কভিড-১৯: সংকটেও সম্ভাবনা
মৌলিক অধিকারে সমতা কতদূরে? (প্রথম পর্ব)
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৩২
মৌলিক অধিকারে সমতা কতদূরে? (প্রথম পর্ব)
ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল
প্রিন্ট অ-অ+

বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯ এর দৌরাত্ম্য চলছে। দীর্ঘ ১১ মাস হতে চললো করোনাভাইরাসের দাপট কমেনি এতটুকু। অধিকাংশ মানুষ এখনও গৃহবন্দী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে কবে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হবে কেউ জানে না। দারুণ এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। সব কিছু মিলিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের প্রচলিত পদ্ধতি এখন দুনিয়াজুড়ে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।


খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা এই পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে ঠিক এই মুহূর্তে চিকিৎসা সেবাই মানুষের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। সেই ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত মানুষ এটিই বেশী অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্য নিয়ে এ জাতি এতদিন এমন করে একদম ভাবেনি। উপেক্ষিত অবহেলিত স্বাস্থ্যখাতটি ২০২০ সালে এসে জানান দিলো যে, সে চাইলে গোঁটা পৃথিবী অচল করে দিতে পারে। মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিতে পারে শ্রেণীবৈষম্য। এক কাতারে নিয়ে আসতে পারে আশরাফ আর আতরাফকে। হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড-ই যেনো এখন সাম্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সেখানে কে কুলীন আর কে অকুলীন বুঝা দায়।


সামান্য সর্দি-জ্বরে অনেকেই বিদেশ বিভূঁই চষে বেড়াতেন। কি কারণে বিদেশ গেলেন জানতে চাইলে বড় বড় ঢেকুড় গিলে ভাব নিয়ে মোটা গলায় বলতেন, “এই একটু ঘুরে এলাম
আরকি, তেমন কিছু না। ঠাণ্ডা ভাব ছিল তাই সামান্য চেক-আপের জন্য গিয়েছিলাম”। যেনো ওখানে না গেলে তার জাত বাঁচে না। দেশের অর্থ বিদেশে খরচ করে করোনাপূর্ব
সময়ে এমন রসিকতা অহরহ জাতি পরখ করেছে। আর তাইতো করোনাভাইরাস এমন এক অদ্ভুত শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হলো যেন মুহূর্তেই সকলকে অহেতুক বিদেশ ভ্রমণের
কথা অন্তত কয়েক মাসের তরে বেমালুম ভূলিয়ে দিলো। চিকিৎসার নামে দেশের বাইরে কে কবে কব্জি ডুবিয়ে কতটুকু খেয়েছিল, কারা কতটা লাগেজ ভরে শপিং করেছিল, কে কত জানা-অজানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছিল এবং রোমান্টিসিজম ও ফ্যান্টাসিতে অভ্যস্থ বাঙালী জাতি দামী হোটেলে থাকার নামে কতশত ডলার খরচ করে দেশের অর্থ বিদেশে বিলিয়েছিল, করোনাভাইরাস যেনো কড়ায়-গণ্ডায় তার হিসেব নিয়ে নিলো। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সবকিছু বন্ধ করে দিলো। মনে হচ্ছে প্রশিক্ষণের নামে, চিকিৎসার নামে বিদেশ-বিভুইয়ে আমাদের পূর্বের সব অযাচিত ব্যয় এখনো পুরোপুরি বৈধতা পায়নি অর্থাৎ করোনা এখনো সেগুলোকে চুড়ান্ত অডিট ছাড় দেয়নি। তাই এ ক’মাস সকলকে গৃহবন্দী রেখে পুরনো অপচয় পুষিয়ে নিতে করোনা একটা দারুণ প্রতিশোধ নিলো।


