সউদিরা কেন রাজপথে নামে না
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০১৮, ১৯:১৬
সউদিরা কেন রাজপথে নামে না
ড. খালেদ এম. বাতারফি
প্রিন্ট অ-অ+

অনেক বিদেশি পর্যবেক্ষক ভেবে পাচ্ছেন না, আমাদের এ অঞ্চলের অনেক দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশা যখন জনবিক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দিচ্ছে, তখন সউদি আরব কিভাবে এর থেকে দূরে থাকতে পারছে? তাদের প্রশ্ন, তিউনিসিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারত্বের কারণে জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী। একারণে যদি এসব দেশে প্রতিবাদী মানুষ রাজপথে নেমে এসে থাকে, তাহলে সউদিরা কেন তা করছে না? সউদি আরবেও তো সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) চালু করা হয়েছে, জ্বালানি ও খাদ্যের ওপর থেকে ভর্তুকি কমানো হয়েছে, বেকারত্বের হার দু' অঙ্কের ঘরে গিয়ে পৌছেছে। এসবই কি সউদিদের রাস্তায় নামানোর জন্য যথেষ্ট নয়? কেন নয়?


আমি তাদের বলি, সউদি আরব ও আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর জীবনযাত্রার মান তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ ইরানের চাইতে অনেক উন্নত। এর কারণ হলো ইরান বিভিন্ন আরব দেশের বিদ্রোহীদের পেছনে বেশুমার অর্থ ব্যয় করছে, করছে তাদের বিদেশী সমর্থকদের জন্যও। এসব অর্থ তারা নিজ দেশের জনগণের জন্য খরচ করতে পারতো। একই সময় আরব উপসাগরীয় দেশের সরকারগুলো তাদের সর্বশক্তি ব্যয় করছে নিজ জনগণের অর্থনৈতিক দুর্দশা বিমোচনের কাজে। তাদের প্রতিটি আইন, প্রতিটি সিদ্ধান্তই নেয়া হচ্ছে দেশে ও বিদেশে আপন জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে।


উদাহরণ হিসেবে সউদি আরবের সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজকীয় ফরমানের কথাই বলি। জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের লোকসান পুষিয়ে দিতে সউদি সরকার এক কোটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে নগদ অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে। সাহায্যপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা সউদি আরবের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি।


মূল্যবৃদ্ধির ছোবল থেকে জনগণকে বাঁচাতে এর বাইরেও বাদশাহ সালমান আগামী এক বছরের জন্য সকল সরকারি কর্মচারী ও অবসরভোগীকে আরো আর্থিক ভর্তুকি দিয়েছেন। সকল ব্যাঙ্ক ও বড় কম্পানিও তা-ই করছে। দেশে ও বিদেশে যেসব ছাত্র বৃত্তি পাচ্ছে, মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের বৃত্তির পরিমাণ ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বেসরকারি স্কুল ও হাসপাতালকে ভ্যাটের আওতামুক্ত করা হচ্ছে। কোনো সউদি নাগরিক প্রথম বাড়ি কিনলে তার কাছ থেকে ভ্যাট নেয়া হবে না। আর এটা তো না-বললেও চলে যে, এদেশে কলেজ পর্যন্ত লেখাপড়া এবং ব্যাপক চিকিৎসাসেবা সবার জন্য ফ্রী।


সউদি-ইয়েমেন সীমান্তে যেসব সৈনিক দেশরক্ষায় নিয়োজিত, তাদের সকলকে পাঁচ হাজার রিয়াল করে বোনাস ইতিমধ্যে দেয়া হয়েছে। এর বাইরে তাদের বার্ষিক বেতনবৃদ্ধিও গত ১ জানুয়ারি থেকে চালু করা হয়েছে, যা এক বছর আগে স্থগিত করা হয়েছিল। বেকারদের চাকুরি দিতে নানা রকম বিধি জারি করা হচ্ছে। চাকরি না-হওয়া পর্যন্ত তাদের কিছু বেতন, বিনা খরচে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সোশ্যাল সার্ভিস দেয়া হচ্ছে।


সউদি আরবের একজন শিক্ষকের বেতন ৭,৫০০ রিয়াল। এর বাইরে আছে নতুন ও পুরনো আরো নানারকম ভাতা। এছাড়া একজন সউদি শিক্ষক বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি পান। আল্লাহ না-করুন, যদি তাঁর বাড়িটি বন্যায় ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে সউদি সরকার তাঁর অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করবে কিংবা তাঁর গাড়িটি নষ্ট হয়ে গেলে সেটি মেরামত করার অথবা নতুন একটি কেনার টাকা দেবে।


