নৃত্যশিল্পী হয়েও দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তা প্রণামী চৌধুরী রাত্রি
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২১, ২১:০৪
নৃত্যশিল্পী হয়েও দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তা প্রণামী চৌধুরী রাত্রি
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ছেলেবেলায় জীবন নিয়ে সবারই একটা রঙিন স্বপ্ন থাকে, কিছু চাওয়া থাকে। যেমন, কারো ইচ্ছে থাকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কেউ বা হতে চায় উকিল বা পাইলট। তবে বড় হওয়ার সাথে সাথে এই ইচ্ছেগুলোর রঙও বদলায়। সময় ঠিক করে দেয় তাকে ক্যারিয়ার হিসেবে কোন বিষয়টা বেছে নিতে হবে। প্রণামী চৌধুরী রাত্রির জীবনেও ঠিক তাই ঘটেছে। শৈশবে তার ইচ্ছে ছিল ‘নৃত্যশিল্পী’ হওয়ার। সে ইচ্ছে বাস্তবায়নে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে সাধনাও করছেন। ‘নৃত্যশিল্পী’ হয়েছেনও। তবে সময় তার জীবন চলার পথ কিছুটা বদলে দিয়েছে। সৃষ্টিশীলতার নেশা তাকে করে তুলেছে দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তা।


বলছিলাম চট্টগ্রামের দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তা ‘বিচিত্রা’র স্বত্বাধিকারী প্রণামী চৌধুরী রাত্রির কথা। তিনি আজ সফল উদ্যোক্তা। এর পেছনে রয়েছে আরো অনেক গল্প। সে গল্পই আজ শোনাবো বিবার্তার পাঠকদের।


প্রণামী চৌধুরী রাত্রির জন্ম বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রামেই কাটে তার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের দিনগুলো। বাবা পেশায় গাড়িচালক। মা গৃহিণী। পরিবারের চার বোনের মধ্যে রাত্রি তৃতীয়।


পতেঙ্গা সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে দর্শন বিভাগে অনার্স পাস করেছেন রাত্রি। এবার তার লক্ষ্য নৃত্যকলা বিভাগে স্নাতক পড়ার।


জীবনের লক্ষ্য নিয়ে রাত্রির ভাষ্য, জীবনে কী হবো এই প্রশ্নের উত্তর ছোটবেলায় সহজ ছিল। সময়ের পরিবর্তনে দিনে দিনে আমার ইচ্ছাগুলোও বদলাতে শুরু করে। বড় হয়ে বুঝেছি ছোটবেলায় যা হতে চেয়েছি তার অধিকাংশ ইচ্ছাই এখন আমার নেই। যে ইচ্ছাগুলো বেঁচে ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল একজন ‘ভালো মানুষ হওয়া’। অন্যের যেকোনো বিপদে যেন সাহায্য করতে পারি সে মানসিকতা ও যোগ্যতা আমার মধ্যে তৈরি হয়। মনেপ্রাণে এটাই চাইতাম। ‘নৃত্যশিল্পী’ হওয়া তেমনই একটা ইচ্ছা ছিল। যেটা বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে অনুশীলন করে যাচ্ছি। আর নিজের একটা আলাদা পরিচয় দাঁড় করানোর লক্ষ্য ছিল। যা আমার ইচ্ছাগুলোকে বাস্তবায়ন করেছে।


ছোটবেলা থেকেই শৈল্পিক কাজের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল রাত্রির। ক্রাফটিংয়ের কাজ শুরু সেসময় থেকেই। সময়ের পালাবদলে স্কুল, কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন তখন শখ করে নিজের জন্য পছন্দের গয়না বানানো শুরু করেন। আর সেগুলো পরতেন। বেশ ভালোই হতো কাজগুলো। বন্ধ-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা এসব কাজ দেখে প্রশংসা করতেন। এভাবে নিজের উপরে আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে তার। ধীরে ধীরে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করেন। পরিকল্পনা করে গয়নার উপকরণ কিনে দীর্ঘ এক বছর শুধু নিজের জন্যই গয়না বানিয়েছেন তিনি। সময়ের সাথে সাথে মানুষ কেমন মডেল, স্টাইলের গয়না পছন্দ করেন সেগুলো গবেষণা করে অত্যাধুনিক মডেলের গয়না বানান। যখন নিজের বানানো কাজে সন্তুষ্ট হন, তখন ভাবেন এটাকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় কিনা। ভাবেন পরীক্ষামূলক বিচিত্র ধরনের কাজ করে যখন দক্ষতা অর্জন করেছি তখন এ দক্ষতাটাকে পুঁজি করে অনলাইনে কিছু একটা শুরু করলে নিশ্‌চয় মন্দ হবে না। সেই চিন্তা থেকে নিজের কাজগুলো অনলাইনে বিক্রি এবং দেশীয় ঐতিহ্যকে সবার কাছে নতুনভাবে প্রেজেন্ট করতে ফেসবুকে পেজ খুলেন। নাম দেন ‘বিচিত্রা’ (Bichitraa)।


