
দীর্ঘ ১৮ বছর পর আবারও পূর্ণাঙ্গ মিশন নিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন(ইইউ)। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমান সরকারের আমন্ত্রণে ইতিমধ্যে নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে সংস্থাটি। রোববার রাজধানীর হোটেল রেনেসাঁয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভারস ইয়াবস আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে ইইউর অবস্থান, পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি, বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেন তিনি। ২০০৮ সালের পর এটিই বাংলাদেশে ইইউর প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন, যা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মিশনের সক্ষমতা ও পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে লাটভিয়ার প্রতিনিধি ইভারস ইয়াবস জানান, এই মিশনটি ২০০৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে। মিশনের সব সদস্য কঠোর আচরণবিধির অধীন। ‘স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং হস্তক্ষেপহীনতা’—এই তিন মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে পূর্ণ সক্ষমতার এই মিশনে ইইউর ২৭টি সদস্যদেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকছেন। ১১ জন বিশ্লেষক নিয়ে গঠিত একটি ‘কোর টিম’ গত ২৯ ডিসেম্বর থেকে কাজ শুরু করেছে। ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক আগামী ১৭ জানুয়ারি থেকে ৬৪ জেলায় মোতায়েন হবেন। ভোটের ঠিক আগে আরও ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক তাঁদের সঙ্গে যোগ দেবেন। এছাড়া ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদলও এই মিশনে যুক্ত হবে। এই ব্যাপক অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইইউর অঙ্গিকার ও বাংলাদেশের সঙ্গে সংস্থাটির অংশীদারিত্বের প্রতিফলন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে ইভারস বলেন, ইইউ বিশ্বাস করে বাংলাদেশ একটি অংশগ্রহণমূলক, বিশ্বাসযোগ্য এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম। আমরা নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করব, কিন্তু ফলাফল প্রত্যয়ন করব না। এই নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের জনগণের।
প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, মিশনটি নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করবে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচন প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো ও এর বাস্তবায়ন, প্রচারণা কার্যক্রম এবং নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তি। ইইউ ইওএম নারী, যুবক এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীসহ রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণের সামগ্রিক পরিবেশও মূল্যায়ন করবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যবেক্ষণ ইউনিটগুলো ভোটাররা কতটা তথ্যসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হচ্ছেন, তাও মূল্যায়ন করবে।
অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তির নতুন সমীকরণ: সংবাদ সম্মেলনে ইইউ প্রধান বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তবে সাংবাদিকরা যখন ‘অংশগ্রহণমূলক’ ও ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জানতে চান, তখন ইভারস ইয়াবস প্রথাগত সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে এক নতুন ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রেক্ষাপট থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক মানে কেবল রাজনৈতিক মেরুকরণ নয়, বরং সমাজের সব সামাজিক গোষ্ঠীকে প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা বিশেষ করে নারী, সব ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই।’
ইইউর এই নতুন সমীকরণ অনুযায়ী, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানে কেবল বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাগুজে উপস্থিতি নয়, বরং ব্যালট বাক্সে সাধারণ ভোটারদের আস্থার প্রতিফলন। ইয়াবস আরও বলেন, ‘অংশগ্রহণমূলক হওয়ার ক্ষেত্রে আমরা নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্য ভোটার উপস্থিতির দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখব। ভোটাররা যদি মনে করেন তাদের ভোট কার্যকর এবং তারা যদি নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসেন, তবেই আমরা একে অংশগ্রহণমূলক বলব। যার মাধ্যমে আমরা ইঙ্গিত পাব যে, বাংলাদেশের নাগরিকরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সত্যিকার অর্থে ব্যবহার করছে।’
ইভরাস সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বলেন, আসন্ন নির্বাচন হবে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট আয়োজন ভোটারদের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা অটুট রাখবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নিবন্ধন বিতর্ক: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত হওয়া বর্তমানে দেশের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু। অতীতে ইইউ সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইয়াবসের অবস্থান ছিল অত্যন্ত বিচক্ষণ ও কূটনৈতিক। লাটভিয়ার এই প্রতিনিধি বলেন, ‘আমরা জানি দলের নিবন্ধন এখন একটি বড় ইস্যু। জাতীয় সমঝোতা (রিকনসিলিয়েশন) এবং রূপান্তরকালীন বিচারের বিষয়টি এখানে ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত জটিল। আমরা এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুগুলোতে সরাসরি কোনো মন্তব্য করছি না। তবে নির্বাচনের ওপর এসবের কী প্রভাব পড়ছে, সেদিকে আমাদের নজর থাকবে। নির্বাচনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলার জন্য আমরা এখানে আসিনি; তবে আমরা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এবং চূড়ান্ত মূল্যায়নে অবশ্যই এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেব।’
আইনশৃঙ্খলা ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের চ্যালেঞ্জ: দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপযোগী কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইয়াবস বলেন, ‘অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমার প্রাথমিক আভাস হচ্ছে, বর্তমান কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন। এখানে সবচেয়ে দুরূহ বিষয় হচ্ছে দুটি দিকের ভারসাম্য রক্ষা করা—একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকরভাবে মোতায়েন করা এবং অন্যদিকে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেওয়া। এই দুয়ের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হচ্ছে, সেটিই হবে আমাদের পর্যবেক্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু।’
নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার বিষয়ে ইইউ প্রধান বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের বিষয়টি আমরা বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে দেখব। উদাহরণস্বরূপ, গণমাধ্যমে প্রত্যেক প্রার্থীর প্রবেশাধিকারের বিষয়টি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সংশ্লিষ্ট মিডিয়ায় প্রার্থীরা কতটা প্রচারের সুযোগ পাচ্ছেন, তা অনেক দেশেই একটি বড় ইস্যু। এছাড়া প্রার্থিতার বিষয়ে আপিল ও নিবন্ধনের আইনি দিকগুলোও আমাদের পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে।’
একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট: ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে প্রশাসনিক ও কারিগরি ঝুঁকির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইভারস ইয়াবস বলেন, ‘একই দিনে দুটো ভোট সাধারণত হয় না, তবে কিছু দেশে এমন নজির আছে। আমাদের মূল ম্যান্ডেট সংসদীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা, গণভোট নয়। তবে যেহেতু দুটো বিষয় পরস্পর সংযুক্ত, তাই নাগরিকরা সঠিক তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কি না এবং গণভোটের প্রভাব সংসদ নির্বাচনে পড়ছে কি না, সেদিকে আমরা বিশেষ মনোযোগ দেব।’
রোডম্যাপ, ফ্যাক্ট চেকিং ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন: সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ইইউ পর্যবেক্ষক দল আলাদাভাবে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচার ও অপপ্রচার মনিটর করার জন্য একটি পৃথক ‘ফ্যাক্ট চেকিং’ ইউনিট গঠন করেছে। ভোটাররা যাতে বিভ্রান্ত না হন এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেটিই এই ইউনিটের লক্ষ্য।
নির্বাচন পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে ইভারস ইয়াবস বলেন, ‘ভোটের দুই দিন পর অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি আমরা একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করব। আর পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার প্রায় দুই মাস পর একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’
সংবাদ সম্মেলনের শেষে ইভারস ইয়াবস আশা প্রকাশ করেন যে, এই মিশন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, ‘ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ হওয়া অত্যন্ত জরুরি। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে এই নির্বাচন একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হবে এবং আমাদের কাজ জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে।’
বিবার্তা/এসএস
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]