সবকিছুতেই যেহেতু হিলিং চলছে তাই এটাও আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের অটো-হিলিং নয় কি? করোনাতো উপলক্ষ্য মাত্র। যদি তাই না হতো তাহলে সারা পৃথিবীর মানুষ কেনো নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে? কেনো নিজেকে বাঁচাতে ঘরে খিল লাগিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে? মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে সব দেশের জল, স্থল আর আকাশ পথ বন্ধ করে চোখে আঙ্গুল দিয়ে করোনা দেখিয়ে দিলো পালাবার পথ নেই। ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। এমনকি খিড়কী এঁটে ঘরে বসে থাকবারও উপায় নেই। সেখানেও ঘটে যেতে পারে এ বিপদ। তাই আমির-ফকির, আশরাফ -আতরাফ, কুলিন-অকুলীন, ব্রাহ্মণ-শুদ্র ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে এখনো যারা আসীন হননি, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি-করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনো নিজেকে শুধরে নিন।


লেখাটি যখন লিখছি তখন বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে যাওয়া সংবাদটি হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত। ৭৪ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট এবং ৫০ বছর বয়সী ফার্স্ট লেডি করোনাভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে আছেন। তারা দুজন এখন কোয়ারেন্টিনে আছেন। গত ২ অক্টোবর মি. ট্রাম্প নিজেই এক টুইট বার্তায় এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তাছাড়া, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, কসোভোর প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ হোতির, ক্যানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী সোফি গ্রেগরি ট্রুডো, মোনাকোর প্রিন্স দ্বিতীয় আলবার্ট, রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশোস্টেন, গিনি-বিসাউ এর প্রধানমন্ত্রী নুনো গোমেজ নাবিয়াম, হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট হুয়ান অর্লান্দো হার্নান্দেজ, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশেনিয়ান, গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট আলেখান্দো গিয়ামাত্তসহ বেলারুশের
প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো করোনায় আক্রান্ত হন। পাত্তা দেননি বলে গত ১৩ জুন আফ্রিকার দেশ বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট পিয়েরে এনকুরুনজিজা করোনাভাইরাসে মারা গেছেন। অতএব, বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি অদৃশ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসে বিপর্যস্ত গোটা পৃথিবী। অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি, ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রপ্রধান, সৈন্য, অস্ত্র, জোট, মহাজোট, পরাশক্তি সব যেন অসহায় এই ক্ষুদ্র অণুজীবটির কাছে। এ থেকে শিক্ষা না নিলে আর কার কাছ থেকে কবে শিক্ষা নেব? সাম্যের শিক্ষা নেয়ার জন্য এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কি হতে পারে?


ইমিউনিটি ধরে রাখতে খাদ্যের নিরাপত্তার অবস্থান রয়েছে চিকিৎসা সেবার পরের ধাপেই। করোনাকালীন মানুষের দুর্গতি বেড়েছে অকল্পনীয়ভাবে। এরই মধ্যে করোনার প্রভাবে শুধুমাত্র বাংলাদেশেই প্রায় ১৫টি খাতে চাকুরী খুইয়েছে ২০ মিলিয়ন লোক। তাদের আহাজারি আর আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে আছে। প্রণোদনা নামক রাষ্ট্রীয় অক্সিজেন দিয়ে তাদের বাঁচানোর কঠিন চেষ্টা করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। কিন্তু দিন শেষে ক’জন টিকে থাকতে পেরেছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যন এখনো আমাদের কাছে নেই। বেঁচে থাকার এ সংগ্রাম করোনা ভয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এতদিনে অনেকটাই স্বাভাবিক করে দিয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। একদিকে পেটে ক্ষুধা অন্যদিকে চাকুরী হারানোর ভয়। পাছে বেরুলেই করোনার সংক্রমণ। ত্রিমাত্রিক সঙ্কটে নিমজ্জিত জাতি দীর্ঘ সাত মাস ধরে অদ্ভুত এক নিয়তির সঙ্গে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সবকিছু সামলে মানুষ যখন করোনাকে অনেকটা দুর্বল করে দিতে সক্ষম প্রায়, ঠিক তখনই দেখা দিলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রকৃতিও যেন তার সব সহনশীলতা জগৎ সংসার থেকে তুলে নিয়েছে। বন্যা আর নদীর ভাঙ্গনে আজ দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নাস্তানাবুদ। এরই মধ্যে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় উপাসনালয়ে আগুনে পুড়ে নির্মম মৃত্যুবরণ তথা নারায়ণগঞ্জ মসজিদ ট্রাজেডি, নৌ-পথে লঞ্চ-ট্রলার ডুবি, সড়কে মৃত্যুর মিছিল, খুন, আত্মহত্যা, ধর্ষণের পরে মেরে ফেলা এসবতো আছেই। পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবতা।


