সমস্যায় জর্জরিত টাঙ্গাইল শহর, ট্যাক্স বাড়লেও সেবা শঙ্কট
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ২০:২০
সমস্যায় জর্জরিত টাঙ্গাইল শহর, ট্যাক্স বাড়লেও সেবা শঙ্কট
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

একসময় শান্ত,পরিচ্ছন্ন ও বসবাসের উপযোগী শহর হিসেবে পরিচিত টাঙ্গাইল এখন অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অসহনীয় যানজট, জলাবদ্ধতা, গ্যাস ও পানি সংকটসহ নানা নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত। জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি সড়ক, ড্রেনেজ, পার্কিং, বিনোদনকেন্দ্র কিংবা অন্যান্য নাগরিক সুবিধা। ফলে ১৩৯ বছরের প্রাচীন এই পৌর শহরটি দিন দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।


১৮৮৭ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় টাঙ্গাইল পৌরসভা। প্রতিষ্ঠার সময় পৌরসভার ওয়ার্ড ছিল পাঁচটি। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮টিতে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, প্রায় ২৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের টাঙ্গাইল পৌর এলাকার জনসংখ্যা ২ লাখ ১২ হাজার ৮৮৭ জন। জনসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও নগর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সেই তুলনায় হয়নি।


১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা থেকে টাঙ্গাইল জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জেলা হওয়ার পর শহরের পরিধি ও জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও শহরের জন্য কার্যকর ও যুগোপযোগী নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় একের পর এক নাগরিক সংকট তৈরি হয়েছে।


সরু সড়কে বাড়ছে যানজট। শহরের প্রধান সড়ক ভিক্টোরিয়া রোড, মেইন রোড, জেলা সদর রোড (কবি নজরুল সরণি), ময়মনসিংহ রোড ও বেবি স্ট্যান্ড সড়ক তুলনামূলকভাবে সরু। অথচ এসব সড়ক দিয়েই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে।
জেলা ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল শহরে বৈধ সিএনজি রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২০০টি। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুই শিফটে চলাচল করে প্রায় ৫ হাজার। এর বাইরে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও স্থানীয়ভাবে টেসলা নামে পরিচিত যানবাহনের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।


কর্মব্যস্ত সময়ে বিপুলসংখ্যক সিএনজি, অটোরিকশা,ব্যাটারিচালিত রিকশা ও বাসের চাপে ভিক্টোরিয়া রোড,নিরালা মোড়, মেইন রোড, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, নতুন বাসস্ট্যান্ড ও পার্কের বাজার মোড়ে প্রায় প্রতিদিনই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির হয়ে পড়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো।


জেলার একমাত্র নতুন বাস টার্মিনালটি ১৯৮১ সালে প্রায় ৬ একর জায়গার ওপর নির্মিত হয়। প্রায় ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও টার্মিনালের পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। অথচ এ সময়ে বাস ও অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ।


ফলে টার্মিনাল এলাকায় প্রায়ই তীব্র যানজট তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে পাশের টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে। যানজটে আটকে জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকেও অনেক সময় দুর্ভোগ পোহাতে হয়।


শহরের বেবি স্ট্যান্ড, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, কলেজ মোড়, নতুন বাসস্ট্যান্ড, বেড়াডোমা ও শান্তিকুঞ্জের মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে সিএনজি ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড। এতে সড়কের বড় অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় যানচলাচলের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।


সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্দিষ্ট জায়গায় স্ট্যান্ড ও পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় মূল সড়কেই যাত্রী ওঠানামা ও যানবাহন দাঁড় করানো হচ্ছে। এতে যানজট আরও তীব্র হচ্ছে।


টাঙ্গাইল শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রাকৃতিক পথ শ্যামাবাবুর খাল। অভিযোগ রয়েছে, খালের বিভিন্ন অংশ দখল করে পৌরসভার উদ্যোগে সাতটি মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই আকুর-টাকুর পাড়া, আদালতপাড়া,থানাপাড়া, সাহাপাড়া, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড ও আটপুকুর পাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। প্রধান ড্রেনগুলোও ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকায় পানি দ্রুত নামতে পারে না।


জলাবদ্ধতা নিরসনে নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, নালা-নর্দমা সংস্কার কিংবা শ্যামাবাবুর খাল উদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি কোনো কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান দৃশ্যমান নয়।


শহরের অধিকাংশ ফুটপাত হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এতে একদিকে যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
নতুন মার্কেট ও আবাসিক ভবন নির্মাণ হলেও অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত পার্কিং, খোলা জায়গা কিংবা খেলার মাঠ রাখা হচ্ছে না।
জেলার একমাত্র শিশু পার্কের জায়গাতেও গড়ে উঠেছে পার্ক বাজার।


নগরবাসীর আরেকটি বড় সমস্যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়।


গ্রীষ্মকালে বিভিন্ন এলাকায় দেখা দেয় তীব্র পানি সংকট। অনেক এলাকাতেই এখনো গ্যাসের লাইন পৌঁছায়নি। ফলে নাগরিকদের অতিরিক্ত ব্যয় ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।


অন্যদিকে, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক ও অবকাঠামো অপ্রতুল বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে।


ব্যবসায়ী মো. রফিক বলেন, পৌরসভা ট্যাক্স বাড়াচ্ছে, কিন্তু সেবা বাড়ছে না। ড্রেন পরিষ্কার হয় না, রাস্তা ভাঙা থাকে মাসের পর মাস। মশার ওষুধ দেওয়া হয় না। গ্রীষ্মকালে তিন মাস পর্যন্ত সাপ্লাইয়ের পানি পাওয়া যায় না। পৌরসভার নাগরিক সেবা অত্যন্ত সীমিত, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।


বেবি স্ট্যান্ড সিএনজি ও অটোরিকশা শ্রমিক সমিতির আহ্বায়ক হাদিউজ্জামান সোহেল বলেন, কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এনডিএ বেবিস্ট্যান্ডের বেশ কিছু জায়গা দখল করে আছে। সেই জায়গা উদ্ধার করে সিএনজি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হলে টাঙ্গাইল-নাগরপুর আঞ্চলিক সড়কে যানজট কমবে। কচুয়াডাঙ্গা-এয়ারপোর্ট রোডে কিছু অটোরিকশা সরিয়ে নেওয়া গেলে মূল সড়কের ওপর চাপ কমবে।


টাঙ্গাইল পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ শহিদুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, একটি পরিকল্পিত নগরে ২০ শতাংশ জায়গা সড়কের জন্য, ৪০ শতাংশ বসতির জন্য, ১০ শতাংশ খেলার মাঠ ও বিনোদনকেন্দ্রের জন্য, ২০ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান এবং ১০ শতাংশ ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য থাকা প্রয়োজন।


বিবার্তা/বাবু /এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com