এ কি করে সম্ভব!
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৩৯
এ কি করে সম্ভব!
নাজমা শাহীন
প্রিন্ট অ-অ+

গতরাতের আগের রাতে, হঠাৎ করেই রাত সাড়ে চারটার দিকে ঘুম ভেঙে গেল। যেহেতু দেশে নাই তাই পাশে রাখা সেল ফোনটা একটু দেখার চেষ্টা করলাম জরুরি কোনো মেইল আছে কিনা! মেইলগুলি চেক করে দেখলাম fb এ অনেকগুলি নোটিফিকেশন। তার প্রথমটি টাচ করতেই দেখলাম একটা মিছিলের লাইফ! আবার কি হলো! বিষয়টি বোঝার জন্য যখন অন্যান্য status / নিউজগুলো দেখলাম .....শিউরে উঠলাম ঘটনাটি দেখে। বুয়েটের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি মেধাবী ছাত্রকে ৬-৭ ঘন্টা পিটালো যা তাকে এমন ভাবে আহত করলো যাতে তার internal haemorrhage এবং শক্ হয়ে মারা গেল!!


আমি হতবিহ্বল হয়ে গেলাম .....এ কি করে সম্ভব? ছেলেদের হলের কথা জানি না কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হলে দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর কাজের অভিজ্ঞতা আছে প্রথম আবাসিক শিক্ষিকা হিসেবে (২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত )তার পর প্রভোষ্ট হিসেবে শামসুন্নাহার হল ( ২০০৯-২০১১) এবং রোকেয়া হলে ( ২০১১-২০১৭)।


হলে কোন ঘটনা ঘটলে তৎক্ষণাত প্রভোষ্ট/ হাউজ টিউটরদদের হলে পৌছাতে হবে তা যত রাতই হোক। কারণ এ দায়িত্বটি ২৪ ঘন্টার। প্রভোষ্ট/ হাউজ টিউটররা ছাত্রদের look after করার জন্যই নিয়োজিত হন।


এ প্রসঙ্গে আমার একটি ঘটনা খুব মনে পরছে....২০০৯ সালে শামসুননাহার হলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিলো এবং তার পর পরই তৎকালীন প্রভোষ্ট পদত্যাগ করেন। আমি তখন দেশে ছিলাম না এবং ঘটনার বিস্তারিত জানিও না। ২০০৯ এর ৪ এপ্রিল দেশে ফিরে আসার পর আমাকে আরেফিন স্যার শামস্ননাহার হলের প্রভাস্টের দায়িত্ব নিতে বলেন কিন্তু প্রথম আমি রাজী হইনি কারন ২০০০ সাল থেকে রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষিকা ছিলাম সেইখানেই প্রভোষ্ট হিসেবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করবো। কিন্তু অন্য প্রভোষ্ট কাজ করছেন তাই সেটা সম্ভব নয়। স্যারকে বললাম যখন রোকেয়া হল খালি হবে তখনই প্রভোষ্টের দায়িত্ব নিবো কিন্তু অন্য কোনো হলে যাবো না। এ বিষয়টি নিয়ে স্যারের সাথে মত পার্থক্য হলো। স্যার বিস্ময়ের সাথে আতংকিত হয়ে জানালন যে ওই হলে একটি মেয়েকে হকিস্টিক দিয়ে মেরে তার পায়ের মাসেল থেতলে দিয়েছিলো এবং সময়মত সঠিক চিকিৎসা না হলে পা কেটে ফেলতে হতো! সেই সাথে আমাকে অনুরোধ করলেন হলটির দায়িত্ব নিতে এবং হলটির পরিবেশের যেন উত্তরন ঘটে তার চেষ্টা করতে। এই প্রেক্ষিতে শামসুননাহার হলের প্রভোষ্টের দায়িত্ব নিলাম ৫ মে ২০০৯ সালে।


কোন মাস মনে নেই কিন্তু অল্প কিছুদিন পর হঠাৎ দুপুর বেলা ছাত্রলীগের নেত্রী Afrin Nusrat এর ফোন পেলাম ছাত্রদলের এক সময়ের প্রভাবশালী নেত্রী লিলি হলে এসেছে এবং নুসরাতের হাতে দা দিয়ে কোপ দিয়েছে। আমি তখনও রোকেয়া হলের হাউজটিউটর কোয়ার্টারে থাকি। চারতলা থেকে দৌড়ে নেমে সামনে যে রিকশা পেলাম তাতে উঠে বললাম শামসুননাহার হলে চলো। আর চলন্ত রিকশায় বসে সিনিয়র হাউস টিউটরদের শিগগিরই হলে আসতে বললাম। হলের গেটে ঢুকার মুখেই যুগান্তর পত্রিকার সাংবাদিকের ফোন পেলাম যে আপনার হলে গন্ডোগোল হচ্ছে!