যারা নন-কোভিড রোগী এবং নিতান্ত বাধ্য হয়ে হাঁসপাতালের শরণাপন্ন হচ্ছেন তাদের অবস্থা আরো ত্রাহি ত্রাহি। সাধারণ আম-জনতা তো বটেই অনেক ভিআইপির’র ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে যে শুধুমাত্র কভিড-১৯ সন্দেহে একজন নন-কোভিড রোগীর রাস্তায় প্রাণ গেছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে এ্যাম্বুলেন্স এ হাসপাতাল ও হাসপাতাল করে আর কোথাও ভর্তির সুযোগ না পেয়ে অবশেষে পথেই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন অনেকেই। এ সারিতে সরকারের আমলা থেকে শুরু করে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এটাতো মানবতার চরম বিপর্যয়। মৌলিক চাহিদার মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব এই মুহূর্তে চিকিৎসা ও খাদ্য বন্দোবস্তর পরেই। সকলের মধ্যে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তা হচ্ছে শিক্ষাঙ্গন খুলবে কবে? করোনাভাইরাস যদি কোনোদিনই পৃথিবী থেকে না যায় তাহলে কি হবে? কতকাল বন্ধ থাকবে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান? করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার মতো পরিস্থিতি এখনও হয়নি বলে সম্প্রতি মত জানিয়েছিল কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সরকার গঠিত জাতীয় পরামর্শক কমিটি। তাই ছুটি বাড়িয়ে আগামী ৩১ অক্টোবর করা হয়। একথা বুঝতে কারো অসুবিধে নেই যে করোনা সংক্রমণ পুরোপুরি থেমে না যাওয়া পর্যন্ত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান খোলা সঠিক হবে না। এখানে একটি প্রজন্মের টিকে থাকার বিষয়টি জড়িত। এর সাথে জড়িত রয়েছে অভিভাবকদের ভাবাবেগের বিষয়। সব মিলিয়ে দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারই এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাই দল মত নির্বিশেষে সকলেই একমত পোষণ করেন যে, মহামারির ভয়ঙ্কর সংক্রমণ রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত অবশ্যই যৌক্তিক।


এ প্রসঙ্গে অতীত ইতিহাস দেখলে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, একশো বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লু-এবং তারও একশো বছর আগে প্লেগ এর দাপটের সময় বিভিন্ন দেশে স্কুল-কলেজ বন্ধের উদাহরণ ছিল সংক্রমণ রোধের অন্যতম উপায়। এই মুহূর্তে তাই শিক্ষার প্রচলিত পদ্ধতি ভুলে অভিনব পন্থা খুঁজে নিতে মরিয়া গোটা বিশ্ব। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পূর্বাভাস ধরেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। করোনার সাথে অভিযোজিত হতে হবে সবাইকে। ফলে ধরে রাখতে হবে শিক্ষাখাত, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সবকিছু।


অন্যখাতগুলো আংশিক সচল থাকলেও স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ধীরে ধীরে সেশনজট প্রকট হচ্ছে। দেশের পলিসি-মেকারসহ শিক্ষা পরিবারের সাথে যুক্ত প্রত্যেকের চিন্তা এখন কি করে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে প্রশ্ন জাগে কভিড-১৯ আসলেই কি শুধু সমস্যা নিয়েই এলো? নাকি উম্মুক্ত করে দিলো নতুন সম্ভাবনার দ্বারও? (জানতে চোখ রাখুন আগামী পর্বে)।


লেখক: প্রফেসর ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল
ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
Email: [email protected]


বিবার্তা/এনকে

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com