টাঙ্গাইলের যুগনি স্লুইস গেট: বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রকল্প এখন জলাবদ্ধতার কারণ
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৩৮
টাঙ্গাইলের যুগনি স্লুইস গেট: বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রকল্প এখন জলাবদ্ধতার কারণ
ইমরুল হাসান বাবু, টাঙ্গাইল
প্রিন্ট অঅ-অ+

একসময় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল টাঙ্গাইলের যুগনি স্লুইস গেট। তবে নির্মাণের প্রায় ৩৬ বছর পর স্থানীয়দের অভিযোগ, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে এই স্লুইস গেটই এখন টাঙ্গাইল শহর ও আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা, কৃষি ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় দেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশে নেওয়া হয় ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান (এফএপি)। এর অন্যতম প্রকল্প ছিল কম্পার্টমেন্টালাইজেশন পাইলট প্রজেক্ট (সিপিপি), টাঙ্গাইল। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল যমুনার প্লাবনভূমিতে ছোট-বড় কম্পার্টমেন্ট বা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেষ্টনী তৈরি করে স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের উন্নয়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।


বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ওই প্রকল্পের অংশ হিসেবে টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধের সঙ্গে নির্মাণ করা হয় যুগনি স্লুইস গেট। স্থানীয়ভাবে সিলিমপুর-করটিয়া বাঁধ নামে পরিচিত প্রায় ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধ টাঙ্গাইল শহর ও আশপাশের এলাকাকে যমুনা, পুংলী, ধলেশ্বরী ও লৌহজং নদীর বন্যা ও ভাঙন থেকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।


টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাঘিল ইউনিয়নের কাঠুয়া যুগনি এলাকায় লৌহজং নদীর ওপর নির্মিত স্লুইস গেটটি বাঁধের ভেতরে পানি প্রবেশ ও নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান পথ। পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্ষাকালে প্রয়োজন অনুযায়ী গেট খুলে পানি প্রবেশ করানো এবং শুষ্ক মৌসুমে গেট বন্ধ রাখার কথা।


তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে গেটটি প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালিত হয় না। কখন গেট খোলা হবে কিংবা কখন বন্ধ করা হবে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও জনসম্মুখে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থাপনা কাঠামো নেই বলেও অভিযোগ তাঁদের।


স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে গেটের কার্যকর ব্যবস্থাপনা না থাকায় লৌহজং নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। নদীর বিভিন্ন অংশে পলি জমে নাব্যতা কমে গেছে। কোথাও কোথাও নদীটি সংকুচিত হয়ে মরা খালের মতো অবস্থায় পৌঁছেছে।


স্লুইস গেট ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সমস্যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বর্ষা মৌসুমে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারী বৃষ্টির পর শহর ও আশপাশের এলাকায় পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে না পারায় বিভিন্ন সড়ক, ফসলি জমি ও বসতবাড়িতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
এ ছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় একসময়কার গুরুত্বপূর্ণ শ্যামা বাবুর খাল ১৯৯৬ সালে ড্রেনে রূপান্তর করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, পরবর্তীতে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় ড্রেন ও সংযোগ খালগুলোও অনেক জায়গায় ভরাট বা সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশনে সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রবি মৌসুমে জমিতে সময়মতো চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে মশার বংশবিস্তার ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।


স্লুইস গেটের কারণে লৌহজং নদী ও আশপাশের জলাশয়ের মধ্যে মাছের স্বাভাবিক চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দাদের। তাঁদের মতে, নদী ও বিল-ঝিলের মধ্যে পানির স্বাভাবিক সংযোগ কমে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


পাশাপাশি নদী ও খালগুলোতে পলি জমে জলাধারের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষায় পানি ধারণ ও নিষ্কাশন দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে।


পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ড. মোবাশ্বেরা বিবার্তাকে বলেন, একটি মাত্র স্লুইস গেট দিয়ে ২১ কিলোমিটার বাঁধের ভেতরের পুরো এলাকার পানি ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানের সময়কার বাস্তবতা এবং বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে।


তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর গতিপথের পরিবর্তন, জনবসতি বৃদ্ধি ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে পুরোনো পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন।


সমাধান হিসেবে তিনি স্লুইস গেট আধুনিকায়ন, বড় ও স্বয়ংক্রিয় গেট স্থাপন এবং বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির স্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে গেট পরিচালনার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে বাঁধের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি স্লুইস বা কালভার্ট নির্মাণ, লৌহজং নদী ও শ্যামা বাবুর খাল পুনঃখনন এবং স্থানীয় পানি ব্যবহারকারী সংগঠনকে গেট পরিচালনায় সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।


কাঠুয়া যুগনির বাসিন্দা রহিম শেখ ও কৃষক রইজ উদ্দিনের অভিযোগ, স্লুইস গেট পরিচালনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নেই। কখন গেট খোলা হবে কিংবা বন্ধ করা হবে এ বিষয়ে তাঁরা আগেভাগে কিছু জানতে পারেন না।


তাঁদের দাবি, গেট পরিচালনায় একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা ও জনসম্পৃক্ত ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন। তাঁদের ভাষায়, পানি ব্যবস্থাপনার সুফল পাওয়ার কথা থাকলেও অনিয়মিত ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক সময় স্থানীয় মানুষ উল্টো ক্ষতির মুখে পড়ছেন।


তবে গেট পরিচালনায় রাজনৈতিক বা ব্যক্তিস্বার্থের প্রভাব থাকার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


টাঙ্গাইল জেলা সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি অকিবুর রহমান ইকবাল বিবার্তাকে বলেন, প্রায় ৩৬ বছর আগে যে বাস্তবতায় প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। তাই যুগনি স্লুইস গেটসহ পুরো পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।


তিনি বলেন, গেটটি যদি রাখা হয়, তাহলে আধুনিক প্রযুক্তি ও বর্তমান পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এর সংস্কার ও পরিচালনা ব্যবস্থা পরিবর্তন করা দরকার।


টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু বলেন, নদী, মানুষ ও শহর তিনটিকেই রক্ষা করতে হলে যুগনি স্লুইস গেটের বিষয়ে নতুন করে বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, পুরোনো অবকাঠামোকে শুধু টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে এর কার্যকারিতা ও বর্তমান প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করা জরুরি।


জলাবদ্ধতার কারণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাইন উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধ নিঃসন্দেহে শহর ও আশপাশের জনপদকে নদীভাঙন ও বন্যার ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া নদীর গতিপথ, জলবায়ু, নগরায়ণ ও জনবসতির বাস্তবতায় বাঁধের ভেতরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা এখন সময়ের দাবি।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com