
টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও আবার কোমরসমান পানি জমে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন কাজকর্ম। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ।
বন্ধ রয়েছে নগরীর অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থগিত হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষাও। নগরীর পুলিশ লাইন্স থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরের শান্তিবাগ আবাসিক এলাকার চিত্র যেন দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি। নাম শান্তিবাগ হলেও তিন দিন ধরে অশান্তিতে দিন কাটছে এখানকার বাসিন্দাদের।
শান্তিবাগের ৩ নম্বর লেনের বাসিন্দা স্কুল পড়ূয়া ফাওজিয়া ইলহাম টানা তিন দিন স্কুলে যেতে পারেনি। তার বোন সনজিদার দিন কাটছে খাটের ওপর। কারণ, খাটের নিচ পর্যন্ত হাঁটুসমান পানি, আর ঘরের সামনে কোমরসমান জল। ফাতেমা জান্নাত দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন ওই ঘরে। সঙ্গে আছেন তার ভাই ইমতিয়াজ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গিয়ে দেখা যায়, খাটে বসে চিড়া-মুড়ি খেয়ে ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
কথা বলতে বলতে ঘরের সামনে জমে থাকা পানিতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, তিন দিন ধরি দোজখত আছি। রান্দির ন পারি, গোসলও গড়ির ন পারি। ঘরের সামনে কোমর হমান পানি। কমোডের ভিতর দিয়েরে পানি ঢুকের ঘর ভইরা যাইতাছে। ঘণ্টাখানিক পরপর বালতি দিয়েরে পানি হিচন লাগে।
ইমতিয়াজের ভাষ্য, পানির কারণে রান্না, গোসল, এমনকি স্বাভাবিকভাবে বসবাস করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ইউসুপ সাহেব নামে এক ব্যক্তি এখানে প্রায় ২০টি পরিবারের জন্য ভাড়া বাসা নির্মাণ করেছেন। পাশের খালের জোয়ারে প্রায়ই পানি ওঠে। তবে টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শুধু শান্তিবাগ নয়, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা এবং ইপিজেডসংলগ্ন নেভি কলোনির বাসিন্দারাও জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।
নেভি হাসপাতালের পাশের বহুতল ভবনগুলোতেও নিচতলা ও প্রবেশপথে পানি জমে থাকায় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই তিন দিন ধরে প্রয়োজনীয় বাজার করতে নিচে নামতে পারেননি।
স্থানীয় চা-দোকানি আব্দুর রহমান বলেন, সোমবার থেকে পানি বাড়তে শুরু করে। বৃষ্টি যত বেড়েছে, পানিও তত বেড়েছে। একসময় আশপাশের এলাকায় কোমরসমান পানি হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার কিছুটা কমলেও পুরো কলোনি এখনও পানিতে ঘেরা।
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকাতেও পানি কিছুটা কমলেও এখনও বহু মানুষ পানিবন্দি। বেশির ভাগ দোকানে পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে মালামাল।
নিজের ওষুধের দোকান থেকে পানি সেচতে থাকা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, বৃহস্পতিবার কিছু সময়ের জন্য রোদ উঠেছিল। কিন্তু সন্ধ্যা থেকে আবার ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় দোকানে নতুন করে পানি ঢুকেছে। গত তিন দিন পানি সেচতেই সময় চলে গেছে।
কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের কারণে চট্টগ্রাম নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। স্থগিত করা হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষাও। বিমান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে পণ্য ওঠানামা চললেও বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
টানা বর্ষণে নগরীর মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, মোহাম্মদপুর, চকবাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহর, রামপুরা, বেপারীপাড়া, মুহুরীপাড়া, উত্তর কাট্টলী, দেওয়ান বাজার, কাপাসগোলা, শান্তিবাগ, পাঠানটুলি, পুলিশ লাইন্স, এয়ারপোর্ট, চান্দগাঁও, মোহরা, কুয়াইশ, অক্সিজেনসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে রয়েছে সড়ক ও বসতবাড়ি।
বিবার্তা/জয়দেব/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]