অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক বদলি
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৮
অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক বদলি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক মো. শাহজাহান কবিরকে বদলি করা হয়েছে। তার জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে একই ধরনের অভিযোগে অতীতে আলোচিত উপ-পরিচালক হালিমা খাতুনকে।


রবিবার (৩০ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন শাখার উপ-সচিব মোহাম্মদ নুরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে মো. শাহজাহান কবিরকে বদলি করার খবরে স্বস্তি পেয়েছন ভুক্তভোগীরা। তাদের প্রত্যাশা ছিল, এবার হয়তো বদলাবে চিত্র, কমবে দালালের দৌরাত্ম্য, বন্ধ হবে ‘চ্যানেল’ বাণিজ্য আর সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কাউকে গুনতে হবে না বাড়তি টাকা। কিন্তু সেই আশায় যেন জল ঢেলে দিয়েছে নতুন পদায়নের সিদ্ধান্ত। কারণ শাহজাহান কবিরের জায়গায় যাকে আনা হচ্ছে, সেই উপ-পরিচালক হালিমা খাতুনের বিরুদ্ধেও তার আগের কর্মস্থলে অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছিল।


২০১৯ সালে মুন্সীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অভিযানও চালিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ফলে এক বিতর্কিত অধ্যায়ের অবসানের পর আরেক বিতর্কিত অতীতের কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠেছে- লাউ গেল, কদু এলো- তাহলে বদলালো কী?


ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নতুন করে পদায়ন হওয়া হালিমা খাতুনও শাহজাহান কবিরের মতো একই অভিযোগে কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে যশোরের ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টারে বদলি হয়েছিলেন। অর্থাৎ, অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত একজনকে সরিয়ে এমন একজন কর্মকর্তাকেই আনা হচ্ছে, যার বিরুদ্ধেও অতীতে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। যে অভিযোগে বদলি হলেন শাহজাহান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দীর্ঘদিন ধরে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, দালালের দৌরাত্ম্য এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে অফিসটিকে ঘিরে কথিত ‘চ্যানেল’ ব্যবস্থার অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দালাল বা ‘চ্যানেল’ ধরে আবেদন করলে কাজ দ্রুত হয়, কিন্তু সরাসরি আবেদন করতে গেলে নানা অজুহাতে ঘোরানো হয়। কথিত এই ব্যবস্থায় আবেদনকারীর ফাইলে বিশেষ কোড, ই-মেইল আইডি কিংবা সংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। এসব চিহ্ন দেখে সংশ্লিষ্ট ফাইল চেনা হয় এবং চ্যানেলের মাধ্যমে আসা আবেদনকারীরা অন্যদের তুলনায় দ্রুত সেবা পান, এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন গড়ে ৩০০টিরও বেশি আবেদন জমা পড়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, চ্যানেলের মাধ্যমে প্রতিটি আবেদনে অতিরিক্ত ১৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই হিসেবে প্রতি কার্যদিবসে চার লাখ টাকা ঘুষ পেতো এই অফিস।


অভিযোগের তীর ছিল তৎকালীন উপ-পরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের দিকে। তাঁর বিরুদ্ধে কথিত চ্যানেল ব্যবস্থাকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। একই সঙ্গে উপ-সহকারী পরিচালক মোর্শেদুল হক ও সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনের নামও অভিযোগে আসে। অভিযোগ ছিল, চ্যানেল ছাড়া সরাসরি সেবা নিতে আসা মানুষকে কখনো কাগজে ভুল, কখনো সার্ভার সমস্যা, কখনো এনআইডি ভেরিফাইয়ের নামে অন্য কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার কথা বলে ঘোরানো হতো। পাসপোর্ট করতে আসা আশুগঞ্জের বাসিন্দা তারেকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তাকে একাধিক কক্ষে ঘোরানোর পর পরিচিত একজনকে নিয়ে আসার পর অল্প সময়ের মধ্যে তার কাজ হয়ে যায়। বাঞ্ছারামপুরের রনি মিয়ার অভিযোগও প্রায় একই ধরনের। তার ভাষ্য, আগে পাসপোর্ট করতে এতটা হয়রানি হয়নি, এখন অফিসের ভেতরে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ঘুরতে হয়। নাসিরনগরের এক আবেদনকারীও অতিরিক্ত টাকা দাবির অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের মধ্যেই উপ-পরিচালক শাহজাহান কবিরকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সরিয়ে যশোরের ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টারে পদায়ন করা হয়েছে।


পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তালিকাতেও বর্তমানে তাকে যশোরের ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টারের উপ-পরিচালক হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু নতুন যিনি আসছেন, তার অতীত কী বলছে? শাহজাহান কবিরকে সরানোর পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য আলোচনায় আসা হালিমা খাতুনও পাসপোর্ট অফিসে অনিয়মের অভিযোগে নতুন কেউ নন। প্রায় সাত বছর আগে, ২০১৯ সালে মুন্সীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের ওই অভিযানের সময় অভিযোগ উঠে, তিনি এক মাস ধরে অফিসের হাজিরা খাতা যাচাই করেননি। শুধু তাই নয়, সাধারণ পাসপোর্টের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত ১,৫০০ টাকা এবং জরুরি পাসপোর্টের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৪,০০০ টাকা দিতে হচ্ছে, এমন অভিযোগও পাওয়া যায়। অভিযোগ ছিল, অতিরিক্ত অর্থ না দিলে ইচ্ছাকৃতভাবে পাসপোর্টে বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি ধরা হতো৷ ২০১৯ সালের দুদকের অভিযানের খবরটি সে সময় সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। অভিযোগের পর কোথায় ছিলেন হালিমা? কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক হিসেবেও হালিমা খাতুন দায়িত্ব পালন করে।


কিশোরগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। গত বছরের ২৮ জুলাই কিশোরগঞ্জ সদরের বাসিন্দা নাঈম ভূঞা নামের একজন ভূক্তভোগী উপ-পরিচালক হালিমা খাতুনের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরে তাকে যশোরের ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টারে বদলি করা হয়। অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত সেই হালিমাকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পদায়ন ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে শুধুমাত্র একজন কর্মকর্তাকে ঘিরেই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বাইরে থাকা কথিত দালালচক্রকে ঘিরেও আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগে উপ-সহকারী পরিচালক মোর্শেদুল হক, সহকারী হিসাবরক্ষক জয়নাল আবেদীনসহ কয়েকজনের নাম এসেছে।


সচেতন মহলের উদ্বেগ: সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, পাসপোর্ট অফিসে একজন কর্মকর্তার পরিবর্তন নয়, পুরো সেবা ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল মান্নান সরকার বলেন, “শুধু কর্মকর্তা বদলি করে সমস্যার সমাধান হবে না। দালালচক্র ও অফিসের ভেতরের যোগসাজশের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে স্থায়ী একটা প্রতিকার পাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী।” জেলা নাগরিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক রতন কান্তি দত্ত বলেন, 'সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিরা সজাগ থাকলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অফিসে পাসপোর্ট করতে আসা নাগরিকদের হয়রানি কমবে বলে আমরা মনে করি।"


বিবার্তা/নিয়ামুল/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com