সাম্প্রদায়িকতা নয়, চাই মানবিক বাংলাদেশ
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:৩৩
সাম্প্রদায়িকতা নয়, চাই মানবিক বাংলাদেশ
ফারজানা মাহমুদ
প্রিন্ট অ-অ+

ধর্মের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশসূমহের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান ও চিহ্নিত সমস্যা। সাম্প্রদায়িকতার সাথে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ, বৈষম্য, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিপীড়ন ও নির্যাতন, জঙ্গিবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ ইত্যাদি সম্পৃক্ত। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান নিয়ে কিছু বলতে গেলে আমাদের কিছুটা ইতিহাস জানতে হবে। ফিরে যেতে হবে উপমহাদেশের বিভক্তি, পাকিস্তানের শাসনামল এবং বাংলাদেশের জন্মলগ্নের ইতিহাসে। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয় ইসলাম, যা অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের সাথে ছিলো সাংঘর্ষিক।


পূর্ব পাকিস্তানকে অবদমনের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ধর্ম এবং নৃতাত্ত্বিকতার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার কৌশল অবলম্বন করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক নীতিমালা ও শোষণের কারণে ১৯৬০ সালে বাঙালি হিন্দুদের বিশাল একটি অংশ ভারতে চলে যায়। বিপুল সংখ্যক দেশান্তরিত হিন্দুদের তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য শত্রুসম্পত্তি আইন, ১৯৬৫ প্রণয়ন করা হয়। অধ্যাপক আবুল বারাকাতের মতে,পূর্ব পাকিস্তানকে ইসলামিক করে তোলার উদ্দেশ্যই এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এই আইনটির আরেকটি উদ্দেশ্য ছিলো বাঙালিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে তাদের ঐক্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। বাঙালিদের স্বাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বিনষ্ট করার জন্য ইসলামিক জাতীয়তাবাদের উপর জোর দেয়া হয়,বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে ভারতের চক্রান্ত বলে প্রচার করা হয়। পাকিস্তানের ইসলামিক জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষার উপর ভিত্তি করে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ,যা পরববর্তীতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।


১৯৭০ এর নির্বাচনী ইশতেহারে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করে, যা সেই সময়ের পরিস্থিতিতে অকল্পনীয় কিন্তু ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে ছিল গ্রহণযোগ্য। পশ্চিম পাকিস্তানের নির্যাতন, নিপীড়ন,বৈষম্যে জর্জরিত বাঙালিরা যখন ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ঠিক সেই সময়ে বাঙালির স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আদায়ের আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান ও তাদের দোসর জামায়াত-ই-ইসলাম স্বাধীনতা যুদ্ধকে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং পাকিস্তানকে বিভক্ত করার জন্য ভারতের একটি চক্রান্ত বলে আখ্যায়িত করে। ১৯৭১ সালে বিপুল সংখ্যক ধর্মীয় সংখ্যালঘু সহ প্রায় ১ কোটি বাঙালি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে। যারা পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ফেরত চলে আসে। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম শুধু পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর উপর আমাদের বিজয় নয়, এটি পাকিস্তানের ধর্মান্ধ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির বিজয়ও বটে।


কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, যুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশে কিছু সংখ্যক মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চেতনা জাগ্রত ছিল,যা মূলত সামাজিক ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বিনষ্টের ষড়যন্ত্র। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপক্ষতার উপর প্রথম আঘাত আসে যখন রাজনীতিবিদ-লেখক আবুল মনসুর আহমেদ দাবি করেন-বাংলাদেশের জন্ম ১৯৪০ সালের লাহোর রেজুল্যুশনের প্রতিচ্ছবি। দেশি ও বিদেশি স্বাধীনতাবিরোধী চক্র স্বাধীনতার অর্জনকে ব্যর্থ করার জন্য সাম্প্রদায়িকতাকে উষ্কে দেয় ও দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজা মণ্ডপে ভাঙচুর করে এবং হিন্দুদের উপর চালায় নির্যাতন।


সাম্প্রদায়িকতার অন্তরালে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন রুখে দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বদ্ধপকির, ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের বিতর্কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, “কাউকে অন্যের ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে দেয়া হবে না, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি বা হস্তক্ষেপ চায় না। ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।”


