"আওয়ামী লীগের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনা"
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:৩৯
অ্যাড. কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি
প্রিন্ট অ-অ+

ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টির পর মাত্র ২ বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন নাম ছিলো "পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ"। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই দলটির প্রথম সম্মেলন ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে দলটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শামসুল হক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর বয়স তখন মাত্র ২৯ বছর। তখন তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন।


অসাম্প্রদায়িক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত দলটি জন্মলগ্ন থেকেই দেশের ও জনগণের জন্য আন্দোলন করে গেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার আন্দোলন পর্যন্ত সকল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে এই দলটি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শরিক দল ছিলো আওয়ামী মুসলিম লীগ। এর আগেই ১৯৫২ সালে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এবং এর পরের বছর ১৯৫৩ সালের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু সাধারণ সম্পাদক হিসাবে নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগেই ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত এই দলটি তাদের নাম থেকে "মুসলিম" শব্দটি বাদ দেয়।


১৯৬৬ সালের ছয় দফা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। দেশের জনগণ বুঝতে পেরেছিলো ছয় দফা মূলত আমাদের মুক্তির সনদ। এরপর ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। যদিও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে কালক্ষেপণ শুরু করে। এবং ১৯৭১ সালের ৩ মার্চের সংসদ অধিবেশন বাতিল করে। সেই ঘোষণায় দেশের মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।



বঙ্গবন্ধু জনগণের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেন-
"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।"


এরপর আসে সেই ভয়ংকর ২৫ মার্চ। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। আওয়ামী লীগ অস্থায়ী সরকার গঠন করে। যে সরকারের নেতৃত্বে এই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। স্বাধীনতা লাভ করি আমরা।



স্বাধীনতা লাভের মাত্র ৩ বছরের মাথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারসহ হত্যা করা হয়। স্বাধীনতা বিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তির ইন্ধনে এই ঘটনা ঘটে। দেশের বাইরে থাকায় সেদিন বেঁচে যায় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধু নিহত হবার ফলে দলে টালমাটাল অবস্থার সৃষ্টি হয়। তার ৬ বছর পর ১৯৮১ সালের সম্মেলনে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সেই বছরের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর শুরু হয় স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে তার সংগ্রামের রাজনীতি। একের পর এক হত্যা চেষ্টার পরেও তিনি দমে যাননি। ১৫ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের ফলে ১৯৯৬ সালে প্রায় ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ৫ বছর পর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে পরাজিত হয়। আবার ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ্যতা লাভ করে নির্বাচনে জয়ী হয়। এরপর টানা ২ বার ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ জয়ী হয় এবং এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় আছে।


১৯৮১ সালের পর থেকে শেখ হাসিনাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। দেশের জনগণ তাকেই দলের যোগ্য সভাপতি হিসাবে মনে করে। আমরা আওয়ামী লীগের ২২ তম সম্মেলনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা মনে করি তার হাতেই দল ও দেশ নিরাপদ। যদিও বিভিন্ন সম্মেলনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন এসেছে।



আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গণমানুষের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এদেশের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে এই দলটি চিরকাল আন্দোলন সংগ্রাম করে গেছে। দলটি এদেশের সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবি। ৭৩ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ এদেশের জনগণের কাছে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছে। দলটির গৌরবজ্জ্বল আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস সেটাই প্রমাণ করে।



জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে আজ সুশাসন অক্ষুণ্ণ হয়েছে। তাঁর সুদক্ষ দেশ পরিচালনার ফলে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ আজ বাংলাদেশকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর করেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই আজ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ তাঁর ঐতিহাসিক লড়াই জারি রেখেছে। এখনো ধর্মের নামে আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে ধর্ম ব্যবসায়ীরা। আওয়ামী লীগ তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেই টিকে আছে।


আওয়ামী লীগের লড়াই এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য। তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশে আজ এশিয়ার রেকর্ড পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে। উন্নয়ন সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। আওয়ামী লীগ সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে এই বছরের ২৫ জুন আমাদের স্বপ্নের পদ্মাসেতু উদ্বোধন করেছে। শেখ হাসিনার দৃঢ় মনোবলের জন্যই নিজস্ব অর্থায়নে আমরা পদ্মাসেতুর কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছি । যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করতে চায়নি তারাই এখন স্বীকার করে নেয় আগামীতে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি হবে বাংলাদেশ। এসবই আওয়ামী লীগের অর্জন।


আওয়ামী লীগ এখন ২০৪১ সালকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে আওয়ামী লীগের কোন বিকল্প নেই। এই দেশের স্বাধীনতায় ও বিনির্মানে আওয়ামী লীগের রক্ত ঝরেছে। আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি আত্মত্যাগ কখনো কেউ এই দেশের জন্য স্বীকার করেনি। এখন তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। আওয়ামী লীগ সেভাবেই নিজেকে যুগের সাথে মিলিয়ে নিয়েছে।


আওয়ামী লীগের ২২ তম সম্মেলনের সম্মুখে আমরা দাঁড়িয়ে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব শুধু দলের জন্য নয় এটি দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে দলের সাথে দেশকেও এগিয়ে নেওয়ার দায়বদ্ধতা থাকে। সেই দায়বদ্ধতায় নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ বরাবরের মতো এগিয়ে যাবে। এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধশালী দেশে পরিণত হবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল হিসাবেই সারাজীবন রাজনীতি করে এসেছে এবং আমরা চাই সামনের দিনেও আওয়ামী লীগ তাঁর আদর্শ থেকে এক চুলও বিচ্যুত হবে না।


জয় বাংলা,
জয় বঙ্গবন্ধু,
জয় শেখ হাসিনা,
জয় হোক আওয়ামী লীগের।


লেখক: অ্যাড. কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি, সাবেক সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ যুব মহিলালীগ।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com