
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বড়াইল ইউনিয়নের জালশুকা গ্রামে পূর্বপুরুষদের নামের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে বাড়ির ভেতরে শত বছরের একটি ভবন ও নির্মীয়মাণ দ্বিতল ভবনবিশিষ্ট একটি পাঠাগার তৈরি করা হয়েছে। একইসাথে বাড়ির গুণী পূর্বপুরুষদের কথা তুলে ধরা হয়েছে পাথরে খোদাই করে। নামিডাকি মানুষের এ বায়োগ্রাফি যেন বাড়ির সমৃদ্ধ ইতিহাসকে সামনে নিয়ে এসেছে।
জেলা সদর থেকে জালশুকা যেতেমোটরসাইকেলে প্রায় আধাঘণ্টার পথ। গ্রামের ভেতরে ঢুকতে পিচঢালা পথ যেন সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেলে করে এ এলাকার মানুষ যাতায়াত করে জেলা কিংবা উপজেলা সদরে।
এলাকার মানুষ বাড়িটিকে চেনেন জালশুকা মোল্লাবাড়ী হিসেবে। বাড়ির সামনে পুরোনো টিনশেড ঘরের সামনে একটি ডাকবাক্স।
১৯৫৬ সালে এ বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত হয় ডাকঘর, যা অত্র অঞ্চলের মানুষের জন্য ছিল স্বপ্নসমান বিষয়। এ বাড়ির পূর্বপুরুষ আব্দুর রউফের হাত ধরেই ডাকঘরটি নির্মিত হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, পূর্বপুরুষদের ভিন্নভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। খোদাই করা পাথরে এ বাড়ির পূর্বপুরুষদের কথা লেখা হয়েছে। ওই লেখায় তুলে আনা হয়েছে আনসার আলী মোক্তার, তার ছেলে আব্দুর রউফ আর আব্দুর রউফের ছেলে আব্দুর রহিম ও আব্দুর রহমানের কথা।
বাড়ির ভেতরে স্থাপন করা পাঠাগারটি আধুনিক নকশায় নির্মিত। এটি ২০১২ সালে রেজিস্ট্রেশন করা হয়। পাঠাগারের নিচতলায় বই রাখার সেলফ নির্মাণ প্রায় শেষ। নিচেই একটি কক্ষে ডাকঘরের কার্যক্রম করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপরতলায় রয়েছে থাকার ব্যবস্থা। দূরদূরান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমী কিংবা বইপ্রেমী এখানে এলে নিজেদের মতো করে থাকতে পারবেন বলে জানিয়েছেন মোল্লাবাড়ীর সদস্যরা।
পাথরে লেখা আছে- আবদুর রউফ, ইপিইএস। ডাক নাম নওয়াব মিয়া। জালশুকা গ্রামের সম্ভ্রান্ত মোল্লাবাড়ির আনসার আলী মোক্তারের এ সন্তানের জন্ম ১৯০৮ সালে। আবদুর রউফ ১৯২৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন শেষে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা বিভাগে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন ইউনিভার্সিটি থেকেও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর তাঁকে ‘ওরেগন অ্যাম্বাসেডর টু পাকিস্তান’ হিসেবে বিরল সম্মাননা দেন।
ষাটের দশকে অবসর নিয়ে আবদুর রউফ অবসরোত্তর জীবন কাটাতে চলে আসেন নিজ জন্মভিটায়, নিভৃত জালশুকা গ্রামে। কর্মজীবন বা অবসর-সব সময়ই গ্রামের মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন তিনি। ১৯৩৯ সালে জালশুকা গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং বড়াইল ও গোসাইপুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখে অনগ্রসর এ অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছেন শিক্ষার আলো। দুর্গম গ্রামে যোগাযোগ সহজ করতে ১৯৫৬ সালে নিজ বাড়িতে ডাকঘর চালু করেন।
আনসার আলী মোক্তারের অন্য সন্তানদের মধ্যে ছিলেন, শামসুল হুদা ওরফে লাল মিয়া মুন্সী ও আব্দুল লাই জিল্লু মিয়া। লাল মিয়া ব্রিটিশ-পাকিস্থান আমলে দীর্ঘ ৩৫ বছর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ও জিল্লু মিয়া পুলিশের ডিএসপি হিসেবে ব্যুরো অব অ্যান্টিকরাপশনে কর্মরত ছিলেন।
আবদুর রহিম ওরফে হুমায়ুন। তিনি হুমায়ুন চেয়ারম্যান নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। আবদুর রউফের জ্যেষ্ঠ ছেলে হুমায়ুন তদানীন্তন সাদেকপুর পশ্চিম বর্তমানে বড়াইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত একটানা দায়িত্ব পালন করেন। অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠ ও সততার জন্য এলাকার মানুষের কাছে সমুজ্জ্বল তাঁর নাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন নিজ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় হুমায়ুন চেয়ারম্যানের অবদান অসামান্য।
আবদুর রহিম স্বাধীনতা উত্তরকালে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত হন। ঢাকায় ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়। এ ছাড়া ‘দৈনিক কিষান’ এবং ‘দৈনিক বাংলার মুখ’ সংবাদপত্রে কাজ করেন। ১৯৮৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কুমিল্লার ‘দৈনিক রূপসী বাংলা’র সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
আবদুর রহমান ওরফে আবু মিয়া হলেন, আবদুর রউফের চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় ও সুযোগ্য উত্তরসূরি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন তিনি। আবদুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে ১৯৬৪ সালে বিএ অনার্স এবং ১৯৬৫ সালে এমএ পাস করে কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হন। ভৈরব হাজী আসমত আলী কলেজ ও পরবর্তীতে ঢাকার আবু জর গিফারী কলেজে অধ্যাপনা করেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ে চাকরিকালীন পাবলিক রিলেশন বিষয়ে ১৯৮২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ফেলোশিপ এবং ইউনেস্কোর পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতে ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং কমিউনিকেশন’ শীর্ষক কোর্সে অংশ নেন।
কথা হয়, মোল্লাবাড়ীর বংশধর হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মোল্লাবাড়ীর এই অংশটুকুতে কেউ থাকেন না। তবে আমাদের বাড়ির ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এখানে পাঠাগার করা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই পাঠাগারটি চালু করার জন্য প্রস্তুতি চলছে। এ পাঠাগার থেকে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে বলে আশা করি।’
তিনি বলেন, ‘গ্রাম থেকে শহরে চলে গেলে কেউ আর গ্রামের বাড়িটির সেভাবে খোঁজ নেয় না। কিন্তু মোল্লাবাড়ীর ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরি মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাড়ির গুণী মানুষদের জীবনচিত্র তুলে ধরা, পাঠাগারে ঢোকার মুখেই চোখে পড়বে।’
ওই এলাকার বাসিন্দা মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ‘জালশুকা গ্রামের মোল্লাবাড়ীর আলাদা একটা ঐতিহ্য আছে। এ বাড়িতে কেউ না থাকলেও গ্রামের মানুষ বাড়ির সামনে যে ঐতিহ্যবাহী ডাকঘর আছে সেখানে বসে আড্ডা দেয়। বাড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখতে একটি সুন্দর পাঠাগার তৈরির বিষয়টি বেশ আশা জাগানিয়া। এ ছাড়া বাড়ির পূর্বপুরুষদের যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেটা সত্যিই ব্যতিক্রম।’
বিবার্তা/নিয়ামুল/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]