অপরদিকে একজন ইরানী শিক্ষকের মাসিক বেতন ৩০০ মার্কিন ডলার। এ পরিমাণ অর্থ দিয়েই তাঁকে পরিবার চালাতে হয়, যেখানে আছেন তাঁর স্ত্রী, মা-বাবা ও নিজের পাঁচ সন্তান। তাঁকে থাকতে দু'কামরার একটি ভাড়াবাড়িতে। এ শিক্ষক মানুষটি যখন দেখেন মাসিক ১,৫০০ মার্কিন ডলার বেতন, বিনা খরচে থাকা-খাওয়া-পরিবহন সুবিধা দিয়ে একজন আফগান বা পাকিস্তানী শরণার্থীকে সিরিয়া যুদ্ধের জন্য রিক্রুট করা হচ্ছে, তখন তিনি নিশ্চয়ই অনুভব করবেন যে তাঁর সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। কারণ, এই শিক্ষককেই তো বলা হয়েছে যে, স্কুলের উন্নয়নের মতো টাকা সরকারের হাতে নেই। অথচ সেই শিক্ষকই টেলিভিশনে দেখতে পাচ্ছেন আয়াতুল্লাহ খোমেনীর লেবাননী, ইরাকী ও ইয়েমেনী অনুসারীদের জন্য কী অকাতরে অর্থ ব্যয় করছে ইরান সরকার !


সউদি ও ইরানী শিক্ষকদের তুলনাটা হয়ে গেল ১৯৯০ দশকের একজন মার্কিন ও একজন সোভিয়েত শিক্ষকের মধ্যেকার তুলনার মতো। সত্যি বটে, উভয়ের চাহিদা ছিল আরো বেশি তবে একজন যা পেয়েছে তাতেই ছিল খুশি আর অন্যজনের হারানোর কিছু ছিল না।


শীত এলে যখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় চারদিক জমে যায়, জ্বালানি হয়ে যায় দুষ্প্রাপ্য ও দুর্মূল্য, তখন ইরানের সাধারণ জনগণ দেখতে পায় কিভাবে তাদের সরকার ব্যালাস্টিক মিসাইলের আতসবাজির পেছনে শত শত কোটি টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে আর বিনিময়ে পাচ্ছে সারা দুনিয়ার বৈরিতা, হয়ে পড়ছে নিঃসঙ্গ।


এসবের ফলে দেশটিতে খাদ্যপণ্যের মূল্য অনেক বেড়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কগুলোর কোষাগার হয়ে গেছে শূণ্য। বিনিয়োগ পরিস্থিতিও তথৈবচঃ। বিচারব্যবস্থা হয়ে পড়েছে দুর্নীতিগ্রস্ত। অবস্থা এখন এমন যে, এ মুহূর্তে যদি ওই এলাকায় ভূমিকম্প আঘাত হানে তাহলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া ছাড়া ওই শিক্ষকের কিছুই করার থাকবে না। কারণ, ইরান সরকার বিদেশে ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধ নিয়ে এতোই ব্যস্ত যে নিজ দেশের মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার, এমনকি তাদের কথা শোনার সময়ও তাদের নেই।


বিদেশে যুদ্ধ কিন্তু সউদি আরবও করছে। ব্যয়বহুল ইয়েমেন যুদ্ধের কথাই যদি ধরি, তাহলে বলবো, সউদিমাত্রই জানে যে, এটা কোনো খেয়ালখুশির যুদ্ধ নয়, বরং প্রয়োজনের যুদ্ধ। তারা জানে, আমাদের সৈন্যরা ইরানী মিলিশিয়াদের হাত থেকে দেশরক্ষায় ব্যাপৃত, যে মিলিশিয়াদের ঘোষিত লক্ষ্য হলো পবিত্র মক্কা ও মদিনা দখল করা। আমাদের নিরাপত্তা, দেশ, ধর্ম ও আত্মপরিচয়ের প্রতি এটা এখন সুস্পষ্ট ও বাস্তব হুমকি। যে কোনো খাঁটি আরব এ হুমকি মোকাবেলায় যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে দ্বিধা করবে না।


অন্যদিকে ইরান কী করছে ? নিজ দেশের তিন কোটি মানুষের খাদ্যসাহায্য কমিয়ে দিয়ে উদারভাবে সাহায্য করছে তাদের আরব, আফ্রিকান ও এশীয় এজেন্ট ও মিলিশিয়াদের এবং ওদের সাহায্যে সারা বিশ্বে ছড়াতে চাইছে শিয়া মতবাদ। বাড়াতে চাইছে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব এবং আরো চাইছে সেসব দেশের সরকারকে অস্থিতিশীল করতে, যাদের তারা মনে করছে ''সহযোগিতাপরায়ণ নয়'' এবং যথেষ্ট ''ইসলামী''ও (পড়ুন - জাফরী শিয়া) নয়।


সউদি গেজেট থেকে ভাষান্তর : হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com