ফানুস ওড়ানো বন্ধে আইন জরুরি
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২২, ১৮:৪২
ফানুস ওড়ানো বন্ধে আইন জরুরি
মোঃ শফিকুল ইসলাম
প্রিন্ট অ-অ+

ফানুসের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ফানুস ওড়ানো এক ধরণের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফানুস উড়ানো হয়ে থাকে। খ্রিষ্টীয় নতুন বছর উদযাপন উপলক্ষ্যে বাড়ির ছাদে কিংবা মাঠে ফানুস ওড়ানো পুরানো সংস্কৃতি। কিন্তু এই ফানুস ওড়ানো যতটা না আনন্দের,তারচেয়ে বেশি এখন উদ্বেগ এবং আতঙ্কের। এখন আর ফানুস ওড়ানো শুধু নতুন বছর উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অতীতে শীত এলে বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হতো পিঠা উৎসব। এখন দিন বদলেছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা আর পিঠায় আগ্রহী নয়। শীত এলে তারা রাত জেগে বারবিকিউ পার্টি করতে পছন্দ করে। আনন্দের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিতে সঙ্গে যোগ হয় ডিজে পার্টি ও ফানুস উৎসব। এখন আর শীতকালের পার্টিগুলো ফানুস ছাড়া জাঁকজমক হয় না। তাই ফানুস ওড়ানোর মাত্রা অনেকগুণ বেড়েছে।


ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা বাজতেই রাজধানী ঢাকার প্রতিটি এলাকায় ফানুস ওড়ানো শুরু হয়। একযোগে ফোটানো হয় পটকা বা আতশবাজি। আর তাতে বিকটশব্দে কেঁপে ওঠে গোটা মহানগরী। ফানুসের আগুন ছিটকে পড়ে বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে।


কারণ, ফানুস যখন আকাশে ওড়ানো হয়,তখন কোন গাছে লেগে নিচে পড়ে গিয়ে আগুন লেগে যেঁতে পারে। এটা যদি বৈদ্যুতিক তার বা বাড়ির ওপর পড়ে তাহলে ঘটতে পারে মারাত্নক ও ভয়ানক দুর্ঘটনা। গত ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ইংরেজি নতুন বছর উদযাপন করতে গিয়ে ওড়ানো ফানুসে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা। তাই তেমন কোন বড় ধরণের ঘটনা দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে ঐরাতে রাজধানীর তেজগাঁও, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, মিরপুর রায়েরবাগসহ অন্তত ১০টি স্থানের বিভিন্ন জায়গায় বাসার ছাদ ও বিদ্যুতের তারে আগুন লাগার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এছাড়া ঢাকার বাইরে থেকে আরো ১৯০টি আগুন লাগার ঘটনার ফোন আসে। কিন্তু এটা নিয়ে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এটা নিয়ে আরো বেশি সতর্ক হতে হবে ।


ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শহরের মতো ঘনবসতি এলাকায় ফানুস ওড়ানোর কারণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হতে পারে। যদি ওড়ানো ফানুসগুলো রাজধানী বা গাজিপুরের কোনো বস্তি এলাকায় পড়তো,তাহলে আরো ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনার ঘটতে পারত। যা হতে পারতো অনেক মানুষের প্রাণহানি বা অনেক বড় অংকের আর্থিক ক্ষতি। যার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুতি ছিলাম না। তাই নববর্ষ উদযাপনে ফানুস ওড়ানো বন্ধ করতে চায় ফায়ার সার্ভিস।