১৯৭২ সালের সংবিধানে সব ধরণের সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার, ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য ও নির্যাতন রুখে দেবার অঙ্গিকার করা হয়। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্য ধর্মের শিক্ষা গ্রহণে কাউকে বাধ্য করা যাবে না বলে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়। সংবিধানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা হয় এবং সর্বোপরি অনুচ্ছেদ ৯ এর মাধ্যমে বাঙালি ভ্রাতৃত্ববোধ যার মূলে আমাদের ভাষা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাকে সমুন্নত করার অঙ্গিকার করা হয়। কিন্তু সংবিধান প্রণয়নের পরপরই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আমাদের মহান সংবিধানে লিপিবদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে স্লোগান দেয়-“জয় বাংলা জয় হিন্দ, লুঙ্গি ছেড়ে ধুতি পিন্দ।” এই স্লোগানের মাধ্যমে রাজাকার স্বাধীনতাবিরোধীরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে ভারতীয় ‘জয় হিন্দ’ এর অনুকরণ বলে উল্লেখ করে এবং বাঙালিরা ভবিষ্যতে লুঙ্গি ছেড়ে ধুতি পরবে বলে দাবি করে। সুতরাং বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে ভারতীয় এবং হিন্দুয়ানি তকমা লাগিয়ে সাম্প্রদায়িকতার উস্কানিতে অভ্যন্তরীণ শান্তি শৃঙ্খলা রুখে দেয়ার পাঁয়তারা একদল দেশবিরোধী করে এসেছে।



ব্যারিস্টার ফারজানা মাহমুদ


কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধূলিসাৎ করে মুক্তিযুদ্ধকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্জনকে বিনষ্ট করার বিশাল ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৭ সালে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে মুছে ফেলা হয়। ২৫(২)অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ইসলামিক দেশগুলোর সাথে ভ্রাতৃত্ব ও সৌহাদ্য বৃদ্ধির অঙ্গিকার করা হয়। অনুচ্ছেদে ৩৮ যার দ্বারা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো তা মুছে ফেলা হয় সংবিধান থেকে। উপরন্তু জিয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মুছে ফেলে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সূচনা করেন, যার ভিত্তি সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম ইসলাম। ফলশ্রুতিতে জামায়াতে ইসলামী-সহ প্রায় ৪০টি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের মূল ধারার রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ করে। রাষ্ট্রের সর্ব নীতিতে এমনকি সমাজ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়,শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলাম শিক্ষার উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়। মুসলিম দেশগুলোর সাথে একাত্মতা ঘোষণার জন্য শুক্রবারকে অর্ধেক সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়। এমনকি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগানের সূচনা করা হয়।


পরবর্তীতে আরেক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করে। এরশাদের শাসনামলে সংস্কৃতি ও শিক্ষায় ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটানো হয় এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পরিণত করা হয় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে। এরশাদের শাসনামলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর চালানো হয় নির্যাতন,নিপীড়ন এবং প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরাতে স্থানান্তরিত হয়। তারা পরবর্তীতে আবার দেশে ফিরে আসে।স্বৈরশাসকেরা সংবিধান শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা এবং প্রচার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতাকে এমনভাবে প্রোত্থিত করে যার ফলশ্রুতিতে ধর্মীয় উগ্রবাদ, কট্টর মৌলবাদের সুদূরপ্রসারী পথ উন্মোচিত হয়।


স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে গিয়ে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিয়েছে,সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তিকে উস্কানি দিয়েছে। যা আমাদের বহুকালের লালিত অসাম্প্রদায়িক ও সহিষ্ণুতার সংস্কৃতিকে করেছে দুর্বল। বিগত কয়েক দশকে আমরা দেখেছি কীভাবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এর অঙ্গ-সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ধর্মান্ধতাকে উস্কানি দিয়েছে। বিএনপির শাসনামলে বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমানদের জন্ম হয়েছে। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নারকীয়তা চালিয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু-সহ সাধারণ মানুষের উপর, ঘটিয়েছে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। ২০০১ সালে নির্বাচন-পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর বিএনপির নির্যাতন, নিপীড়ন সর্বজনবিদিত। সেই সময় এক হাজারের বেশি সংখ্যালঘু ভারতে চলে যায় (দ্য হিন্দু,ডিসেম্বর ৫,২০০১)। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান, দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা এবং নিরীহ সংখ্যালঘুদের উপর নির্মম আক্রমণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে মদদ দিয়েছে।


