করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব আর নয়
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২৩:২০
করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব আর নয়
ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল
প্রিন্ট অ-অ+

গোটা বিশ্বে ভয়াল থাবা বসিয়েছে করোনাভাইরাস (কভিড-১৯)। একটু দেরিতে হলেও এই ভাইরাস আক্রমণ করেছে বাংলাদেশে। ইতোমধ্যে দেশে শতাধিক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মিলেছে। আরো অনেককে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তবে করোনা প্রভাব যতটা ভয়াবহ তার অধিকগুন ভয়াবহ হচ্ছে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজব। এই রোগ সম্পর্কে এমন কিছু গুজব রটানো হচ্ছে যা মানুষের মনোবল নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলে মানুষ তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে।


করোনা নিয়ে ভাইরাল হওয়া গুজবগুলো হলো-করোনা থেকে রক্ষা পেতে-গোমূত্র পান; থানকুনি পাতার রস পান; অ্যালকোহল ভিনেগার গরম পানি পান; করোনা হলেই নিশ্চিত মৃত্যু ; স্বপ্নে পাওয়া ঔষধ সেবন ; রসুন লবন আদা জল খাওয়া; বাড়ি ভাড়া তিন মাসের জন্য মওকুফ; ব্যাংক ঋন ও বিদ্যুৎ বিল তিন মাসের জন্য স্থগিত; হেলিকপ্টার দিয়ে করোনাভাইরাস রোধে ঔষধ ছিটানো; নো কিট নো টেষ্ট-মারা গেলে নিউমোনিয়ায় শেষ; সরকারের ত্রান-সামগ্রী বিতরণ করবেন শুধু সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী; ইত্যাদি।


করোনাভাইরাসতো প্রথমে পশু থেকে পশুতে অতঃপর মানব দেহে ছড়িয়ে মহামারী আকার ধারণ করেছে। অথচ গুজবের উৎস কোন পশু-পাখি নয়। এর উৎস মানুষ। মানুষই সরাসরি একজন থেকে আরেক জনে শেয়ার করার মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বত্র। ভারচুযাল জগতের কাল্পনিক অবাস্তব ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দ্বারা আমাদের মেধা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। অন্যের অনুভূতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার এই প্রক্রিয়াকে কন্টেইজেন বা সংক্রামিত হওয়া বলে। এটা করোনার চেয়েও ভয়াবহ ছোয়াচে।


গুজবকে তথ্য বলা যায় কিনা? একজন তথ্য পেশাজীবী হিসেবে স্পষ্ট উত্তর 'না'। গুজবকে তথ্য বলা যায় না। তথ্য হচ্ছে ডেটার পরিশোধিত অর্থপূর্ণ একটি রুপ। সমাজ, সময় ও মানুষ এই তিনের দারুন মিথস্য়িযায় ডেটা পরিশোধিত হয়ে বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপনায় অন্যের নিকট তথ্য হিসেবে প্রকাশিত হয়। এতএব অনায়াসে বলা যায় গুজব তথ্য নয়।


করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দ্রুত আবিষ্কারের লক্ষ্যে এর জিনোম সিকোয়েন্স এর রহস্য জানা যেমন জরুরি, অনুরুপ, গুজব থেকে রক্ষা পেতে এর উৎস জানা তেমনই জরুরি। নইলে গোটা বিশ্বে আমরা একটি হুজুগে জাতি হিসেবে পরিগনিত হব। আমাদের মনে রাখতে হবে প্রিন্ট মিডিয়া বা অন-লাইনে যে সকল খবর কিংবা ভিডিও প্রকাশিত হয় তা সবই সত্য নয়। সত্যটাকে একটু সময় দিয়ে উদঘাটন করতে হয় আর মিথ্যাটা অবচেতন মনে সময় নেই বলে আলসেমির সুযোগে মনে স্থান করে নেয়। অথচ যে কোনো তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তথ্যবিজ্ঞানী গডেন ১৯৯৩ সালে ছয়টি প্যারামিটার আবিষ্কার করে গেছেন। যেগুলো হলো- তথ্যের কোয়ালিটি, কন্টেন্ট, ভাষা, কাঠামো, নিরভরযোগ্য উৎসও জীবনকাল। যেকোনো বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ এই ছয়টি প্যারামিটারের সাহায্যে অতি সহজেই তথ্যের সত্যতা নিরুপন করতে পারে। দরকার শুধু একটু সময় নিয়ে ভাবার।


