"প্যানডেমিক, অনলাইন শিক্ষা ও বাংলাদেশ"
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২০, ১৩:৪০
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

লকডাউন তুলে দেয়ার পরে ইউরোপ ও আমেরিকার মত দেশগুলোতে আবারো করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বাড়ছে। দিন দিন বাংলাদেশেও করোনার প্রকোপ ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এমতাবস্থায় কবে নাগাদ সব কিছু পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক হবে সেটা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না।


সরকার একই সাথে প্যানডেমিক মোকাবেলা এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সীমিত আকারে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খুলে দিলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অচিরে খোলা সম্ভবপর নয় সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য এভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার অর্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে মূল্যবান সময়ের অপচয় হওয়া। বিগত তিন মাস শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কার্যত শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে দূরে সরে রয়েছে এতে করে মানসিক প্রতিকূল পরিবেশের সৃষ্টি হতে পারে এবং সেশনজটের মত অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া লাগতে পারে। এই সকল অদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দিতে অনলাইনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম ভালো বিকল্প হিসাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে এবং আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতসহ পৃথিবীর অনেকে দেশে সেটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।


বিশ্বায়নের এই যুগে অনলাইনে ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা ভর্তি এটা নতুন কোন পদ্ধতি নয়। উন্নত বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় দূর শিক্ষার কার্যক্রম চালু থাকলেও বাংলাদেশের স্বীকৃত কোন বিশ্ববিদ্যালয় এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কোন বিষয়ের উপর কোনরকম দূর শিক্ষা কার্যক্রম চালু নেই। করোনাকালীন সংকট মোকাবেলায় বিগত কিছুদিন যাবৎ বেসরকারি কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব উদ্যোগে অনলাইন ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে এবং শিক্ষার্থীদের সাড়াও নাকি বেশ ভালো পাচ্ছে, ৬০% উপরে। এরই ধারাবাহিকতা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গত ২৫ শে জুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ভিসিদের নিয়ে একটি ভার্চুয়াল মিটিং করেন এবং সেখানে ইউজিসির চেয়ারম্যান সকল ভিসিদের অনুরোধ করেন তারা যেন অচিরে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে নিয়েছেন তারা জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করবেন তবে পরীক্ষা এবং সকল প্রকার ভর্তি সেটা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরে। এটা নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করার জন্য কতটা সক্ষমতা বা আগ্রহ রাখে? প্রশ্নটা যতটা সহজ প্রতিপাদ্য মনে হয় আসলে ততটা সহজ নয়।


অনলাইনে ক্লাস নেয়ার জন্য যেসকল অনুষঙ্গ গুলো সব থেকে বেশি প্রয়োজন সেগুলো ঠিকঠাক থাকলেই কেবলমাত্র সহজ প্রতিপাদ্য প্রতিপাদ্য বলে প্রতীয়মান হবে।


বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে কারিগরি ও অবকাঠামোগত সরঞ্জামাদি নাই। শিক্ষকদের অনেকে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনায় যথেষ্ট প্রস্তুত নন। স্ট্যাটিস্টিক বলছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা একটি বড় বাধা, ৩৭% শতাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ল্যাপটপ নাই, ১৩% শিক্ষার্থীর স্মার্ট ফোন নেই। অনলাইনে ভিডিওতে সংযুক্ত হতে হলে উচ্চ গতিসম্পন্ন নেটওয়ার্ক দরকার অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিধ, নিম্নমধ্যবিত্ত ফ্যামিলির, মফস্বল থেকে বেড়ে উঠা, যেখানে উচ্চ গতিসম্পন্ন ৪জি নেটওয়ার্ক পাওয়া যেমন দুষ্কর তেমনি বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন নয়। এদের মধ্যে যারা সংযুক্ত হতে পারবে তাদের অনেকের কাছে মহমারির এই সংকটের সময় ইন্টারনেটের দামও একরকম বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। যাদের জন্য এই আয়োজন, সেই তাদের বড় একটা অংশ যদি এই আয়োজনে শামিল হওয়ার সামর্থ্য না রাখে তাহলে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সফলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। শিক্ষাটা যেহেতু সার্বজনীন সেহেতু সবার সুবিধা অসুবিধা আমলে নিতে হবে।


তবে আশার কথা হচ্ছে, এসকল সমস্যা গুলো গুরুতর কিংবা স্থায়ী কোন সমস্যা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি সমন্বিত প্রয়াস নিয়ে আগান তাহলে 'ডাইল্যুশন' বা সিস্টেম লস অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা কোন বাজেট রাখা হয়নি তাই ইউজিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা সরকারের কাছে বিশেষ বরাদ্দ চাইবেন। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রথমত অনলাইন শিক্ষার জন্য পরিকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, শিক্ষার্থীদের ফ্রি নেট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্বল নেটের কারণে যারা লাইভ স্ট্রিমিংয়ে সংযুক্ত হতে পারবে না তাদের জন্য শিক্ষকরা ক্লাসের পাঠ্যসূচি ও বক্তৃতা রেকর্ড করে ইন্টারনেটে আপলোড করবেন যাতে করে শিক্ষার্থীরা সেটা ডাউনলোড করে পড়তে পারেন। প্রয়োজনে যেন প্রতিটি শিক্ষার্থী ফোনে বা ইমেইলে শিক্ষকের সাথে আলোচনা করতে পারে সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে।


শুধু অনলাইনে কম-বেশি ক্লাস নিলে যে সংকটের সমাধান হয়ে যাবে তা না, এর জন্য চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর শিক্ষা ক্যালেন্ডার সাথে সমন্বয় করে বেশি বেশি ক্লাস, পরিক্ষা নিয়ে আশু সমস্যার সমাধানে দিকে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে সাইন্স ফ্যাকাল্টির এমন কিছু সাবজেক্ট রয়েছে যেগুলোর থিউরিটিকাল পড়ানোর পাশাপাশি ল্যাবে প্রাকটিক্যাল দেখাতে হয়, তাদের জন্য অনলাইনে ক্লাসের থেকে গুরুত্বপূর্ণ হবে সব কিছু স্বাভাবিক হলে মেকাপ ক্লাসের মাধ্যমে ক্ষতিটা পুশিয়ে নেয়া।


অনলাইনে পড়াশোনার নানান সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা আছে তবে এ যুক্তিতে এর বিরুদ্ধাচরণ না করে সবার উচিত হবে কিভাবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে অধিকতর কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করা যায় সেদিকে নজর দেওয়া। আমরা কেউ নিশ্চিত নই কবে নাগাদ কোভিড মহামারি থেকে পরিত্রাণ পাবো, কবে নাগাদ সব কিছু পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক হবে। সরকার থেকে শুরু করে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক সবাই আমরা এখনকার দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মনেপ্রাণে মুক্তি চাই। তবে যতদিন না মুক্তি পাচ্ছি ততদিন সবার সহযোগিতায় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম সীমিত আকারে হলেও চালু থাকুক।


লেখক: শেখ নকিবুল ইসলাম সুমন,
এম.ফিল গবেষক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


বিবার্তা/জহির

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com