২০০৫ সালে জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশে (জেএমবি) তৎকালীন বিএনপি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন চালানো হয়, তাদের মন্দির, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং মেয়েদের উপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন।


২০১১ সালে আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পুনরায় ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের সংযোজন করা হয়, সব ধর্মের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয় এবং সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার রোধের অঙ্গিকার করা হয়।


এতদসত্বেও সাম্প্রদায়িকতার উস্কানিতে ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর চালানো হয়েছে নির্মম অত্যাচার, পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ ও ধর্মীয় পুস্তিকা। ২০১৩ সালের মে মাসে সরকার কোরআন শরিফ পুড়িয়ে দিয়েছে এই ধর্মান্ধতার উস্কানিতে মতিঝিলে হয়েছে তাণ্ডব।২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি-জামাত চক্র সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধর্মীয় সংখ্যালঘু-সহ আপামর জনগণের উপর চালিয়েছে নির্মম আক্রমণ, সংখ্যালঘু মেয়েদের উপর হয়েছে অকথ্য নির্যাতন।নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যশোরের মালোপাড়া এবং ঠাকুরগাঁওয়ে সংখ্যালঘু পল্লীতে তাণ্ডব হয়েছে।২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, ২০১৭ সালে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ঠাকুরপাড়ায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটানো হয়েছে। যুদ্ধপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হবার পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর চালানো হয় নির্যাতন। সাঈদীকে চাঁদে দেখা গিয়েছে মর্মে গুজব ছড়িয়ে শান্তি শৃঙ্খলা বিনষ্ট করা হয় সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেয়ার মাধ্যমে।


ধর্মীয় উন্মাদনায় ২০১৬ সালে গুলশানের হোলি আর্টিজানে নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, একই বছর কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের বৃহত্তম ঈদ জামাতে হামলা চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, প্রগতিশীল লেখক, প্রকাশক, সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য-সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ধর্ম যাজকদের উপর হয়েছে আক্রমণ। লক্ষনীয় যে,সাম্প্রতিককালে সংগঠিত জঙ্গি হামলাগুলোতে ধনী-শিক্ষিত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এই সকল তরুণেরা বাংলাদেশের সংস্কৃতি,সমৃদ্ধ ইতিহাস, শতবর্ষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত নয় বলেই হিযবুত তাহরীর এর মতো উগ্র ধর্মীয় জঙ্গি সংগঠনগুলো এদেরকে সহজেই বিপথে চালিত করতে পারে।


বিশ্বায়নের রাজনীতির প্রভাবেও আমাদের দেশে ধর্মীয় উন্মাদনা বৃদ্ধি পায় এবং সাম্প্রদায়িক আক্রমণ হয়। আমরা দেখেছি, ভারতের রাম মন্দির নির্মাণের গুজবে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের একটি অংশ পুড়িয়ে দিয়েছিল প্রতিবেশী সংখ্যালঘুদের বাড়ি এবং মন্দির। মিয়ানমারের মুসলমান রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমণ-নির্যাতনের কারণে ২০১৭ সালের শেষের দিকে বিক্ষিপ্তভাবে আমাদের দেশের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপর আক্রমণ করা হয়, যদিও সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে তা কোনো ধরণের সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নিতে পারেনি।