দেশীয় গয়না দিয়ে শুরু হয় রাত্রির উদ্যোগ ‘বিচিত্রা’র যাত্রা৷ তিনি বলেন, আমার সিগনেচার পণ্য শীতলপাটির গয়না, যা বাংলাদেশে আমিই প্রথম বানিয়েছিলাম৷ শীতলপাটির ফিউশন ওয়ার্ক আমার অন্যতম কাজ। শীতলপাটির লুডুবোর্ড, দাবা বোর্ড, বুক মার্ক, আয়না, বাক্স, হাতপাখাসহ অনেক ফিউশন এনেছি। ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বাড়াই। শুরু করি দেশীয় কাপড় দিয়ে বাচ্চাদের অন্নপ্রাশনের পোশাকের কাজ। এছাড়া বিচিত্রার নিজস্ব ডিজাইনের শাড়ি রয়েছে। আরো রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের দ্রব্যাদি যা কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। কাঠের কলম থেকে শুরু করে কাঠের ট্রে পর্যন্ত বিচিত্রায় পাওয়া যায়। রিক্সাপেইন্টের সানগ্লাস বিচিত্রার জনপ্রিয় পণ্য। সানগ্লাস ছাড়াও রিক্সাপেইন্টের অসংখ্য কাজ বিচিত্রায় রয়েছে।


দুনিয়ায় এত কিছু রেখে উদ্যোক্তা হলেন কেন? রাত্রি বলেন, আমি ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছিলাম সেদিক দিয়েই যেখানে কাজ করে আনন্দ পাবো। যে কাজে আত্মতৃপ্তি আছে সেটাকেই আমি পেশা হিসেবে নিয়েছি। নিজের সৃষ্টিশীলতাকে সবার সামনে নিয়ে আসতে আমি উদ্যোক্তা হয়েছি। আর ই-কমার্স বেছে নেয়ার অন্যতম কারণ ছিল কম পুঁজি। আমার উদ্যোগ ২০০০ টাকা দিয়ে শুরু হয়েছিল। এত অল্প পুঁজিতে আমি অফলাইনে কাজ করতে পারতাম না। দোকান খরচসহ নানাবিধ খরচ আমি বহন করতে পারতাম না। তাই আমার কাছে ই-কমার্স সহজ মনে হয়েছিল। শুরুটা এফ-কমার্স দিয়েই। বর্তমানে বিচিত্রার নিজস্ব ওয়েবসাইট রয়েছে। ওয়েবসাইটটি দেখতে যেকেউ যেতে পারেন এই ঠিকানায় https://www.bichitraa.com/?fbclid.


শূন্য থেকে কোনো উদ্যোগকে একটা প্লাটফর্মে দাঁড় করাতে একজন উদ্যোক্তাকে অনেক প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। রাত্রিকেও একই পথে হাটতে হয়েছে। শুরুটা তার খুব কঠিন ছিল। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য চিন্তা-ভাবনা করার পর সেটাকে পরিকল্পনা করে কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন সেটা তিনি জানতেন না। এসব কাজে পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। উদ্যোক্তা সেক্টরের কারো সাথে পরিচয়ও ছিল না। অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনার জন্য যেসব প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকনিক্যাল জ্ঞান প্রয়োজন তা তিনি অনলাইনে পড়াশোনা করে অর্জন করেছেন। দিনে পণ্য বানিয়ে আবার অসংখ্য রাত জেগে অক্লান্ত পরিশ্রম করে অনলাইনে ব্যবসার জ্ঞান অর্জন করে কার্যক্রম শুরু করেছেন।


রাত্রি বলেন, উদ্যোক্তাদের সংগ্রামের জীবন। শুরু থেকেই সংগ্রাম ছিল। সংগ্রাম আজো করে যাচ্ছি। যতদিন থাকবো সংগ্রাম করে যেতে হবে। তবে পারিবারিকভাবে আমি সর্বোচ্চ সাপোর্ট পেয়েছি। তারা আমাকে মানসিকভাবে এই সময় সাপোর্ট দিয়েছিল। আমার বন্ধুরা, প্রিয়জন, শুভাকাঙ্ক্ষীরা এই সংগ্রাম অনেক সহজ করে দিয়েছেন৷


