
বসন্তের ফুরফুরে হাওয়ার মতোই টাঙ্গাইলের তাঁত এলাকাগুলোতে এখন বইছে নতুন প্রাণের স্পন্দন। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা, লোকসান আর অনিশ্চয়তার চাদর সরিয়ে আবারো ‘খটখট’ শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, সদর উপজেলার বাজিতপুর এবং কালিহাতীর বল্লা-রামপুরের তাঁতপল্লি। বিশ্বজুড়ে সমাদৃত টাঙ্গাইল শাড়িতে নতুন করে চাহিদা তৈরি হওয়ায় মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসন্ন ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ঝিমিয়ে থাকা এই শিল্পে আবারও কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
জানা যায়, উনিশ শতকের শেষভাগে টাঙ্গাইল শাড়ির যাত্রা শুরু হয়। বাজিতপুর, পাথরাইল, নলসন্ধা ও চণ্ডী এলাকার বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিদের হাত ধরেই এ শিল্পের বিকাশ ঘটে। সিল্ক, কটন, জামদানি ও সফট সিল্কের নিপুণ কারুকাজে তৈরি এই শাড়ি সূক্ষ্ম বুনন ও বৈচিত্র্যময় পাড়ের নকশার জন্য বিখ্যাত।
মাছ, পদ্ম ও লতার মোটিফে নকশা করা টাঙ্গাইল শাড়ি ওজনে হালকা এবং আরামদায়ক হওয়ায় যুগ যুগ ধরে এটি বাঙালি নারীর অন্যতম পছন্দের পোশাক।
২০২৪ সালের শুরুতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বীকৃতি দাবি করলে বৈশ্বিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পরে বাংলাদেশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে একই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে গেজেটভুক্ত করে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ‘ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি বুনন শিল্প’ ইউনেস্কোর ‘অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের দাবিকে আরও সুসংহত করেছে।
স্বীকৃতি এলেও সংকট কাটেনি বৈশ্বিক স্বীকৃতি এলেও মাঠপর্যায়ে তাঁতিদের জীবন সংগ্রাম এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বাণিজ্যের জটিলতার কারণে ঐতিহ্যবাহী শাড়ির রপ্তানি কমেছে, যা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে সুতা ও রঙের ক্রমবর্ধমান মূল্য প্রান্তিক তাঁতিদের লাভ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক দক্ষ কারিগর পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়া হাতে বোনা তাঁতের পরিবর্তে কম দামের পাওয়ারলুম শাড়ির বিস্তারও হস্তশিল্পীদের প্রতিযোগিতার মুখে ফেলেছে।
মন্দার সময় বন্ধ হয়ে যায় অনেক তাঁত সরেজমিনে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে টাঙ্গাইল শাড়ির বাজার চরম দুরবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। সুতার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট এবং সীমান্ত বাণিজ্যের জটিলতায় অনেক তাঁত বন্ধ হয়ে যায়।
ঋণগ্রস্ত হয়ে অনেক কারিগর পৈতৃক পেশা ছেড়ে রিকশা চালানো বা দিনমজুরির কাজ শুরু করেন। তবে বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় বাজারে আবার কিছুটা গতি দেখা যাচ্ছে।
তাঁতশিল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলায় প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার তাঁত রয়েছে। এ শিল্পের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। মন্দার কারণে প্রায় ৪০ শতাংশ তাঁত বন্ধ হয়ে গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে অনেকগুলো আবার চালু হতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের কালিহাতী (বল্লা) বেসিক সেন্টার সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী ১৬টি প্রাথমিক ও একটি মাধ্যমিক তাঁতি সমিতির আওতায় ১৬ হাজারের বেশি তাঁত রয়েছে।
এক হাজার ৬৯৫ জন তাঁতির মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যার আদায়ের হার ৮৭ শতাংশ। এছাড়া চলতি মূলধন প্রকল্পের অধীনে ৬৩১ জন তাঁতির মধ্যে প্রায় ১২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
তবে বাজিতপুর বেসিক সেন্টারে একাধিকবার গিয়েও কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। অফিসে তালা ঝুলতে দেখা গেছে।
ঈদ-বৈশাখকে ঘিরে ব্যস্ত তাঁতপল্লি টাঙ্গাইল জেলা শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে দেলদুয়ারের পাথরাইল, চণ্ডী, নলুয়া এবং কালিহাতীর বল্লা ও রামপুর এলাকায় এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
তাঁতিরা দিন-রাত এক করে জামদানি, সিল্ক, সফট সিল্ক ও টিস্যু সিল্কের আকর্ষণীয় শাড়ি বুনছেন। বাজারে মানভেদে টাঙ্গাইল শাড়ির দাম ৭০০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে উৎসব মৌসুমে ৫ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকার শাড়ির চাহিদা বেশি।
অনলাইন ও অফলাইন— উভয় বাজারেই এখন টাঙ্গাইল শাড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফেসবুক পেজ ও ই-কমার্সের মাধ্যমে বিক্রিও বাড়ছে।
সূত্রমতে, ঈদ ও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এ বছর টাঙ্গাইলে প্রায় ২৪ লাখ শাড়ি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এতে সম্ভাব্য বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।
জিআই ট্যাগ নিয়ে বিতর্কের পর দেশি-বিদেশি বাজারে টাঙ্গাইল শাড়ির প্রতি আগ্রহ ও আবেগ প্রায় ১৫-২০ শতাংশ বেড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
শাড়ির পাশাপাশি থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি তবে সামগ্রিকভাবে শাড়ির ব্যবহার কমে যাওয়ায় শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অনেক তাঁত মালিক এখন হাতে বোনা তাঁতে থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবির কাপড় তৈরির দিকে ঝুঁকছেন।
পাথরাইল এলাকার তাঁতি রহমত আলী বলেন, “গত বছর ঈদের আগে ঘরে চাল ছিল না। এবার মালিক অগ্রিম টাকা দিয়েছে, দিন-রাত কাজ করছি। আরেক তাঁতি ধীরেন পাল জানান, “ঈদ ও বৈশাখে থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি থাকে। তাই মালিকরা সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক ও ব্যবসায়ি কালাচাঁদ বসাক বলেন, তাঁত শিল্প বরাবরই অবহেলিত। তাঁত বোর্ডের কার্যক্রম মূলত ঋণ দেওয়া আর আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সরকার যদি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে, তবে টাঙ্গাইল শাড়ি দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান পণ্য হতে পারে। ঐতিহ্যের সুতোয় বোনা এই শিল্পে জড়িতরা এখন শুধু টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং বিশ্বদরবারে নতুন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন।
বিবার্তা/বাবু/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]