বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার চারা গাছটি ছাটতে ছাটতে এখন উপড়ে ফেলতে চায়!
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৬:৫৭
বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার চারা গাছটি ছাটতে ছাটতে এখন উপড়ে ফেলতে চায়!
এফ এম শাহীন
প্রিন্ট অ-অ+

বাঙালির জাগরণের মহাজাদুকর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, "আমি ধর্মনিরপেক্ষতার একটি চারাগাছ বাংলাদেশে রোপণ করেছি। এই চারাগাছ যদি কেউ ছিঁড়ে ফেলতে চায়, উপড়ে ফেলতে চায়, তবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।" ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে তাঁর আজীবন সংগ্রামে অর্জিত ধর্মনিরপেক্ষতার চারা গাছটি উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল ঘাতকেরা। যার ফলশ্রুতিতে বারবার অস্তিত্ব সংকটে পড়তে হয়েছে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশকে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করা বাঙালি বীর সন্তানেরা বারবার এই অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। বুক পেতে রক্ত ঢেলে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রাণের স্বদেশের নির্মাণের জন্য।


দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু কন্যা যখন বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন পরিচয় নির্মাণ করতে চলেছে ঠিক তখনই শুরু হয়ে নব্য ষড়যন্ত্র। ইতিহাসের কলঙ্ক মোচন করে যখন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ও যুদ্ধপরাধিদের বিচার করে খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত করেছে তখন নানা কৌশলে আবারো শুরু হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ অপশক্তির আস্ফালন। আওয়ামী কিছু আদর্শহীন নেতাদের হাত ধরে এবং তাদের আপোষকামিতায় এই অপশক্তিকে রাষ্ট্র , প্রশাসন ও আওয়ামী লীগে পুনর্বাসন করে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার চারা গাছটি ছাটতে ছাটতে এখন উপড়ে ফেলতে চায় তারা। লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত সংবিধানকে তারা বারবার চ্যালেঞ্জ করে এক সাম্প্রদায়িক জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।


স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রহণ করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করায় স্বাধীনতার পরাজিত ধর্ম ব্যবসায়ী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী যারা বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধসহ সব আন্দোলন ও সংগ্রামকে ইসলাম ধর্মকে ‘বর্ম’হিসেবে ব্যবহার করে বাধাগ্রস্ত করার হীন অপচেষ্টায় নব্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত । অথচ তারা এটাও জানে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, তাবলিগ জামাতের জন্য জায়গা প্রদান, মদ-জুয়া, ঘোড়দৌড় বন্ধ, ইসলামী সম্মেলন সংস্থার কর্মকান্ডে অংশগ্রহণই প্রমাণ করে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান বাঙালির ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতি জাতির পিতার অগাধ শ্রদ্ধার কথা।


১০ জানুয়ারি ’৭২ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো-কোটি মানুষের সামনে বলেছিলেন, ‘সকলে জেনে রাখুন-বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র এবং পাকিস্তানের স্থান চতুর্থ। ...। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ইসলামের নামে এ দেশের মুসলমানদের হত্যা করেছে। ইসলামের অবমাননা আমি চাই না। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোন ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এ দেশে কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকুক।’


৩ জুলাই ’৭২ কুষ্টিয়ার জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘...। কিন্তু ঐ ধর্মের নামে রাজাকার, ধর্মের নামে আলবদর, ধর্মের নামে আলসামস্ আর ধর্মের নামে ব্যবসা করতে বাংলাদেশের জনসাধারণ দেবে না, আমিও দিতে পারবো না। কারণ এই ধর্মের নামে পশ্চিমারা আমার মা-বোনকে হত্যা করেছে। আমার দেশকে লুট করেছে। আমার সংসার খতম করেছে, আমার মানুষকে গৃহহারা করেছে। সেই জন্য এ রাষ্ট্র চলবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র যেমন চলে।’


১৮ জানুয়ারি ’৭৪ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে, যারা সাম্প্রদায়িক-তারা হীন, তাদের অন্তর ছোট। যে মানুষকে ভালোবাসে সে কোনো দিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আপনারা যাঁরা এখানে মুসলমান আছেন তারা জানেন যে, খোদা যিনি আছেন তিনি রাব্বুল আল-আমীন-রাব্বুল মুসলেমিন নন। হিন্দু হোক, খ্রিষ্টান হোক, মুসলমান হোক, বৌদ্ধ হোক-সমস্ত মানুষ তাঁর কাছে সমান। ...। যারা এই বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা করতে চায় তাদের সম্পর্কে সাবধান হয়ে যেও। আওয়ামী লীগের কর্মীরা, তোমরা কোনো দিন সাম্প্রদায়িকতাকে পছন্দ করো নাই। তোমরা জীবনভর তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছ। তোমাদের জীবন থাকতে হবে-যেন বাংলার মাটিতে আর কেউ সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করতে না পারে।’


