বাজেট ২০১৮-১৯ : প্রবৃদ্ধিতে স্বস্তি, মূল্যস্ফীতির চাপ
প্রকাশ : ৩১ মে ২০১৮, ১৫:৪৬
বাজেট ২০১৮-১৯ : প্রবৃদ্ধিতে স্বস্তি, মূল্যস্ফীতির চাপ
মৌসুমী ইসলাম
প্রিন্ট অ-অ+

মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি। একটি দেশের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে এক বছরে যে পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন হয় এবং সেবা যোগান দেয়া হয় তার বাজার মূল্যই জিডিপি বা প্রবৃদ্ধি। গেল কয়েক বছরে উৎপাদনের দিক থেকে অন্য এক কাতারে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। ছয় শতাংশের বৃত্ত ভেঙ্গে এখন গড় প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৭ ভাগের বেশি। তাই অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।


অন্যদিকে, অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচকের নাম মূল্যস্ফীতি। পণ্যের প্রকৃত যে দাম তার চেয়ে বেশি দামে পণ্য কেনার অর্থই মূল্যস্ফীতি। বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি হলেই তৈরী হয় অস্বস্তি, পণ্যের যা মূল্য তার চেয়ে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হয় ক্রেতা। চলতি বাজেটে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ হলেও বছরের মাঝামাঝিতে এসে সংশোধন করে লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ পণ্যের দাম বেড়েছে, তাই উর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির পারদ। তবে, সবদিক বিবেচনা করে আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির হার নির্ধারণ হচ্ছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।


প্রবৃদ্ধি-লক্ষ্য অর্জনে আশাবাদী সরকার


গেল ২০১৬-১৭ অর্থবছরেই প্রবৃদ্ধিতে সুবাতাস আসে। ওই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি প্রকৃত অর্জন ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গেল দুই বছরে খাদ্য উৎপাদনের দিক থেকে তেমন সাফল্য না এলেও বেড়েছে মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৪৭ দশমিক ০৮ লাখ টন ধান উৎপাদন হলেও ২০১৬-১৭তে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৩৩৮ দশমিক ০২ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ উৎপাদন কম হয় ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এসময় আউসের উৎপাদন বেশ কমে যায়। আগের বছরের তুলনায় গেল বছরে এই চালটির উৎপাদন কমে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া আমনের উৎপাদন কমে ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বোরোর উৎপাদন কমে যায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে, ডিসেম্বর ২০১৬ তুলনায় ২০১৭-তে বেড়েছে মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প উৎপাদন। দেখা যায়, এই দুই খাতে প্রবৃদ্ধির হার ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। বিগত বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয় ৯ দশমিক ২ শতাংশ। এই সময় পরিধেয় বস্ত্র উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হয় ১৫ দশমিক ০৬ শতাংশ। এছাড়া খাদ্যপণ্যে ৩৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, ওষুধ শিল্পে ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পে ৬৭ দশমিক ৫১ শতাংশ।


সরকার মনে করে, রফতানি, আমদানি, প্রবাস আয়, মূলধনী ও শিল্পজাত পণ্যের ঋণপত্র খোলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া বাণিজ্য সহযোগি দেশ অঞ্চল এবং সার্বিকভাবে বৈশ্বিক গতি ত্বরান্বিত হবে, এতে প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


সরকার আরো মনে করে, অর্থবছরের শুরুতে আমনের উৎপাদন সন্তোষজনক হয়েছে, চলমান আছে ভর্তুকি, কৃষি উপকরণসহ সরকারের সহায়তা কার্যক্রম। বোরোর উচ্চ ফলনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, কাজেই কৃষিখাতে বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে।


বৈশ্বির প্রবৃদ্ধির গতিধারা


বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৭ সালেই বৈশ্বির প্রবৃদ্ধি হয়েছে সবচেয়ে বেশি, যার হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।


তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৫ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। তবে, ২০১৮ সালে ধারণা করা হচ্ছে প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে হবে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।


উন্নত দেশের প্রবৃদ্ধির দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৫ সালে যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ, সেখানে পরের বছর কমে প্রবৃদ্ধি হয় ১ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে ২০১৮ সালে প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে হবে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতি এবং উদীয়মান এবং উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।


একক দেশ হিসেবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৫ সালে যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখানে ২০১৭-তে কমে হয় ২ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে, ২০১৮-তে প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে হবে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে ২০১৬ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৭-তে আরও কমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে, ২০১৮ সালে প্রবৃদ্ধি বেড়ে হবে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আর ২০১৯-এ আরও বেড়ে হবে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।


