ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে আমূল পরিবর্তন দরকার
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:৩৯
ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে আমূল পরিবর্তন দরকার
নকিবুল ইসলাম সুমন
প্রিন্ট অ-অ+

ছাত্রলীগের যারাই শীর্ষ নেতা হন, তারাই দিনশেষে মনস্টার হয়ে যান। ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে যান। এভাবে চলতে থাকলে ছাত্রলীগ একটা সময় তার আবেদন হারাবে, যেটা মূল দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করবে। জবাবদিহিতা ও সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চালু করতে না পারলে ছাত্ররাজনীতি তার জৌলুস হারাবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।



যেহেতু ছাত্রলীগ করার নির্দিষ্ট একটা বয়সের কাঠামো রয়েছে, সেক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ও নির্দিষ্ট সময় পরপর সম্মেলন হওয়াটা একরকম বাধ্যতামূলক। একজন ব্যক্তির সব থেকে মূল্যবান সময় হচ্ছে ২৫-৩০ বছরের মধ্যকার সময়টা। এ সময়ে লাইফের গতিপথ ঠিক না হলে সে ব্যক্তি তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে সঠিক পথ হারিয়ে ফেলে। যে কারণে ওই ব্যক্তির পরিবার, সমাজ একাধারে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে যেখানে প্রতিটা সেকেন্ড, মিনিটের হিসাব হয় সেখানে সম্মেলনের নামে ২ বছরের জায়গায় ৫ বছর অতিবাহিত করা মানেই হচ্ছে লাখ লাখ ছেলেমেয়ের লাইফ থেকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ২-৩ বছর সময় হারিয়ে ফেলা।



সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের সময়োপযোগী আমুল পরিবর্তন দরকার। নিন্মোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে বোধকরি ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের জবাবদিহিতা ও ক্ষমতার অনেকটাই ভারসাম্য চলে আসবে।


*কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ ৩ বছর করে দেন। জেলা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর মেয়াদ দুই বছর করে দেন। এই সময়ের পরে কমিটি অটো ডিজলভড হয়ে যাবে। জাতীয় দুর্যোগ অথবা বিশেষ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ ২/৩ অংশের সমর্থন নিয়ে সর্বোচ্চ ৩ মাস সময় বৃদ্ধি করতে পারবে। অন্যথায় ঠিক তিনবছর পরে পূর্ব নির্ধারিত ক্যালেন্ডারের সময়সূচি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে সম্মেলন করতে হবে।


*আহবায়ক কমিটির মেয়াদ ৯০ দিন হবে এবং এরপর অটো ডিজলভড হয়ে যাবে। যদি বিশেষ প্রয়োজনে সময় বৃদ্ধি করতে হয় সেক্ষেত্রে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতার লিখিত অনুমতির প্রয়োজন হবে।


*কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের আকার ৩০১ মানে ৩০১। একজনও বেশি হবে না। কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পেতে হলে তার অন্তত দুই কমিটিতে ভিন্ন দুইটি সাংগঠনিক ইউনিটে পদ থাকতে হবে এবং ছাত্ররাজনীতির আয়ুষ্কাল মিনিমাম ৬/৭ বছর হতে হবে। এছাড়া ১০০/২০০ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দেয়া যাতে পারে সেটা অবশ্যই ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতৃত্ববৃন্দের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে।


*কেন্দ্রীয় কমিটির কাউকে অব্যহতি বা বহিস্কার করতে হলে কিংবা শূন্যপদে নতুন করে কাউকে পদায়ন করতে হলে সেটা নির্বাহী সংসদের এজেন্ডায় আনতে হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার মতামতের ভিক্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।


*দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হবেন শুধুমাত্র যুগ্ম সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদকরাই। কোনো ইউনিটের কমিটি গঠন বা ভাঙ্গার ক্ষেত্রে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সই লাগবে।


*সহ-সভাপতি যারা আছেন তারা নীতিনির্ধারণী যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন, তদন্ত কমিটিসহ সব উপ-কমিটির প্রধান হবেন এবং স্বতন্ত্র দায়িত্ব পালন করবেন।


