
বর্ষার মৌসুম পেরিয়ে গেলেও ছিল না কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি। পানির অভাবে ফেটে যাচ্ছে আমন ধানের জমি। ধানগাছের বাড়ন্ত সময়ে সেচ দিয়ে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছেন কৃষক। এতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। এর ওপর সময়মতো সার না পাওয়া ও বেশি দামে সার কেনার অভিযোগও রয়েছে। সব মিলিয়ে বগুড়ার নন্দীগ্রামে আমন ধান চাষে বাড়তি খরচের চাপে পড়েছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে পত্তনি নিয়ে চাষ করা কৃষকেরা লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
উপজেলার নন্দীগ্রাম সদর ইউনিয়নের কমালকুড়ি গ্রামের কৃষক আব্দুল বারিক নিজের ১৭ বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে রোপণ থেকে ধান কাটা পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার টাকা খরচ হবে। তবে জমিতে সেচ দেওয়া অব্যাহত থাকলে উৎপাদন খরচ আরও বাড়তে পারে।
থালতা মাঝগ্রাম ইউনিয়নের শশীনগর গ্রামের কৃষক মনসুর রহমান বলেন, আগে আমন ধান চাষে এত বেগ পেতে হতো না। বর্তমানে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। এবার সময়মতো সার না পেয়ে বেশি দামে কিনতে হয়েছে। এখন ধানগাছের বাড়ন্ত সময়ে জমিতে পানি নেই। পানির অভাবে জমি ফেটে যাচ্ছে। তাই গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বিঘা জমিতে সেচের জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ধান চাষে লোকসান হতে পারে।
অনাবৃষ্টিতে সেচ দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন গভীর নলকূপের মালিকেরাও। গভীর নলকূপের মালিক আলহাজ মোখলেছার রহমান বলেন, ধানের জমি রক্ষায় অনেক কষ্ট করে ট্রান্সফরমার খুটিতে তুলে সেচ কার্যক্রম চালু করেছি। তবে এ সময়ে সেচ দিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক কৃষক সময়মতো সেচের টাকা দিতে চান না। পাশাপাশি ট্রান্সফরমার চুরির আশঙ্কা থাকায় পাহারার জন্য আলাদা লোক রাখতে হয়। এতে বাড়তি খরচ ও নানা ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। তারপরও খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এবং ধানের ক্ষতি এড়াতে সেচ কার্যক্রম চালু রেখেছি।
পত্তনি নিয়ে চাষাবাদ করা নন্দীগ্রাম পৌর এলাকার দক্ষিণপাড়ার কৃষক আলাউদ্দিনের দুশ্চিন্তা আরও বেশি। তিনি বলেন, এক বিঘা জমি বছরে ১৮ হাজার টাকায় পত্তনি নিয়েছেন। একই জমিতে আমন ও ইরি-বোরো, দুই মৌসুমে ধান চাষ করেন তিনি। তাই পত্তনির টাকা দুই মৌসুমে ভাগ করে আমন চাষের খরচে ৯ হাজার টাকা হিসাব করছেন। আলাউদ্দিনের হিসাব অনুযায়ী, জমি চাষ, আইল কাটা, বীজতলা তৈরি, চারা রোপণ, সার, বালাইনাশক, আগাছা পরিষ্কার, সেচ ও ধান কাটা মিলিয়ে আমন চাষে প্রতি বিঘায় প্রায় ২২ হাজার ৮০০ টাকা খরচ হচ্ছে। এর মধ্যে পত্তনি বাবদ ৯ হাজার টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আলাউদ্দিন বলেন, পত্তনি নিয়ে জমি চাষ করি। এ অবস্থা চলতে থাকলে আর পত্তনি নিয়ে চাষাবাদ করা যাবে না। উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু ধানের ফলন এবং দাম কেমন হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
নন্দীগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গাজিউল হক বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৯ হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এ মৌসুমে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫৬৫ মেট্রিক টন।
এ ছাড়া এবার ৯ হাজার ২২৯ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আমন ধানের চাষ হয়েছে। এসব জমিতে ব্রি ধান-৩৪,৭৫, বিনা-১৭,৭, স্বর্ণা, রণজিৎ ও কাটারিভোগ জাতের ধান চাষ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অনাবৃষ্টির কারণে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও যেসব জমিতে দেরিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে, সেসব জমিতে ধানগাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জমিতে সেচের সুবিধা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ট্রান্সফরমার সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে কৃষকেরা সেচ দিতে সমস্যায় না পড়েন। সারের কোনো সংকট নেই, সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে আমরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছি।
বিবার্তা/মনির/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]