
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ ব্যয়, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দায়িত্ব পালন এবং সরকারি ওষুধ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলীসহ দপ্তরের কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন স্থানীয় খামারি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে খামারিদের সেবা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মীকে হাসপাতালে বসিয়ে পশুর চিকিৎসা করানো হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসার নামে অর্থ আদায় এবং সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভবন ও স্থাপনা উন্নয়নের জন্য অধিদপ্তর থেকে ৪ লাখ টাকা ও ২০২৫/২৬ অর্থবছরেও একই প্রকল্পে আরও চার লাখ টাকা মোট আট লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, দুই অর্থবছরের বরাদ্দের বিপরীতে দৃশ্যমান কাজের মধ্যে রয়েছে একটি ক্ষতিগ্রস্ত দেয়াল পুনর্নির্মাণ, আরেকটি দেয়ালে রং করা এবং কর্মকর্তার নিজস্ব কক্ষের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা।
এ ছাড়া উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে ৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই অর্থে ভ্যাকসিন ক্রয়, দপ্তরে সামনের খাদে মাটি ভরাট ও প্রাচীন একটি গাছের গোড়ায় বৃত্তাকার বসার স্থান তৈরি করা হয়েছে। তবে বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবায়িত কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পের প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার দেখতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলীর ভাষ্য, ‘সরকারি বরাদ্দের টাকা যথাযথ খাতে ব্যবহার করলে অনেক কিছুই করা যায় না। আমার কক্ষটি ব্যবহার অনুপযোগী ছিল, প্লাস্টার খসে পড়ত। এ কারণে ইন্টেরিয়রের কাজ করিয়েছি। কিছু কাজ করিয়েছি, যা একান্ত প্রয়োজন ছিল, কিন্তু এ খাতে বরাদ্দ পাওয়া যায় না। এ সবই এলাকার সাধারণ মানুষের স্বার্থে। এগুলো তো আমি বাড়িতে নিয়ে যাব না।’
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দায়িত্ব হলো খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, পশুপাখির পরিচর্যায় সহায়তা করা এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা। কিন্তু বোয়ালমারীতে এসব কর্মীর কয়েকজনকে নির্ধারিত এলাকার পরিবর্তে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে বসে পশুর চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত রাখার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় খামারি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, দুর্গম চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির পরিচর্যা এবং খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা থাকলেও কয়েকজন কর্মী নিয়মিত মাঠে যাচ্ছেন না।
তাদের কেউ কেউ হাসপাতালে আসা পশুর চিকিৎসায় সহায়তা করছেন, আবার কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকল্পের নির্ধারিত কার্যক্রম কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পকর্মীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার এখতিয়ার, তাদের পেশাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক খামারি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ‘লাইভস্টক ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর’ পদে কর্মরত কায়কোবাদ হোসেন অফিসের আশপাশের ঘাস মারা ওষুধ ছিটানো নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে নির্ধারিত এলাকায় দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে বসে পশুর চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, এই কর্মীর দায়িত্ব বোয়ালমারী উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের লংকারচর গ্রাম ও সংশ্লিষ্ট চরাঞ্চলে সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু তিনি সে দায়িত্ব পালন না করে ছাগলের বাচ্চা খাসি করাসহ আনুষঙ্গিক চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। দেখা যায়, ছাগলের বাচ্চা খাসি করার বিনিময়ে তিনি ৫০ থেকে ১০০ টাকা নিচ্ছেন সরকারি পশু চিকিৎসা সেবা নিতে আসা মানুষের নিকট থেকে। তিনি নিজেকে পশুচিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একজন সেবা গ্রহীতার হাতে কায়কোবাদ হোসেনের দেওয়া নিজের নামে ছাপানো একটি ভিজিটিং কার্ড দেখা যায়, তাতে ‘সকল প্রকার পোষা প্রাণীর ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা করা হয়’ এমন তথ্য রয়েছে।
জামাল হোসেন নামে এক যুবক জানান, সরকারি বরাদ্দের ওষুধ ব্যবহার করে তিনি মাঠপর্যায়ে পশুর চিকিৎসা করেন কিন্তু তার স্বীকৃত পশুচিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো সনদ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কায়কোবাদ হোসেন বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজি হননি। নিজের দায়িত্ব ও কাজের ধরন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমি কোনো কথা বলব না। আপনি স্যারের কাছে জানেন।’
একপর্যায়ে তিনি জানান, ‘ইউএলও স্যার যেভাবে বলেন, আমি সেভাবেই চলি। তিনি যদি ঘরে আগুন দিতে বলেন, আমি সেটাই করব।’
