দারিদ্র্যের কাছে হার মানছে শিক্ষা
প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করতে পারছে না প্রতি পাঁচজনের একজন শিশু
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ১৬:৫০
দারিদ্র্যের কাছে হার মানছে শিক্ষা
শরীফা হক
প্রিন্ট অ-অ+

বিশ্বজুড়ে শিক্ষা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষার প্রসার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চললেও দারিদ্র্যের কারণে এখনো কোটি কোটি শিশু প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারছে না। অর্থাভাবে বই-খাতা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে নামতে বাধ্য হচ্ছে তারা। ফলে নীরবে ঝরে পড়ছে একের পর এক শৈশব, হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার অধিকার এবং সংকুচিত হচ্ছে উন্নয়নের সম্ভাবনা।


ইউনেস্কোর ২০২৫ সালের বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৭২ মিলিয়ন শিশু ও কিশোর বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে ৭৮ মিলিয়নই প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সি শিশু। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করে। সাব-সাহারান আফ্রিকার অনেক দেশে এ হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।


বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষা সমাপ্তির ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করলেই হবে না; শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমে ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। তবে সমাপনী হার ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার আগেই বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে।


শিক্ষাবিদদের মতে, দারিদ্র্যই এই সমস্যার মূল কারণ। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অনেকেই পরিবারের আয় বৃদ্ধির জন্য অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে যুক্ত হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে ৫৪ মিলিয়ন শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এসব শিশু বিদ্যালয়ের পরিবর্তে কৃষিক্ষেত্র, কারখানা, দোকান কিংবা গৃহস্থালির কাজে সময় ব্যয় করে।


শিক্ষা অবৈতনিক হলেও খাতা, কলম, পোশাক, যাতায়াত এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে কাজে পাঠাতে বাধ্য হন। একই সঙ্গে অপুষ্টি ও খাদ্যসংকটও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও শেখার সক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।


কন্যাশিশুরা এ ক্ষেত্রে আরও বেশি ঝুঁকিতে থাকে। অনেক পরিবারে ছেলেদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও মেয়েদের গৃহস্থালির কাজ কিংবা বাল্যবিবাহের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
নিরাপদ যাতায়াত ও পর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুবিধার অভাবও মেয়েদের বিদ্যালয় ত্যাগের অন্যতম কারণ।


এছাড়া শিক্ষার নিম্নমান, দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের সংকটও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৭০ শতাংশ দশ বছর বয়সি শিশু একটি সাধারণ গল্প পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে না। এই অবস্থাকে ‘লার্নিং পোভার্টি’ বা শিক্ষণ দারিদ্র্য হিসেবে অভিহিত করা হয়।


বাংলাদেশে বিদ্যালয় ত্যাগের পেছনে অভিভাবকের আর্থিক অসচ্ছলতা, শিশুশ্রম, মৌসুমি অভিবাসন, নদীভাঙন, উপকূলীয় দুর্যোগ এবং বাল্যবিবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, হাওরাঞ্চল ও অন্যান্য প্রান্তিক এলাকায় সমস্যা আরও প্রকট।


বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উপবৃত্তি ও শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি সম্প্রসারণ, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে এই সংকট অনেকাংশে মোকাবিলা করা সম্ভব।


তাদের মতে, একটি শিশুর বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির ক্ষতি। কারণ শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষায় ভর্তির পাশাপাশি প্রতিটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


লেখক:শরীফা হক (জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ ম্যাজিষ্ট্রেট, টাঙ্গাইল)।


বিবার্তা/বাবু/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com