করোনাভাইরাসের এই মহা-দুর্যোগের মধ্যেও হাজার হাজার ভূয়া ভিডিও সোসাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ ভেরিফাই বা মূল্যায়ন না করে এগুলোতে লাইক, শেয়ার কিংবা ফরোয়ার্ড করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? ভিডিও মূল্যায়নের কিছু নীতিমালা রয়েছে। আপনি চাইলেই ভিডিওগুলো নীতিমালার আলোকে যাচাই-বাছাই করতে পারেন। একটু দেখে নিন ভিডিওটির ফরম্যাট কি রকম? এর পরিধি কতটুকু? ভিডিওটিতে ক্রেডিট দেয়া রয়েছে কিনা? উপস্থাপকের সুনাম সম্পর্কে আপনি অবগত কিনা? সমজাতীয় কাজের সাথে ভিডিওমেকারের কতদিনের সম্পর্ক? ভিডিওতে তথ্যের বিন্যাসপদ্ধতি ও উপস্থাপনা কি রকম? সবশেষে দেখুন এটির কোনো সাবস্ক্রিপশন ফি চাওয়া হয়েছে কিনা? এসব বিবেচনায় নিয়ে একজন লেম্যান ভিউয়ার-ও অতি সহজে ভিডিওটির যথার্থতা যাচাই-বাছাই করতে পারেন।


যদি থিউরি প্রয়োগ করে সোর্স নিশ্চিত হওয়া না যায় তাহলে কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে। ধরুন আপনি একটি খবর পেলেন, বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যালে ১০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। সন্দেহ হলে আপনার ফোন-বুক চেক করে সংশ্লিষ্ট কাউকে ফোন করুন। নতুবা ওয়েবসাইটে গিয়ে উক্ত মেডিক্যালের তথ্যকেন্দ্রে ফোন করুন। খবরটি ক্রস-চেকের জন্য বরিশালের সিভিল সার্জনকেও ফোন করতে পারেন। এক্ষেত্রে টেলিফোন ডিরেক্টরী কিংবা ভেরিফায়েড ওয়েবসাইট দুটোই তথ্যের মাধ্যমিক উৎস যা আপনাকে নিশ্চিত তথ্য প্রাপ্তির লক্ষ্যে তথ্যের প্রাথমিক উৎসে রেফার করে। অন-লাইনের একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের কারনে আমরা তথ্যের প্রাথমিক উৎস ছাড়া অন্য কোনো উৎসে আস্থা রাখতে পারি না। তাই যে মাধ্যমেই তথ্য প্রকাশিত হোক না কেনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হলে আমাদেরকে তথ্যের প্রাথমিক উৎসের ওপর নির্ভর করতেই হবে।


সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে যে টুইটারে গুজব অন্য সব মাধ্যমের চেয়ে ৬গুন বেশী দ্রুত ছড়ায় এবং বেশী শেয়ার হয়। এর কারন টুইটারে ব্যবহারকারী বেশি ও বিশ্বব্যাপী সেলিব্রিটিদের অধিকাংশের আইডি টুইটারে। পশ্চিমা বিশ্বে টুইটারে গুজব বেশী ছড়ালেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ফেসবুকে বেশি গুজব ছড়ায়। তাছাড়া ভূয়া আইডি খুলে ফেসবুকে বিভ্রান্তি ছড়ানো একটি অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাডিয়েছে। সঠিক মনিটরিং ও রেগুলার ফেসবুক ফিল্টারিং এর মাধ্যমে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। এছাড়াও ফেসবুক পিউরিটি সফটওয়্যার এর টেক্সট ফিল্টার এক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক। যদিও বাংলাদশে এখনো ফেসবুক ফিল্টারিং এ প্রযুক্তি খুবই অপ্রতুল। ফেসবুক নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতেই থাকছে ফিল্টারিং এর আসল কর্তৃত্ব।