*সম্পাদকীয় কাজগুলো স্ব স্ব সম্পাদক করবেন। সম্পাদকরা তাদের কার্যক্রমকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে প্রতিটা সাংগঠনিক ইউনিটের স্ব স্ব সম্পাদকদের নিয়ে কাজ করবেন। তাদের সহযোগিতা করবেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের স্ব স্ব উপ-সম্পাদকরা।


*প্রতি দুই মাস অন্তুর কার্যনির্বাহী সংসদের মিটিং এবং ছয় মাস অন্তর বর্ধিত সভার আয়োজন করতে হবে, যেটা ছাত্রলীগের নিজস্ব ক্যালেন্ডারে পূর্ব নির্ধারিত থাকবে।


*বর্তমান প্রেক্ষাপটে নেতৃত্ব নির্বাচনে কী কী ক্রাইটেরিয়া বিদ্যমান থাকতে হবে এবং কোন কোন বিষয় অযোগ্যতা হিসাবে বিবেচিত হবে সেটা নির্বাহী সংসদের মিটিংয়ের মাধ্যেমে পুনঃনির্ধারণ করা যেতে পারে। (মেয়েদের বিয়ে পুনঃবিবেচনা, ছেলে/মেয়েদের পার্ট টাইম চাকরি ইত্যাদি)


*পাঠাগার সম্পাদকের দায়িত্বে পার্টি অফিস এবং মধুর ক্যান্টিন লাইব্রেরি করতে হবে যেখানে প্রগতিশীল রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্র হবে।


*নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের চাওয়া একটা চিকিৎসা ফান্ড সাথে ছাত্রলীগের নিজস্ব ব্ল্যাডব্যাংক করতে হবে।


*প্রতি বছর ২০-৫০ জন মেধাবী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উচ্চশিক্ষার জন্য জাতির পিতার নামে মেধাবৃত্তি (ফুল ব্রাইট/আংশিক) চালু করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের কনফারেন্স, লিডারশিপ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। নেতাকর্মীদের জাতীয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অবদান স্বরূপ সংবর্ধনা ও ক্রেস্ট প্রদান কর্মসূচি থাকতে হবে।


*কোনো ইউনিটের সম্মেলন বা বর্ধিতসভা করতে গেলে ওই ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা এবং নিজ জেলার কেন্দ্রীয় নেতারা সম্মানিত অতিথি হবেন।


*ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ কেন্দ্রের একটা সাংগঠনিক ইউনিট হওয়া স্বত্বেও কেন্দ্রের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে হল নেতৃত্বের ভাগ দিতে হয়, সে প্রথার বিলুপ্তি ঘটাতে হবে।


*হল ক্যান্ডিডেটরা নেতা হতে না পারলে তারা বিশ্ববিদ্যালয় শূন্যপদে বা এক্সটেনশনে পদ নিতে হবে। তাদেরকে কেন্দ্রে পদায়ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।


*বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর শাখা ছাত্রলীগ দেখভালের জন্য কেন্দ্র থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা থাকবে। এদের আন্ডারে সকল ইউনিট কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতার সুপারিশ ও সাইন লাগবে।


* সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রেস না দিয়ে, প্রেস দেবেন শুধুমাত্র দপ্তর/উপ-দপ্তর সম্পাদক।


গঠনতন্ত্র সংশোধনীর মাধ্যমে উপরোক্ত বিষয়গুলো বাস্তবিক অর্থে রুপ দেয়া গেলে কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষমতার ভারসাম্য আসবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর রাজনীতিতেও একটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।


অনেক সময় দেখি একটা ছেলে বা মেয়ে হল, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মহানগর, জেলা বা উপজেলা কমিটিতে স্থান না পেয়ে কয়েকদিন কেন্দ্রে ঘুর ঘুর করে কেন্দ্রীয় নেতা বনে যান। এটা যেমন একই সাথে রাজনৈতিক চেইন ব্রেইক তেমনি কেন্দ্রের উপরে প্রেসার। এই প্রথার বিলুপ্তি ঘটিয়ে প্রতিটি সাংগঠনিক ইউনিটকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে।


আমাদের সুবুদ্ধির উদায় হোক। জাতির পিতার নিজ হাতে গড়া সংগঠন ভালো থাকুক, দেশ ও দশের উপকারে আসুক।


জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।


লেখক: সাবেক উপ-দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ


বিবার্তা/কেআর

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com