কায়কোবাদ ছাড়াও অফিসে থেকে ‘প্রাণিপুষ্টির উন্নয়নে উন্নত জাতের ঘাস চাষ সম্প্রসারণ ও লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর’ প্রকল্পে কর্মরত মো. আলীমুজ্জামান আলীর বিরুদ্ধেও দায়িত্বের বাইরে পশুর চিকিৎসাসেবা দেওয়া ও অর্থ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানা, প্রায় আড়াই বছর ধরে প্রকল্পে কর্মরত আলীমুজ্জামান গত তিন মাস ধরে গবাদিপশুর চিকিৎসা দিচ্ছেন। এ জন্য তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে অর্থ নেন। হাসপাতালে অসুস্থ গবাদিপশু নিয়ে আসা কয়েকজন খামারি জানান, কায়কোবাদ ও আলীমুজ্জামান দুজনই নিজেদের ‘ডাক্তার’ হিসেবে পরিচয় দেন।
একটি বেসরকারি ভেটেরিনারি প্রতিষ্ঠানে বিপণন কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেন মো. আনোয়ার হোসেন। পাশাপাশি তিনি উপজেলার ময়না ইউনিয়নের চরবর্নি ও মুরালিয়ারচর এলাকায় হাঁস-মুরগির পরিচর্যার দায়িত্বে রয়েছেন। সরকারি প্রকল্পে কর্মরত থাকার পাশাপাশি তিনি কিভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ করেন এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
তবে একই সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি মূলত প্রকল্পে কাজ করি। তবে ইউএলও স্যারের নির্দেশে অফিসে আসা পশুর চিকিৎসায় সহায়তা করি।’ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু কিছু পশুর চিকিৎসা করেন বলেও স্বীকার করেন তিনি।
একদিকে যেমন মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের অফিসে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে অপর দিকে খোদ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাসহ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সময় মতো অফিসে না আসার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেবা গ্রহীতা অনেকের দাবি, নির্ধারিত সময়ে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিসে পাওয়া যায় না। অফিস টাইমেও তাদের ফোন করলে প্রাইভেট প্রাকটিস বেরিয়ে পড়েন অনেকে। সকাল ৯টায় অফিসে গিয়ে দেখা যায় আব্দুস সবুর নামে একজন কর্মচারী ছাড়া আর কেউ উপস্থিত নেই এবং দুপুর দেড়টার পরও কয়েকজনকে পাওয়া যায় নাই ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১১টি পদের বিপরীতে ভেটেরিনারি সার্জন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ড্রেসার ও এফএআই পদে জনবল রয়েছে। দপ্তরটিতে কম্পাউন্ডার পদে জনবল নেই। অন্যদিকে, ড্রেসার মো. আবুল খায়ের চার-পাঁচ মাস আগে অবসরে গেলেও তার নামে বরাদ্দ থাকা হাসপাতালের দোতলার আবাসিক কক্ষে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অবস্থান করছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলী জানান, ‘হাসপাতালের দোতলায় তিনটি কক্ষ রয়েছে, যেগুলো ডরমিটরি হিসেবে ব্যবহারের জন্য। এই মুহূর্তে কক্ষগুলো ফাঁকা। এ কারণে আপাতত আমি সেখানে থাকি।’
ক্যাস্ট্রেশন করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলী বিবার্তাকে বলেন, ‘সব হাসপাতালেই ক্যাস্ট্রেশন করে টাকা দেওয়া-নেওয়ার একটা প্রচলন আছে। এখানেও আছে। তবে সেবাগ্রহীতারা স্বেচ্ছায় দেন। যদিও আমি নিষেধ করেছি।’ কায়কোবাদ হোসেনের অর্থ গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, ‘সে আগে নিত, এখন নেয় না।’
অন্যদিকে, দপ্তরে জনবলসংকটের কথা উল্লেখ করে শওকত আলীর ভাষ্য, ১১টি পদের বিপরীতে আটটি পদ শূন্য রয়েছে। এ কারণে বাধ্য হয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দিয়ে দাপ্তরিক কাজ চালাতে হয়। উন্নয়ন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি জানান- বুঝেন তো প্রয়োজনের তাগিদে ভিন্ন খাতেও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত গাড়ি মেয়াদ শেষে ফেরত না দিয়ে ব্যবহারের অভিযোগের ব্যাপারে তিনি জানান - পাঁচ বছর মেয়াদি এলডিডিপি প্রকল্পের মেয়াদ গত ৩১ মার্চ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও গাড়িটি থেকে যাওয়ায় যাতে পড়ে থেকে নষ্ট না হয় তাই মাঝেমধ্যে ব্যবহার করা হয়। একই প্রকল্পের আওতায় খামারিদের সঞ্চিত অর্থ থেকে টাকা কেটে রাখার অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন - অফিস কোনো টাকা কেটে রাখেনি, তাদের সমবায় সমিতির নামেই টাকা গুলো রয়েছে যাতে প্রকল্প শেষ হলেও সমবায় কার্যক্রম চালু থাকে।
এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. একেএম আসজাদ এর ভাষ্য- বরাদ্দের টাকা যতদূর জানি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যয় করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের অডিট টিম রয়েছে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অন্যান্য বিষয়ে তিনি জানান- এগুলো উপজেলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ভালো বলতে পারবেন, আমি এ বিষয়ে তার সাথে কথা বলবো।
প্রাণিসম্পদ এর মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ ব্যয়, প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার, মাঠকর্মীদের দায়িত্ব পালন, সরকারি ওষুধের ব্যবহার এবং অর্থ-লেনদেনের অভিযোগ গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দপ্তরটির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
বিবার্তা/মিলু/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]