিজে নিজে কাজ করার দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে থাকেন।


নুপুর দেশের বিভিন্ন জেলায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর অভিভাবকদের ট্রেনিং দিয়েছেন। সেইসাথে কয়েকটা স্কুল প্রতিষ্ঠায় ভূমিকাও রেখেছেন। সিডিডি ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যে স্কুলটি আছে সেটির শিক্ষকদের ট্রেনিং করেছেন তিনি। ওই স্কুলটির অবকাঠামো নির্মাণে পুরো পরিকল্পনা করেন তিনি। স্কুলের বাচ্চাদের অভিভাবকদের ট্রেনিং করেছেন। একইভাবে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বেশ কয়েকটি স্কুলের প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন এখন সেগুলো স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে।


বিশেষ স্কুলের প্রতি মানুষের মনোভাব বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নেগেটিভ। সাধারণ মানুষেরা এই স্কুল সম্পর্কে বেশি জানেন না। বিশেষভাবে চাহিদাসম্পন্ন অভিভাবকদের স্পষ্ট ধারণাই নাই যে এখানে কী করা হয়, কী শিক্ষা দেয়া হয়, এখানে বাচ্চা দিলে কী উপকার হবে, কতটুকু প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এটা শুধু যাদের বাচ্চা বিশেষভাবে চাহিদাসম্পন্ন তারাই এই স্কুল সম্পর্কে জানেন। এদের মধ্যেও বেশির ভাগ অভিভাবকরা ভাল জানেন না। তাদের মধ্যে বিষয়গুলো জানানোটাই একটা বিশেষ চ্যালেঞ্জ, বললেন অদম্য থেরাপিস্ট নুপুর।


একজন প্রফেশনাল থেরাপিস্টের বিশেষ গুণ নিয়ে নুপুর বলেন, একজন প্রফেশনালের বড় গুণ হলো তার কাজে প্রতি বিশ্বাস, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা। কেউ যদি মন থেকে স্থির করেন যে এই বাচ্চাকে চিকিৎসা দিলে কিছুই হবে না। তাহলে হবে না। কারণ তিনি চেষ্টা করবেন না। আর কেউ যদি বিশ্বাস করেন যে, না এই বাচ্চার জন্য আমি চেষ্টা চালিয়ে যাবো, ওর মধ্যে কিছু হলেও পরিবর্তন আসবে। তাহলে আসবে। যেমন- আমাদের এখানে ১৩ বছরের বাচ্চা থেরাপি দেয়ার পরে ১৭ বছরে কথা বলতে সক্ষম হয়। তাহলে আমি যদি বিশ্বাসটা ছেড়ে দিতাম যে ওকে দিয়ে হবে না। ওর তো ১৩ বছর হয়ে গেছে। তাহলে তো এটা সম্ভব হতো না।


জীবনের প্রাপ্তি নিয়ে তিনি বলেন, আমার জীবনের অনেক বড় কোন প্রাপ্তি নাই। তবে ব্যক্তিগত জায়গায় অনেক বড় প্রাপ্তি আছে। মানুষ হিসেবে আমি নিজে সফল। নিজেকে নিয়ে সন্তোষ্ট আছি। যা হতে চেয়েছি, করতে চেয়েছি সেটা সফলভাবে করেছি, হয়েছি। এটাই আমার জন্য বড় প্রাপ্তি। এছাড়া দীর্ঘদিন একটা বাচ্চা স্কুলে থেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক হওয়ার পর যখন একজন অভিভাবক এসে বলেন, আপা, আমাদের বাচ্চাকে নিয়ে এখন অনেক ভাল ও সুখে আছি, এটা যে আমার কাছে কত বড় প্রাপ্তি, সেটা বলে বোঝাতে পারবো না। সেইসাথে ২০১৬ সালে মালয়েশিয়াতে বিশ্বের ১৫২টি দেশ থেকে আসা ইমারজিং লিডারদের সামনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছি। ইল্যাল্ডের রাজকুমারী প্রিন্সেস এন এর পৃষ্ঠপোষকতায় এই প্রজেক্টটা পরিচালিত হয়। উনার আমন্ত্রণে আমি সেখানে অংশগ্রহণ করি।





২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডের স্কলারশিপ পেয়েছি। সাউথ অস্ট্রেলিয়ার ফ্লিন্ডারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্পেশাল এডুকেশনে মাস্টার্স সম্পন্ন করে ২০২০ সালে দেশে ফিরে কাজ শুরু করেছি। করোনার সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর পরিবারগুলোকে অনলাইনে সেবা দিয়েছি। বর্তমানে আমার জেলাভিত্তিক অভিভাবকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগকে আস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ড বাংলাদেশ সমর্থন দিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা এবং সিলেটে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হবে। ভবিষ্যতে দেশের ৬৪টি জেলায় অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা আছে। এই পুরো প্রজেক্টটা আমার একটি স্বপ্ন ছিলো। সেটিও এখন বাস্তবে রুপ নিচ্ছে। এটাও একটা আমার অর্জন।


নুপুরের অবসর কাটে থেরাপি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণামূলক বই পড়ে, গান শুনে, রান্না করে এবং নতুন নতুন জায়গায় ভ্রমণ করে। নতুন জায়গায় নতুন মানুষের সাথে মিশে, গল্প করে মানুষের কৃষ্টি-সংস্কৃতি জেনে সময় কাটাতে ভীষণ ভাল লাগে তার। থেরাপি নিয়ে লেখালেখিও করছেন নিয়মিত। পরে সেগুলো বই প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।


বাংলাদেশে দুই কোটির বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিকতার শিকার। এই বিশাল জনগোষ্ঠির চিকিৎসা ও পুনবার্সন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট আছেন মাত্র ২৪৬ জন। প্রতি ৬৪ হাজার রোগীর জন্য একজন চিকিৎসক। যা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এজন্য থেরাপিস্টদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পদ সৃষ্টি এবং উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার। থেরাপি নিয়ে আরো বেশি বেশি করে গবেষণা করা দরকার। যত বেশি গবেষণা হবে এ সেক্টরের জন্য তত বেশি সুফল বয়ে আনবে বলে বিশ্বাস নুপুরের।


তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি সব শিশুরই শেখার দক্ষতা রয়েছে। আর যোগ্য ও দক্ষ থেরাপিস্টরাই পারেন দেশের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবর ফিরিয়ে দিতে। আমি আমার ‘পজেটিভ থিকিং’ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সে চেষ্টাই করে যাচ্ছি। স্কুলটি বড় করার পরিকল্পনা আছে। সবার আন্তরিক চেষ্টা ও সহযোগিতা পেলে সেটা করবোই।


বিবার্তা/গমেজ/শাহিন/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com