শিক্ষক সমাজ, শিক্ষা উপকরণ ও ডিজাইনিং সফটওয়্যার
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২০, ১৩:৪২
শিক্ষক সমাজ, শিক্ষা উপকরণ ও ডিজাইনিং সফটওয়্যার
মো. হাবিবুল আলম
প্রিন্ট অ-অ+

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যতগুলো বিষয়ে বাংলাদেশ এগিয়েছে বা এগিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে প্রযুক্তি অন্যতম। প্রযুক্তিগত এই অগ্রগতি আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হলে কর্মীদের পেশাগত দক্ষতা বাড়বে। উদাহারণ হিসেবে বলা যেতে পারে একজন শিক্ষকের কথা যিনি প্রায়সই শিক্ষা উপকরণ তৈরির কাজ করেন যেমন পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন। ধরা যাক, হঠাৎ করেই ক্লাস লেকচারের প্রয়োজনে একজন শিক্ষকের দ্রুততম সময়ে একটি ইমেজ ফাইল থেকে লেখা কপি করা প্রয়োজন। অন্য উপায় না পেয়ে তিনি হয়ত লেখাটি টাইপ করতে উদ্যত হবেন, যা বেশ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রযুক্তির সহায়তায় বিকল্প উপায়ে টাইপ না করেই ওয়ার্ড ফাইলে পরিবর্তন করতে পারতেন সেই শিক্ষক। সেই শিক্ষক হয়ত জানতেন না জিমেইল অ্যাকাউন্ট থেকে গুগল ড্রাইভের সহায়তায় খুব সহজেই ইমেজ থেকে লেখা মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে রুপান্তর করা যায়।পাশাপাশি গুগল ভয়েসের সহায়তায়ও টাইপ করে ওয়ার্ডে পরিবর্তন করা যায়।


অনেক সময় দ্রুততম সময়ে একটি ওয়ার্ড ফাইল পিডিএফ করা প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু সেই অপশনটি হয়ত একজন শিক্ষকের কম্পিউটারে নেই। এক্ষেত্রে শিক্ষককে জানতে হবে অনলাইনে অনেক কনর্ভাটর পাওয়া যায় যা দিয়ে সহজেই পিডিএফ করা যায় কোন প্রকার খরচ ছাড়াই। হয়ত এই করোনাকালে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে বলা হল অনলাইনে মিটিং হবে কিন্তু একজন শিক্ষক জানেন না কীভাবে গুগল মিট বা জুমের মত অ্যাপস
ব্যবহার করতে হয়। অথচ মোবাইল বা ল্যাপটপে এসব অ্যাপস যুক্ত করে ভার্চুয়াল মিটিং সহজেই শেষ করতে পারেন একজন শিক্ষক। এসব অপরিহার্য দক্ষতা অর্জন একজন শিক্ষকের যেমন পেশাগত দক্ষতা বাড়ায় তেমনি কাজে আনে গতি। ফলে তিনি সহজেই অন্য সহকর্মীদের প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হন।


পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায় সকল শিক্ষককেই কনটেন্ট তৈরির কাজ করতে হয় যেমন প্রেজেন্টেশন তৈরি; ভিডিও ক্লিপস কেটে ছোট বা বড় করা; ছবি বা স্লাইডে ইফেক্ট ব্যবহার করা; ছবির কলাজ তৈরি; পাওয়ার পয়েন্টকে ইমেজ বা ভিডিও ফাইলে পরিবর্তন করা ইত্যাদি। তরুণ প্রজন্মের অনেক শিক্ষকের কাছে এসব কাজ সহজ হলেও অধিকাংশ শিক্ষকদের কাছে উল্লিখিত কাজগুলো সহজসাধ্য এমনকি বোধগম্যও নয় কেন না এসব কাজ বাস্তবায়নে প্রয়োজন বেশ কিছু সফটওয়্যার। যেমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হয়ত জানেন না ইউটিউব থেকে একটি ভিডিও কীভাবে ডাউনলোড করতে হয় অথচ ইউটিউব ডাউলোডারের মাধ্যমে যেকোন ভিডিও সহজেই ডাউনলোড করা যায়। একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক যিনি শিশুদের পাঠদান করেন সেই শিক্ষকের কনটেন্ট স্বভাবতই আকর্ষণীয় হওয়া উচিত। বইয়ের কনটেন্টের বাইরে গিয়েও শিক্ষকরা ডিজাইনিং এবং ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার যেমন ফটোশপ, ইলাসট্রেটর, অ্যাডোভ প্রিমিয়ার প্রোর, পিকাসা ব্যবহার করে ছবি ক্রপ করা; ছবির কলাজ এবং বিভিন্ন আকৃতি তৈরি; ভিডিও বা অডিও ক্লিপস কেটে ছোট করা; বিভিন্ন প্রকার শব্দ তৈরি ও যোগ করা; চমৎকার স্লাইডভিত্তিক প্রেজেন্টটেশন প্রস্তুত এমনকি পরিবর্তনও করতে পারেন। ফলে অতি সহজেই একঘেঁয়ে কনটেন্ট হয়ে উঠে বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং আকর্ষনীয়।


