পদ্মাপাড়ে সব হারানো মানুষের কান্না
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:২১
পদ্মাপাড়ে সব হারানো মানুষের কান্না
রোমান আকন্দ, শরীয়তপুর
প্রিন্ট অ-অ+

পদ্মাপাড়ে এখন কেবল সব হারানো মানুষের আহাজারি। বসতভিটা থেকে শুরু করে ফসলি জমি সব পদ্মায় বিলীন। দু’মুঠো খাবার জোগাড় করতেই যেনো সব সংগ্রাম হাজার হাজার মানুষের। মাথা গোজার ঠাঁইও যেনো কিছুটা বাড়াবাড়িই।


শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙনের শিকার এসব মানুষদের পাশে ত্রাণ তৎপরতাও অপ্রতুল। তার উপর আরো বেশি আগ্রাসী হচ্ছে নদী। সবার আকুতি পদ্মার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত নির্মাণ হোক বেড়িবাঁধ।


নড়িয়ার কেদারপুর ইউনিয়নের আম্বিয়া খাতুন অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিলেন নদীর দিকে। তার আক্ষেপ, এই সর্বনাশা পদ্মাই সব কেড়ে নিয়েছে। ভিটেমাটি থেকে শুরু করে ভেঙ্গে দিয়েছে সাজানো সংসার। একজন শারীরীক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে রাস্তার পাশে খুপড়ি তুলে আশ্রয় নিয়েছেন।



জীবনে তিনবার বসতভিটা ভাঙ্গন দেখা আম্বিয়া খাতুনের মতো এমন অনেক গল্পই জমা রয়েছে পদ্মাগর্ভে বিলীন হওয়া অযুত মানুষের।


সর্বনাশা পদ্মা ওই এলাকার ধনী-গরিব সবাইকে এখন এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে। পদ্মা তীরবর্তী শরীয়তপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বছরের পর বছর ধরে চলছে নদী ভাঙন। এতে সর্বশান্ত হয়ে ঠিকানাহীন হচ্ছে হাজারও পরিবার।


অব্যাহত ভাঙনে শরীয়তপুরের মানচিত্র ছোট হয়ে আসলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ কখনই গ্রহণ করা হয়নি।


ভাঙনের শিকার পূর্ব নড়িয়া গ্রামের সোহেল মিয়ার স্ত্রী সুফিয়া খাতুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, বিশ শতাংশ জায়গার ওপর বড় বাড়ি ছিল। মূলফতগঞ্জ বাজারে দোকান ছিল স্বামী সোহেল মিয়ার। সবই কেড়ে নিয়েছে সর্বনাশা পদ্মা। দুই মাসের ব্যবধানে ভালো অবস্থান থেকে আজ আমরা ঠিকানাহীন হয়ে পড়েছি।
একই গল্প আকরামউদ্দিন, শফিকুল ইসলামসহ পদ্মায় সব হারানো অনেক মানুষের।


গত ২ জানুয়ারি ‘পদ্মার ডান তীর রক্ষা প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পাস হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কাজ শুরু হয়নি। এদিকে চলতি বছরের জুন মাস থেকে নড়িয়া এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। সম্প্রতি ভাঙনের তীব্রতা ও ভয়াবহতা বৃদ্ধি পায়।


প্রমত্ত পদ্মার স্রোতের তোড়ে মূহুর্তেই নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙন রোধে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা তেমন কোনো কাজে আসছে না।



জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত তিন মাসে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে ৫ হাজার ৮১ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া চারটি বাজারের দুই শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩টি বেসরকারি ক্লিনিক, ৭টি মসজিদ, ১টি মন্দির, এক কিলোমিটার পাকা সড়ক, ৯টি সেতু, ১৬টি বহুতল ভবনসহ প্রায় ৮০টি পাকা বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী তীরবর্তী ৩টি বাজার সম্পূর্ণরূপে এবং ১টি বাজার আংশিক বিলীন হয়ে গেছে।


গত ৭ আগস্ট সাধুরবাজার লঞ্চঘাট এলাকা নদীতে তলিয়ে গেলে ৯ জন পানিতে ডুবে যায়। এদের মধ্যে একজনের মরদেহ ভেসে উঠলেও অন্যদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। গত সোমবার সন্ধ্যায় নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবনও বিলীন হয়ে কিছু অংশ এখন পানির ওপর ঝুলে রয়েছে।


হাসপাতালের মসজিদ, গ্যারেজ ও সীমানা প্রাচীর ইতিমধ্যেই নদীতে চলে গেছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে হাসপাতাল এলাকার বাকি ১১টি ভবনসহ ২০০ বছরের প্রাচীন মূলফতগঞ্জ বাজারের পাঁচ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেকোনো সময় নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।



এ ব্যাপারে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পবিবার পরিকল্পনা কর্মকতা ডা. মুনীর আহমেদ খান বলেন, ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের মূল ভবনের কার্যক্রম বন্ধ করে পেছনের একটি আবাসিক ভবনে সাময়িকভাবে তা চালু রাখা হয়েছিল। এখন সেটিও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ মালামাল নিকটবর্তী ৩টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে পদ্মা তীরবর্তী এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। নড়িয়া পৌরসভার ২ ও ৪নং ওয়ার্ডের অর্ধেকের বেশি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। দুটি ওয়ার্ডে প্রায় ২ হাজার পরিবার বর্তমানে গৃহহীন হয়ে পড়েছে। ভাঙন কবলিত মানুষ তাদের বসতবাড়ি থেকে যতটুকু সম্ভব মূল্যবান মালামাল সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। যাদের বাড়িঘর চলে গেছে তারা সাময়িকভাবে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বা ভাড়া বাড়িতে উঠেছেন।


সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কেদারপুর ইউনিয়নে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার বর্তমানে গৃহহীন। ভাঙনে পুরোপুরি বিলীন হওয়া সাধুর বাজার, ওয়াপদা বাজার, বাঁশতলা বাজার এবং আংশিক বিলীন হওয়া ২০০ বছরের পুরনো মূলফতগঞ্জ বাজার এই কেদারপুর ইউনিয়নে অবস্থিত।



এ ব্যাপারে কেদারপুর গ্রামের বাসিন্দা জানে আলম বলেন, রাতের পর রাত ঘুমাইনি। মালামাল সরিয়ে নেয়ার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দোতলা বাড়িটি মাত্র দু’লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছি। ক্রেতা তার শ্রমিক দিয়ে যতটুকু সম্ভব ভেঙে নিয়ে গেছে।


শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, নদীর পানি না কমা পর্যন্ত তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব না। এ মুহুর্তে রোধ সম্ভব না হলেও বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে তীব্রতা কমানোর চেষ্টা চলছে।


আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম জানান, পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যেই ১ হাজার ২২২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।


বিবার্তা/রোমান/সোহান

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com