২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের মূল নীতিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী,ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং স্বাধীনভাবে ধর্মাবলম্বন, পালন এবং প্রচার করতে পারেন এবং কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান না করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। আমরা দেখেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা ও সাম্প্রদায়িকতা নির্মূলে কতখানি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আওয়ামী লীগ শাসন আমলেই ২০১১ এবং ২০১৩ সালে অর্পিত সম্পত্তি আইনে ব্যাপক সংশোধন করা হয়। হিন্দু নারীদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন তার শাসননামলেই প্রণীত হয়েছে। ২০১২ সালে রামুর ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার গুলো দ্রুত পুননির্মাণে তার অবদান প্রশংসনীয়। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এবং সকল ধরণের উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদকে কঠোর হস্তে নির্মূল করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, এদেশের মাটিতে সকল নাগরিকের সমান অধিকার এবং সংখ্যালঘুরা যেন নিজেরকে সংখ্যালঘু না ভেবে এদেশের সন্তান এবং নাগরিক ভাবেন। বাংলাদেশের সংবিধান এবং বিরজমান আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক সমান, প্রত্যেক ধর্মের মর্যাদা সমান-মহান সংবিধানে কাউকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে বেশি মর্যাদা দেয়া হয় নি বা সংখ্যালঘু হিসেবে কারও মর্যাদা ও অধিকারকে খর্ব করা হয় নি। সরকার অসংখ্য নীতিমালায় সংখ্যালঘুদের অধিকারকে সমুন্নত ও টেকসই করার প্রয়াস গ্রহণ করেছে, কিন্তু সমাজের সর্বস্তর থেকে সাম্প্রদায়িকতাকে নির্মূল করতে পারেনি। দুই যুগের বেশি সময় যখন অসাম্প্রদায়িক অগণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রের নীতিমালায় এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতাকে অবমাননা করে সমাজের প্রতি স্তরে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প প্রোত্থিত করে গিয়েছে, তা এক দশকে আমূলভাবে মুছে ফেলা কষ্টকর।


সংবিধানে যদিও রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে আলংকরিক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু এটি সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগরিষ্ট উভয়ের উপর মনস্তাত্বিক চাপ ও প্রভাব বিস্তার করে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের সমাজে সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই ধরনের সাম্প্রদায়িকতা বিরাজমান যা আমরা প্রিয়া সাহার ঘটনা থেকেই দেখতে পাই। প্রিয়ার মিথ্যাচারের কারণে তাকে ‘গণধর্ষণ’ করতে চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে প্রকাশ্যে লিখেছেন, তার পরিবারকে হেয় করেছেন, তার সম্প্রদায়কে নিয়ে কটাক্ষ করেছেন, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন, সনাতন ধর্মকে অপমান করেছেন। সমালোচনা এবং প্রতিবাদের ভাষা এখানে ছিলো সাম্প্রদায়িক এবং নারীবিদ্বেষী, যা চরম নিন্দনীয়। প্রিয়ার মিথ্যাচারকে যখন তার সম্প্রদায়ের অনেকে মিথ্যাচার বলে স্বীকার না করে এটি তার প্রতি বা তার সম্প্রদায়ের প্রতি সংগঠিত অন্যায়ের ফল হিসেবে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির অধিকার হিসেবে দেখে তার মিথ্যাচারকে ঢাকতে চেয়েছেন, তারাও সমানতালেই সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তিরই পরিচয় দিয়েছেন, যা কাম্য নয়।


সাম্প্রতিককালে বিচ্ছিন্নভাবে সংখ্যালঘুদের ঘর দখল হয়েছে, অত্যাচার হয়েছে, মন্দির পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, নেত্রকোনায় পূজা মণ্ডপ গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আবার সব আক্রমণই সাম্প্রদায়িক কারণে বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে হয়েছে তাও নয়। ধর্ষণকারীর কাছে হিন্দু নারী যা মুসলমান নারীও তা, ভূমিদস্যুর কাছে দুর্বলের জমিই মুখ্য, সন্ত্রাসীর কাছে কোনো সম্প্রদায় নেই, ত্রাসের রাজত্বই তার লক্ষ্য। একথা অনস্বীকার্য যে, দক্ষিণ এশিয়াসহ অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রশংসনীয়।


মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিলার বলেছেন, বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তিনি দেখেছেন তা দৃষ্টান্তস্বরূপ। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, গত এক দশকে বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা বেড়েছে, যা আমাদের মনে আশার আলো জাগায়।