আমরা সবাই জানি প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই মিটিং, আলোচনা সভা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতা হয়ে থাকে যেখানে প্রচুর আমতন্ত্রণপত্র, চিঠি, ম্যাগাজিনসহ অন্যান্য ডকুমেন্ট প্রস্তুত করার প্রয়োজন হয়। এসব কাজ ইলাসট্রেটটরের টাইপ টুল আর কিছু বেসিক ডিজাইন এর সমন্বয়ে ডকুমেন্ট সহজেই অত্যন্ত আকর্ষণীয় করা যায়। বাইরের সাহায্য না নিয়ে একজন শিক্ষক সহজেই এসব কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। বর্তমানে শিক্ষা উপকরণ যেমন ছবি এনিমেশন, র্কাটুন, সচেতনমূলক পোস্টার ইত্যাদি আরও আকর্ষণীয় করতে অ্যাডোভি আফটার ইফেক্ট ব্যবহারের প্রচলন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তাই ফটোশপ, ইলাসট্রেটর, প্রিমিয়ার প্রোর মত সফটওয়্যারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার শিক্ষা উপকরণ প্রস্তুতে শিক্ষকরা সক্ষম হলে অনলাইন কনটেন্টের ওপর নির্ভরতা যেমন কমবে তেমনি শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা উপকরণ হবে আরও আকর্ষনীয় হবে।


অন্যদিকে একজন শিক্ষক হয়ে উঠবেন আরও দক্ষ আর আত্মবিশ্বাসী। এখন প্রশ্ন হল কোন কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের পদক্ষেপ নেবে? আমরা জানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এসব প্রকল্পে ফটোশপ, ইলাসট্রেটর বা প্রিমিয়ার প্রোর মত সফটওয়্যারসহ কনটেন্ট তৈরি করার অন্যান্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার নিয়ে প্রশিক্ষণ আয়োজন করতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, মাধ্যমিক পর্যায়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এই প্রশিক্ষণ সমন্বয় করতে পারে। যেমন, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের এক বছরের প্রশিক্ষণে শিক্ষা উপকরণ তৈরির বিষয়টি অর্ন্তভুক্ত করা যেতে পারে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নিয়মিতই প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয় যেখানে এই বিষয়ও অর্ন্তভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে বিএড বা সমমানের শিক্ষক প্রশিক্ষণে একই উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, এসব বেসিক টুলস ও সফটওয়্যার শিখতে ৪-৫টি দিনব্যাপী ক্লাসই যথেস্ট।সরকারি এসব প্রশিক্ষণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পড়ান এমন শিক্ষক বা আগ্রহী শিক্ষকদের মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে তৈরি করা যেতে পারে যারা পরবর্তীতে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিবেন।


পাইলট প্রকল্প হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রশিক্ষিত করা গেলে দেশে নারীর ক্ষমতায়নের উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। সরকারের পাশাপাশি শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, দাতা সংস্থা শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগীর ভূমিকা পালন করতে পারে। উল্লেখ্য, অনেক শিক্ষক হয়ত জানেন না সরকার স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট প্রোগ্রাম নামক একটি উদ্যোগ নিয়েছে যেখানে গ্রাফিক্স ডিজাইন নিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে শিক্ষকরা ব্যাক্তিগত উদ্যোগে এই সুযোগটিও নিতে পারেন।এখন প্রশ্ন হল, যদি সরকার বা বেসরকারি সংস্থা এই উদ্যোগ নিতে রাজি না তাহলে কীভাবে একজন শিক্ষক নিজেকে গড়ে তুলবেন? সরকারি উদারনীতির ফলে দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট অনেক সহজলভ্য হয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়েও এখন ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যায়। ফলে মোবাইলে ইউটিউব দেখেও একজন সহজেই শিখতে পারেন। মোবাইল দেখে শিখলেও চর্চার জন্য প্রয়োজন হবে কম্পিউটার। ডিজিটাল সরকার তৈরির প্রচেষ্টায় প্রায়


প্রতিটি স্কুলে কম্পিউটার দেয়া হয়েছে। এই সুবিধা নিয়ে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারগুলো ইন্সটল করে নিয়মিত চর্চা করলেই দ্রুত প্রয়োজনীয় এ কৌশলগুলো রপ্ত করতে পারবেন একজন শিক্ষক। করোনাকালে সরকার আগে থেকে তৈরি করা কনটেন্ট টিভি ও ইউটিউভে প্রচার করছে যা নিশ্চিত ভাল একটি উদ্যোগ। তবে সকল শিক্ষককে শিক্ষা উপকরণ তৈরির ব্যাপারে দক্ষ করতে পারলে শিক্ষকরা নিজেরাই কনটেন্ট তৈরি, পরিবর্তন ও ব্যবহার করতে পারবেন। ফলে কারও তৈরি করে দেয়া কনটেন্টের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। পরিশেষে বলা যায় সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগে শিক্ষা উপকরণ তৈরির বিশেষয়াতি সফটওয়্যারগুলো কাজে লাগাতে শিক্ষকদের দক্ষ করতে পারলে সরকারি খরচ কমবে, অন্যদিকে বাড়বে দক্ষ জনবল এবং শিক্ষা উপকরণগুলো হবে আরও আকর্ষণীয়


লেখক: অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট
সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/এনকে

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com