মূল্যস্ফীতির চাপ


মার্চ ২০১৮ শেষে বারো মাসের গড় ও পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮ ও ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ বন্যাজনিত ফসলহানির কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম দিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লেও জানুয়ারী মাস থেকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমতির দিকে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেল, ধাতব পদার্থ ও কৃষিজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা অভ্যন্তরীণ সার্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরী করেছে বলে মনে করছে অর্থমন্ত্রণালয়।


চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উর্ধ্বমুখী হয়। দেখা যায়, জুলাই মাসে যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ, সেখানে মার্চ মাসে এর হার দাড়ায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সঙ্গে সাধারণ মূল্যস্ফীতি জুলাইতে ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, সেখানে মার্চ মাসে বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। সরকার মনে করে, খাদ্য উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে, যা খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে। তাই বাজেটের লক্ষ্য অর্জন কষ্ট দায়ক হবে না।


মূল্যস্ফীতির বৈশ্বির গতিধারা অস্বস্তিকর


বৈশ্বির মূল্যস্ফীতির বার্তা সুখকর নয়। প্রতিবেশি এবং প্রতিবেশি দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি গতিধারা উর্ধ্বমুখী।


তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উন্নত দেশে ২০১৫ সালে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ০ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০১৬-তে ০ দশমিক ৮ আর ২০১৭-তে আরও বেড়ে হয় ১ দশমিক ৭ শতাংশ। আর প্রক্ষেপণ বলছে, ২০১৮-তে এর হার দাঁড়াবে ২ শতাংশ।


আর উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে ২০১৬-তে মূল্যস্ফীতি ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০১৭-তে কমে ৪ শতাংশ। তবে ২০১৮-তে এই হার বেড়ে দাঁড়াবে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।


অন্যান্য দেশের মধ্যে চীন’র মূল্যস্ফীতিও বাড়তির দিকে। দেখা যায়, ২০১৫-তে হার ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১৬-তে ২, ২০১৭-তে ১.৬ এবং ২০১৮-তে বেড়ে হবে ২ দশমিক ৫ শতাংশ।


পাশ্ববর্তীদেশ ভারতেও কিছুটা বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। ২১০৭-তে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ২০১৮-তে বেড়ে হবে ৫ শতাংশ।


বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য উর্ধ্বমুখী। ব্যারেল প্রতি অপরিশোধিত তেলের গড় মূল্য ২০১৭ সালে ছিল ৫৩ ডলার। এই দাম বেড়ে ২০১৮-তে ব্যারেল প্রতি ৬৫ ডলারে উন্নীত হবার আশংকা করা হচ্ছে। এছাড়া বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত হওয়ায় চাহিদা বেড়েছে, একই সঙ্গে সরবরাহ প্রতিবন্ধকতার কারণে ২০১৮ সালের প্রথম তিন মাসে বৈশ্বিক পণ্য মূল্য সার্বিকভাবে বেড়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১৮ সালের ধাতব পণ্যের মূল্য ৯ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিগত তিন বছর তুলনামূলক স্থির থাকার পর কৃষিপণ্যের মূল্য বাড়বে ২ শতাংশ।


বিশ্লেষক


প্রবৃদ্ধির নিরুপণ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ের মূখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য দেয়া হলেও, বিশ্বব্যাংক মনে করে প্রকৃত হার হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু সরকারের বিবিএস’র প্রাক্কলন হচ্ছে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ।


ড. জাহিদ বলেন, যোগানের দিক থেকে শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ১৩ শতাংশ দেখানো হয়েছে; এটা কিভাবে হলো? অভ্যন্তরীণ বাজারভিত্তিক শিল্পগুলোর প্রবৃদ্ধি হলেও ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ স্থবির গত কয়েক বছর, তার অর্থ উৎপাদন ক্ষমতার কোনো বৃদ্ধি হয় নাই। আর উৎপাদন ক্ষমতার বৃদ্ধি না হলে এতো প্রবৃদ্ধি কিভাবে এলো? তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি যদি এতো বেশি হয় তাহলে রাজস্ব এলো না কেন? জোর দিয়ে বলেন, ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে, তার যৌক্তিক কোনো হিসেব আমরা পাই না।


মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে আশংকার কথা বলেন ড. জাহিদ হোসেন। বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা দাম বেড়েছে, তার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজার মূল্যে। ডলারের দাম বাড়াতে প্রভাব পড়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণকে সমর্থন করেন এই অর্থনীতিবিদ।


বিবার্তা/মৌসুমী/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com