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সফল সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের জন্য খুব দামী একটা কথা বলেছিলেন, ‘বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল নয়, ভবিষ্যতে ধর্মীয় উগ্রবাদই হবে আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


ঠিক তাই গত কয়েক যুগ ধরে স্বাধীনতাবিরোধী বিএনপি-জামায়াত এর পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা ধর্মান্ধ জঙ্গি অপশক্তির আস্ফলন দেখছে বাংলাদেশ। আবার বিগত এক যুগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ নেতা ভোগ-উপোভগ-সম্ভোগের মোহে পেলেপুষে যে দানব তৈরি করেছেন তার দাঁত নখের আঁচড় তো সহ্য করতেই হবে ! দুধ কলা দিয়ে সাপ পুষলে তার ছোবলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তার প্রমাণ দেশের মানুষ বারবার পেয়েছে । কিন্তু অতীত থেকে শিক্ষা নিতে আমাদের মহান নেতাগণ ভুলে গেছেন বারবার।


গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে স্বাধীনতা বিরোধী পিতাদের সন্তান সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম যিনি পীর সাহেব চরমোনাই নামে অধিক পরিচিত এবং বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস সভাপতি মাওলানা মামুনুল হক এর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নিয়ে ধৃষ্টতামূলক বক্তব্য সবাই দেখেছি। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষে এসে এমন ধৃষ্টতামূলক বক্তব্য দিতে পারে দেখে দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মানুষেরা ভীষণ হতাশ ও সংক্ষুব্দ। তারপর যখন রাষ্ট্র প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের এর ‘পর্যবেক্ষণে আছি’এমন কথা শোনার পর এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের আপোষকামী নিরাবতায় !


জাতির পিতার জন্মশতবর্ষে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে এমন সাহস কোথা থেকে পায় এবং কারা দেয় ? একাত্তরে মীমাংসিত রাষ্ট্রে দাঁড়িয়ে এমন ধৃষ্টতা বাঙালি কখনো মেনে নেয়নি আর নিবেও না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নেতাকর্মী এখনই সোচ্চার হয়ে এই সকল ধর্মব্যবসায়ীদের দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিতে না পারলে সামনে ভয়াবহ সংকট মোকাবেলার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।


আজ যত উন্নয়ন বা প্রবৃদ্ধির কথাই বলা হোক না কেন, সাম্প্রদায়িক শক্তির বীজে বেড়ে ওঠা ধর্মান্ধদের থাবায় সবই ভেস্তে যাবে এবং মনে রাখা দরকার তাদের চাপাতির কোপের রেঞ্জের বাইরে কোনো প্রগতিশীলই নয়। টার্গেট যেন আমরা সবাই, সব ধর্মের মানুষ।


বিশ্বাস করি এই সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে বাংলার সংস্কৃতি ও সম্প্রীতিই প্রতিরোধ গড়তে পারে। আর সেই সম্প্রীতির বজায় রাখার যুদ্ধে একমাত্র উৎস হতে পারে জাতির পিতার আজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।


এই সকল উগ্র ধর্মান্ধ অপশক্তির সাম্প্রদায়িকতার আগ্রাসন থেকে বাংলার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুদৃঢ় করে সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীকে রুখে দিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এখন সময় আমাদের সব ধরনের সক্ষমতা একীভূত করে শক্ত হাতে এদেরকে নির্মূলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা। আমাদের আজকের দৃঢ় পদক্ষেপই পারে আগামীতে আমাদের সন্তানদের জন্য এক প্রগতিশীল ও নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ রেখে যেতে।


বিশ্বাস করি, রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তের আবহমান বাংলায়। লালন-হাছনের সুরে বিমোহিত হওয়া সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের সম্প্রীতির দেশে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ঠাই হতে পারে না। মনে রাখবেন-একমাত্র মানুষের মিলিত প্রতিরোধই পারে এই অন্ধকার শক্তির উৎস বিরুদ্ধে লড়াইটা জারি রাখতে। মানবতার জন্য-মুক্তিযুদ্ধের জন্য-প্রগতির জন্য একত্রিত হওয়ার এখনই সময়।


লেখক: সাধারণ সম্পাদক , গৌরব ’৭১, সংগঠক, গণজাগরণ মঞ্চ


বিবার্তা/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com