ফানুসের কারণে এক্সিডেন্টাল আগুন ধরে কলকারখানা, জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। ফানুস ওড়ানো বন্ধ করা উচিত। তবে অনুমতি সাপেক্ষে এটি ওড়ানো যেতে পারে। কারণ ফানুস ওড়ানো অনেকের ধর্মীয় সংস্কৃতির ইতিহাস রয়েছে। তাই তাঁদের জন্য সম্পূর্ণভাবে ফানুস ওড়ানো বন্ধ করা যাবে না। তাই তাঁদের জন্য সীমিত আকারে অনুমতি দিতে হবে। কিন্তু তা কোনো জনবসতি,শহর কিংবা কলকারখানা এলাকায় নয়। সমুদ্রের তীরে এটি ওড়ানো যেতে পারে। আমরা কেউই চাই না যে আনন্দ থেকে কোন ধরণের দুর্ঘটনা ঘটুক। তাই এই বিষয়ে আমাদের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে, যাতে আমাদের ছেলে মেয়েদেরকে এই ফানুস ওড়ানো থেকে বিরত রাখতে হবে। সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, তা মেনে চলার দায়িত্ব আমাদের। কারণ শুধু বিধিনিষেধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করাটাও কঠিন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ঘরে ঘরে গিয়ে তো নিষেধ করতে পারবেন না। তাই সকল অভিভাবকদেরকে সচেতন হতে হবে এবং তাঁদের সন্তানদেরকে এই ফানুস ওড়ানো এবং আতশবাজি বন্ধ করতে উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে এই ধরণের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।


তাছাড়া এই জিনিসটি বিপজ্জনক হওয়ায় অনেক দেশেই নিষিদ্ধ। ২০১৩ সালের ১ জুলাই ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে সেখানকার সব থেকে বড় অগ্নিকাণ্ডে এক লাখ টন পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পুড়ে যায় এবং আনুমানিক ছয় মিলিয়ন পাউন্ডের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। স্মেথউইকের একটি প্লাস্টিকের রিসাইক্লিং প্লান্টে জ্বলন্ত ফানুস এসে পড়ায় এই আগুনের সূত্রপাত ঘটে। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়, পাউন্ডল্যান্ড ফানুস বিক্রি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০১৩ সালের ৬ জুলাই তাদের সব মজুদ সরিয়ে নেয়।


২০১৮ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো শহরের কাছে রিওসেন্ট্রো কনভেনশন সেন্টারের একটি প্যাভিলিয়নের ছাদে জ্বলন্ত ফানুস এসে পড়ায় প্যাভিলিয়নটি সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত হয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, চীন ও সানিয়া শহরে বিমান চালনা ও আকাশসীমা বিঘ্নিত হওয়ায় ফানুস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি অস্ট্রিয়ায় ফানুস উৎপাদন, বিক্রয়, আমদানি বা বিতরণ করা নিষিদ্ধ। আর্জেন্টিনা, চিলি, কলম্বিয়া, স্পেন এবং ভিয়েতনামেও ফানুস ওড়ানো অবৈধ। ১৯৯৮ সাল থেকে ব্রাজিলে ফানুস ওড়ানো একটি পরিবেশগত অপরাধ, যার ফলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।


তাই সরকারকে অনুরোধ করবো এই বিষয়ে আইন করে ফানুস ওড়ানো বন্ধ করা উচিত। ফানুসের পরিবর্তে আমরা অন্য কোন কিছুর মাধ্যমে নতুন বছরকে উৎযাপন করতে পারি। উদযাপন করতে ফানুস ওড়ানো লাগবে এই ধরণের সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। অন্যথায় আমরা অনেক বড় বিপদের সম্মুখীন হতে পারি। তাই ছেলে মেয়েদেরকে এখনই সময় ফানুস ওড়ানো ভালো কাজ নয়, অন্য যেসব মাধ্যমে আনন্দ– উৎসব করা যায় সেই সম্পর্কে তাদেরকে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলে গড়ে উঠবে এক নতুন সমাজ। যেখানে থাকবে কোন এক আগুন নামের আতঙ্ক। আনন্দ-উদযাপন হোক,তবে তা যেন দুর্ঘটনার কারণ না হয়ে ওঠে। একজনের আনন্দ যেন অন্যের ক্ষতি না করে। আমাদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস যেন অন্য মানুষের ভোগান্তির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন থাকা একান্ত প্রয়োজন।


লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল,ময়মনসিংহ


বিবার্তা/আবদাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com