যাই হোক গেটে দাড়োয়ানদের সকল আবাসিক শিক্ষিকাদের খবর দিতে বলে আমি উক্ত রুমে যেয়ে দেখি ছাত্রদলের লিলি আর শেলী দুই নেত্রী রুমের ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে ভিতরে আর ছাত্রলীগের মেয়েরা সব বাহিরে । তারা তাদের protection এর জন্য একটি দা হাতে নিয়ে ভিতরে অবস্থান করছে আর ছাত্রলীগের মেয়েরা ওদের বের করার জন্য দরজা ধাক্কাচ্ছে আর জানালার কাঁচ ভেঙে ওদের আক্রমণের চেষ্টা করছে। সেই সময় নুসরাতের হাত কেটে আহত হয়েছে।


অসংখ্য মেয়ে ভির করে আছে তারা এ দুজনকে মারবেই। ইতিমধ্যে আবাসিক শিক্ষিকা ফেরদৌস আরা ডলি, মমতাজ শিরিনসহ আরো কয়েকজন এসে গেলেন। আবাসিক শিক্ষকরা ছাত্রলীগের মেয়েদের রুমের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে আটকে রাখলো কারণ ছাত্রদলের নেত্রীরা আশংকা করছে এরা বের হলেই ওদের মারবে তাই তারা দরজা খুলে বের হবে না। আমি তাদের assurance দিলাম আমি থাকতে তোমাদের গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না।


ছাত্রলীগের মেয়েদের দূরে আবাসিক শিক্ষিকারা আটকে রাখলো এই বলে যে আমরা ওদের রুম থেকে বের করছি তোমরা ধৈর্য্য ধরো। সেই ফাঁকেই আমরা ছাত্রদলের মূল নেত্রী লিলিকে চারদিক দিয়ে ঘিরে যেন কেউ দেখতে না পায় সেই ভাবে হলের ডাইনিং হলের ভিতর দিয়ে হলের পিছনের দিকে আবাসিক শিক্ষিকাদের কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হলো কেউ কিছু বোঝার আগেই।


আরেক জন ছাত্রদল নেত্রী শেলীকে সাথে নিয়ে আমি প্রভোষ্ট অফিসে আসি। হলের ছাত্রলীগসহ অসংখ্য মেয়ে এসে ভির করলো নুসরাতকে মেরেছে তাই এ দুজনকে তাদের কাছে দিতে হবে । সারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেত্রীবৃন্দ জড়ো হলো প্রভোষ্ট অফিস এবং হলের সামনে । সাথে সাথে ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীও জড়ো হয়েছে। উভয় পক্ষই অভিযোগ করছে যে তাদের মেরেছে। মেডিকেল সেন্টার থেকে ডাক্তার ডেকে সবাইকে দেখানো হলো। নুসরাতের হাতের ড্রেসিং করা হলো।


সর্বক্ষণ উপাচার্য মহোদয়ের সাথে যোগাযোগ হচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্রলীগের নেতারা এবং প্রসাশনের একাংশ পুলিশ ডেকে ছাত্রদলের দুই নেত্রীকে হস্তান্তর করতে হবে। তখন উপাচার্য স্যারকে বলে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে আমি আমার গাড়ি আবাসিক শিক্ষিকাদের বাসায় পাঠিয়ে লিলিকে ডলি আপা এমন ভাবে তুলে নিলেন যেন কেউ দেখতে না পায় অর্থাৎ আপার কোলে মাথা রেখে হলের গেট থেকে তুলে নিয়ে আমরা উপাচার্য অফিসে নিয়ে গেলাম কিন্তু ছাত্রলীগ নেত্রীবৃন্দের হাতে তুলে দেই নাই।


অনেক সাহস আর ধৈর্য্য লাগে আর সময় দিয়ে বিচক্ষণতার সাথে পরিস্থিতি সামলাতে হয়। আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি হলে কোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথে যদি প্রভোষ্ট/ আবাসিক শিক্ষকরা উপস্হিত হই তাহলে অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে পারি।


লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com