উদ্যোক্তাদের ব্যবসার শুরু থেকেই নানান চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। আর একজন নারী উদ্যোক্তাকে এর চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হয়। এ বিষয়ে রাত্রি বলেন, যেহেতু আমি নিজস্ব ডিজাইনে কাজ করি, তাই আমাকে প্রতিটা কাজে এক্সপেরিমেন্ট করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে ৬ মাসও লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময় শ্রম, অর্থ দিতে হয়। ফলাফল অনেক ক্ষেত্রে আশানুরূপ হয় না। সেটাকে আবার করার জন্য রিস্ক নিতে হয়৷ পণ্য ডেলিভারির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় বেশি। সঠিক সময়ে পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়া, কুরিয়ারে যেন প্রোডাক্ট ভেঙে না যায় তার জন্য মজবুত প্যাকেজিং, সাথে দেখতে আকর্ষণীয় হয় সেদিক মাথায় রেখে প্যাকিং করতে হয়। অনেক সময় গ্রাহক পণ্য হাতে পেতে পেতে ভেঙে যায়, তখন সেটার একটা সমাধান দেয়াও চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ে।


গ্রাহকের কাছে দেয়া কমিটমেন্ট ঠিক রাখতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ করেছেন রাত্রি। তিনি বলেন, এমনো অনেক দিন গেছে, কোনো কারণে পিকাপম্যান পার্সেল পিক করতে পারেননি, কিন্তু পার্সেল আর্জেন্ট পৌঁছাতে হবে। তখন নিজেই ডেলিভারিম্যানের কাজটা করেছি। বেশিরভাগ সময় লোকেশন জানা থাকতো না, ঠিকানা খুঁজে বের করা যে কতটা কঠিন কাজ তা এই কাজ করতে গিয়েই বুঝেছি। নারী হিসেবে অপরিচিত জায়গা রিস্কি হয়ে যায়। তাও নিজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা যতটুকু পেরেছি তা দিয়ে কাজ সম্পন্ন করেছি। সকালে বের হয়েছি উদ্যোগের কাজে। বাসায় এসেছি রাতে। এদিকে সারাদিন খাওয়া হয়নি কিছুই। রেস্ট না করে রাত জেগে পরদিনের কাজ করেছি। ঘুমিয়েছি ২-৩ ঘন্টা। প্রচণ্ড গরমে, অতি বৃষ্টিতেও বাইরে কাজ করে গেছি। এক চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করতেই নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। আমার নিজস্ব ডিজাইন, সিগনেচার পণ্য, কন্টেন্ট এসব যখন কপি হয় তখন মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যেতাম। নিজেকে শক্ত করে আবারো এগিয়ে গেছি। সিগনেচার পণ্যটাও কপি করা বাদ দেয়নি অনেকে। তাদের এসব অসাধু কাজকে অতিক্রম করে নতুন কাজ করে যাওয়াটাও ছিল চ্যালেঞ্জ।


নারী উদ্যোক্তাদের জনপ্রিয় অনলাইন প্লাটফর্ম উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই) গ্রুপে এসে আমি আমার নিজের কাজ তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছি। লাখো মানুষের সামনে নিজের সৃজনশীলতাকে দেখানোর সুযোগ পেয়েছি৷ এখান থেকে আমার যে কাস্টমার বেইস তৈরি হয়েছে সেটা সত্যি খুব আনন্দের আমার জন্য। এমন সুন্দর প্ল্যাটফর্মে দেশীয় পণ্যের কথা তুলে ধরতে ভাল লাগে। ধন্যবাদ নাসিমা আক্তার নিশা আপুকে এত সুন্দর দেশীয় পণ্যের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয়ার জন্য, বললেন রাত্রি।


রাত্রি শুধু যে উদ্যোক্তা হিসেবে দেশীয় পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন তা নয়। হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে নাচের নেশা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তাই চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ছাত্র পরিষদে শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত নাচও শেখান। এর আগে খুলসি স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড স্পোর্সেও শিক্ষক নাচ শেখাতেন। সেই সাথে শেখ হাসিনা ডিজিটাল ল্যাব চট্টগ্রামেও ল্যাব কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।