আমাদের গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির দ্বারা সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড ও সাম্প্রদায়িকতার উস্কানির মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের আকাঙ্ক্ষা আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই ধর্মভীরু কিন্তু শান্তিপ্রিয় এবং অন্যের ধর্মের প্রতি সহনশীল কিন্তু কিছু সংখ্যক ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী তাদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে বা ধর্মের নামে উস্কানি দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে দেন, যা থেকে উত্তরণের পথ আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।


আমরা দেখছি, সমগ্র বিশ্ব এমনকি আমাদের দেশেও ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদকে উস্কে দেয়া হচ্ছে, যা কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে যুব সমাজকে বিপথে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র আমাদের সমৃদ্ধি ও শান্তির পথে অন্তরায়। ধর্মের অপব্যাখ্যা রোধে আলেম-ওলামা সহ প্রত্যেক ধর্মের ধর্মগুরুদের এগিয়ে আসতে হবে, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সকল ধর্ম ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ,সহিষ্ণুতার প্রচার ও প্রসার ঘটাতে হবে। বিভিন্ন ধর্মের-বর্ণের তরুণ-তরুণীদেরকে বোঝাতে হবে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির গুরুত্ব এবং সাম্প্রদায়িকতার কুফল। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে,পাঠ্যপুস্তকে ধর্মনিরপেক্ষতার উপর জোর দিতে হবে। আমাদের সংস্কৃতিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় সমৃদ্ধ করতে হবে এবং তরুণ সমাজকে আমাদের ঐতিহ্য,সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাথে একাত্ম করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আমাদের নাগরিক সমাজ,শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক এবং গণমাধ্যমগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। সাম্প্রদায়িকতাকে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এর নির্মূলে প্রস্তুত হতে হবে এবং সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় এটিকে দমন করতে হবে। আধুনিকায়নের যুগে অপরাধের ধরণ পাল্টেছে, পাল্টেছে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও আক্রমণের কৌশল,তাই এর মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনে আরো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করতে হবে।


যদিও আমাদের সংবিধানে সকল ধরণের সাম্প্রদায়িকতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বিলোপ করার অঙ্গিকার করা হয়েছে কিন্তু তা নির্মূলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সংবিধানের ১২(ক) অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে সকল ধরণের সাম্প্রদায়িকতাকে বিলোপ করা বোঝালেও সাম্প্রদায়িকতা কি তার কোনো সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা কোন আইনে দেয়া হয়নি। বর্তমানে আমাদের দেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা রোধে যুগোপযোগী কোনো আইন নেই- প্রচলিত ফৌজদারি আইন ১৮৯৮ এবং পেনাল কোড ১৮৬০ এবং সন্ত্রাস দমন আইন ২০১৩ কিংবা আইসিটি অ্যাক্ট ২০১৮ সাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রোধে পর্যাপ্ত নয়। বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে কেউ যেন সাম্প্রদায়িক উষ্কানি এবং সাম্প্রদায়িক আক্রমণ না করতে পারে তার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।


অসাম্প্রদায়িক আধুনিক এবং মানবিক সমাজ গঠনে ব্যর্থ হলে আমাদের জাতিসত্তায় ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন আসতে বাধ্য, যা আমাদের শুধু মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দেবে। সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে সৃষ্ট নৈরাজ্য,জঙ্গিবাদ,সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আমাদের জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়নের পথে বড় বাধা। তাই একটি ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক আধুনিক মানবিক সমাজ গঠনের কোনো বিকল্প নেই। একটি মানবিক সমাজ গঠনে আমাদের মানবিক শিক্ষা ব্যবস্থার উপর জোর দিতে হবে, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীদের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে, সমাজ থেকে সব ধরনের দুর্নীতি-অনৈতিকতা দূর করতে হবে। আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির উপর জোর দিতে হবে এবং আমাদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে লালন করতে হবে। অসাম্প্রদায়িক মনোভাব, আচার এবং ভাষার পরিচর্যা ও ব্যবহার নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের একার দায়িত্ব নয়, একটি মানবিক সমাজ ও দেশ গঠনে আমাদের সকলকে অংশগ্রহণ করতে হবে।


লেখক: ব্যারিস্টার এট ল, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com