
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডে আলোচনা করে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করা হবে। তাই আন্দোলনরত শ্রমিকদের ভাঙচুর ও সহিংসতা বন্ধ করে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আক্তার।
তিনি বলেছেন, তৈরি পোশাক কারখানা কিংবা সড়কে ভাঙচুর করে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে সরকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। সে ক্ষেত্রে কারও কিছু করার থাকবে না।
সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বাবুল আক্তার।
এ সময় মজুরি বোর্ডে সরকারপক্ষের অপর শ্রমিক প্রতিনিধি আনোয়ার হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের উদ্দেশে বাবুল আক্তার বলেন, আপনাদের দাবি ও কণ্ঠস্বর আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মজুরি বোর্ডে আমরা আপনাদের দাবিগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরব। আমরা আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা ধৈর্য ধরুন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখুন এবং নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখুন। কারণ, এই শিল্প আমাদের সবার। এই শিল্পের শ্রমিকদের জীবিকা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখাও আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
তিনি বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের সব কারখানায় কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন না থাকায় মালিক-শ্রমিক দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় সামাজিক সংলাপ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে শ্রমিকদের আন্দোলন সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তৃতীয় পক্ষ সেই সুযোগ নেয়। এর দায় কোনোভাবেই শ্রমিক সংগঠন বা শ্রমিক শ্রেণির ওপর বর্তায় না। সরকারকে এসব বিষয় খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
আন্দোলনের অজুহাতে সাধারণ শ্রমিক ও কারখানার তৃণমূল পর্যায়ের শ্রমিক নেতাদের হয়রানি না করতে পুলিশের প্রতি অনুরোধ জানান এই শ্রমিক প্রতিনিধি।
বাবুল আক্তার আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে শিল্পে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই সরকার ও মজুরি বোর্ডের প্রতি শ্রমিকদের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর আলোচনার জন্য বোর্ডের সভা আহ্বানের দাবি জানান তিনি।
সংশোধিত শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরি বোর্ড গঠনের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুরুতে মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে উদ্যোক্তাদের অনীহা শ্রমিকদের বিক্ষুব্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ। এ পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তা নেতাদের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সংযত হওয়া প্রয়োজন।
চলমান আন্দোলনে তৃতীয় কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা সরকারকে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান বাবুল আক্তার। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা নেতাদের দায়িত্বহীন বক্তব্যের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানান তিনি।
মজুরি কার্যকরের সময়সীমা প্রসঙ্গে বাবুল আক্তার বলেন, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। তিন বছর হিসাব করলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে পরবর্তী মজুরি নির্ধারণের সময় হবে। তাই নতুন মজুরি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করে ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে শ্রমিকদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার পক্ষে তারা।
তিনি বলেন, মজুরি বোর্ডের কাজ শুরু করতে কোনোভাবেই বিলম্ব করতে চান না তারা। প্রয়োজন হলে সারারাত বৈঠক করেও দ্রুত মজুরি নির্ধারণ করতে প্রস্তুত। বিভিন্ন জোট ও সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি জানানো হয়েছে। বোর্ডে আলোচনা করে সঠিকটা নির্ধারণ করা হবে। গবেষণা করে মজুরি নির্ধারণ করতে গেলে শ্রমিকদের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় মজুরি ৪৫ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকা হওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন বাবুল আক্তার।
তিনি বলেন, মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নই তাদের প্রধান কাজ। কিন্তু ভাঙচুর, উৎপাদন বন্ধ এবং দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করে কোনো দাবি আদায় করা উচিত নয়। তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত উল্লেখ করে তিনি শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
বাবুল আক্তার বলেন, গত কয়েক দিনে নিরীহ শ্রমিককে রিমান্ডে নিয়েছে। আমার নিজ সংগঠনের দুই নেতাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এই নেতাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মজুরি বোর্ডের সাবেক শ্রমিক প্রতিনিধি ও সম্মিলিত শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তারও বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, মিরপুরে শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সেখানে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্নভাবে বঞ্চিত ও সমস্যায় থাকা মানুষের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। একইভাবে গাজীপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে এলাকার সাধারণ মানুষও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।
নাজমা আক্তার বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৫৫ শতাংশ নারী শ্রমিক রয়েছেন। কিন্তু আন্দোলনের সময় সড়কে নারী ও পুরুষ শ্রমিকের উপস্থিতির চিত্রে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া কারখানায় অল্প সময় ধরে কাজ করছেন, এমন কিছু শ্রমিককেও আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]