তথ্য মন্ত্রণালয়ের গুজব প্রতিরোধ ও অবহিতকরন সম্পর্কিত ১৯ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি রয়েছে। এই কমিটি গুজব সংক্রান্ত খবর আদান-প্রদান এবং কমিটির আওতাভূক্ত দপ্তর সমুহ গুজব প্রতিরোধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। গুজবের বিষয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হতে দ্রত লিংকসমুহ বন্ধ ও প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য বিটিআরসি তাদের সুপারিশ অনুযায়ী তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তাছাড়া কমিটি গুজব প্রতিরোধে মূলধারার গন-মাধ্যমে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করে। ৫ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব রটানোর দায়ে প্রযুক্তির সহায়তায় ৫০ এর অধিক আইডি বন্ধ করেছে। ৪০ এর অধিক কন্টেন্ট মুছে দিয়েছে। ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ১০ জনকে ডেকে এনে বোঝানোর পর তারা ইতিবাচক স্ট্যাটাস দিয়েছে। সন্দেহ করা হচ্ছে গোটা দেশে ১৫০ এর মতো আইডি থেকে করোনাভাইরাস নিয়ে নানা ধরনের ভীতিকর গুজর ছড়ানো হচ্ছে।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারলে গুজব ডাল-পালা গজায়। এক্ষেত্রে সঠিক তথ্য সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তির নিকট সম্পুর্ণ সঠিক পন্থায় পৌঁছাতে হবে। ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন জনসাধারণকে তথ্য প্রাপ্তির পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। সরকারের স্বচ্ছতার পথ তৈরী করে দিয়েছে এ আইন। যদিও এই আইনে তথ্য-প্রাপ্তির পরিসর অত্যন্ত সীমিত। গুজব রটনাকারীদের শাস্তির বিষয়ে এ আইনে তেমন কিছু উল্লেখ না থাকলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সংগে সংগে গুজবের ব্যাপকতা ছাড়িয়ে গেছে সবকিছু। ডিজিটাল প্রযুক্তির আগে নির্দিষ্ট একটি এলাকায় হয়তো গুজব সীমাবদ্ধ ছিল। আর এখন পুরো দেশ এমনকি গোটা বিশ্ব গুজবের শিকার হচ্ছে। খুব অবাক হতে হয় যখন দেখি কোনো গুজবের সত্য মিথ্যা যাচাই না করে আমরা তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় মত্ত হয়ে ধ্বংস করছি এলাকা। হত্যা করছি মানুষ। অস্থিতিশীল করে তুলছি বাজার। অশান্ত করে দিচ্ছি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র। পরক্ষণেই যখন বুঝতে পারি যে পুরো বিষয়টি ছিল নিছক গুজব, তখন যে আর কিছুই করার থাকে না। ইতোমধ্যে ঘটে গেছে প্রানহানির মতো ঘটনা।


মানুষ বাস্তবতার চেয়ে তার আবেগ দ্বারা বেশী প্রভাবিত হচ্ছে। সে যৌক্তিক ধারণা থেকে সরে গিয়ে তার গোষ্ঠী, দল, দর্শন, নীতি ও আদর্শ এর বলয় দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছে। ফলে ঘটনাটি গুজব জানলেও কায়েমী স্বার্থের কারনে মানুষ তা সত্য বলে প্রচার করছে। অর্থাৎ স্বীয় বিচার-বুদ্ধির বদলে মানুষ তার মস্তিষ্কের অন্যএকটি প্যারাসাইটের প্রভাবে কাল্পনিক ধারনাপ্রসূত হয়ে নিয়ন্থিত হচ্ছে এবং গুজব রটাচ্ছে যা কভিড-১৯ থেকেও ভয়ংকর।


গুজব নিয়ে অপেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গিতে কথাবলার দিন এখন আর নেই। কারন, তথ্যের অবাধ প্রবাহে উৎস বিশ্লেষণে পেশাদারিত্বের ভূমিকা পালনের মধ্যে নিহিত রয়েছে গুজবের বিস্তার রোধ। যেমনটা হোম-কোয়ারেন্টাইন, সামাজিক দূরত্ব, আইসোলেশন, সাবান পানিতে হাত-ধোয়া ও স্বাস্থ্য-বিধি মেনে চলার ওপর নিরভর করছে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ।


সবচেয়ে বড় কথা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর মিছিল যেমন দীর্ঘ হচ্ছে তেমনি এর সাথে জ্যামিতিক হারে বাডছে সোসাল মিডিয়ায় করোনা নিয়ে গুজবের হার। এর থেকে পরিত্রাণের জন্যে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা শতভাগ কাজে লাগাতে হবে। প্রত্যয় ব্যক্ত করতে হবে করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব আর নয় ।


লেখক: ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/আবদাল

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com