প্রকল্প অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতায় শিশুপার্ক, সাড়ে ৪ বছরেও শুরু কাজ হয়নি!
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:০৫
প্রকল্প অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতায় শিশুপার্ক, সাড়ে ৪ বছরেও শুরু কাজ হয়নি!
এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

একসময় মানুষের পদচারণায় সকাল-সন্ধ্যা মুখরিত থাকত চারপাশ। বিনোদনপ্রেমী শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী আর অভিভাবকদের ভিড়ে সরগরম থাকত পুরো এলাকা। পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন রাইডে চড়ে আর হৈ হুল্লোড় করে সময় কাটত শিশু-কিশোরদের। কিন্তু এখন আর কোনো হৈ হুল্লোড় নেই, নেই কোনো কোলাহল। জনমানবশূন্য পুরো জায়গা এখন পরিত্যক্ত জিনিসপত্র আর ঘন জঙ্গলের দখলে। চারদিকে সুনসান নীরবতা।



বলছি, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগে সরকারিভাবে চালু হওয়া দেশের প্রথম শিশুপার্কটির কথা। গত সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধরে আধুনিকায়নের নামে শিশু পার্কটি বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এতে বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। প্রকল্প অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত নতুন করে শিশুপার্কের উন্নয়নে কোনো কাজই শুরু হয়নি। সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে উন্নয়নের নামে বন্ধ রয়েছে পার্কটি।



শাহবাগে অবস্থিত শিশু পার্কটির জায়গার মালিক গণপূর্ত অধিদপ্তর। পার্কটি পরিচালনার দায়িত্ব ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি)। তবে এখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় পার্কটির নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড গাড়ি পার্কিংয়ের কাজ করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। তাদের পার্কিং নির্মাণের কাজ শেষের দিকে থাকলেও বর্তমানে কাজ বন্ধ আছে। এই কাজ শেষ হলে শুরু হবে পার্কের উন্নয়ন কাজ। পৃথক প্রকল্পের মাধ্যমে পার্কে রাইড স্থাপন করবে ডিএসসিসির যান্ত্রিক বিভাগ।


রাজধানী ঢাকায় শিশু-কিশোরদের অন্যতম এই বিনোদনকেন্দ্র চালু করতে নতুন এই প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালের জুন মাসে। এরপর পার্কটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে। অর্থাৎ পার্কটির জন্য অপেক্ষার সময় বেড়ে দাঁড়াবে মোট সাড়ে সাত বছর।


নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি শিশু পার্ক আধুনিকায়ন বা আধুনিক রাইড স্থাপনের নামে অর্ধযুগ পার করে দেবে, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ সময়ে একটি প্রজন্ম শিশু পার্কের বিনোদন থেকে বঞ্চিত হবে। এতে তাদের শারীরিক-মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। এর দায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে।


ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্র বলছে, পার্কের আধুনিকায়নে একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রায় ৬০৪ কোটি টাকার মধ্যে ৪৮৩ কোটি টাকা দেবে সরকার। এই টাকার ৫০ ভাগ অনুদান এবং ৫০ ভাগ ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। বাকি ১২০ কোটি টাকা দক্ষিণ সিটির তহবিল থেকে খরচ করা হবে। অনুমোদিত প্রকল্পের ৪১৫ কোটি টাকা খরচ হবে ১৫টি অত্যাধুনিক রাইড কেনা ও স্থাপনে। আর কেন্দ্রীয় শব্দযন্ত্রসহ এলইডি স্ক্রিন বসাতে খরচ হবে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। বাকি টাকা ভেতরের নানা অবকাঠামো উন্নয়নে খরচ করা হবে।


পার্কের ভেতরে সরেজমিন দেখা যায়, শিশুপার্কের ১৫ একর জায়গার কিছু অংশে ভূগর্ভস্থ পার্কিংয়ের কাজ শেষের দিকে থাকলেও বর্তমানে কাজ বন্ধ রয়েছে। পার্কের যেসব স্থানে পুরোনো রাইড ছিল, সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে টিকিট কাউন্টারের একটি ভবন ও চরকি জাতীয় পৃথক দুটি রাইড উঁচু টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। পার্কের পশ্চিম পাশে ঝোপঝাড়ে ফেলে রাখা হয়েছে বিমানবাহিনীর উপহার দেওয়া জেট বিমান। বিমানটিকে চারপাশ থেকে লতাপাতা ঘিরে রেখেছে। পার্কের অধিকাংশ রাইডের অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে। পার্কটির নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড গাড়ি পার্কিংয়ের আশপাশের চারদিকে ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ড গাড়ি পার্কিংয়ের উপরে নিচে পুরো জায়গায় জমে আছে বৃষ্টির পানি। তাতে দেখা যায় মশার লার্ভার উপস্থিতি। শিশু পার্কটিতে কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি। পুরো জায়গার চারপাশে টিন দিয়ে সীমানাপ্রাচীর তৈরি করা হয়েছে।


পার্কটি কোন নক্সায় বানানো হবে- তার কোনো তথ্য বা ছবি সংবলিত ব্যানার টানানো নেই। ফটকে কেবল ছোট্ট একটা টিনে লেখা ‘সাবধান পার্কের উন্নয়নের কাজ চলিতেছে।’ পার্কটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বিনোদনের সুযোগ হতে বঞ্চিত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। পার্কটি চালু আছে বা পার্কের সংস্কার কাজ শেষ মনে করে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে এসে ফিরে যাচ্ছেন।


বিশেষ করে শুক্র-শনিবার ও সরকারি ছুটির দিনগুলোতে পার্কে এসে এখনো অনেকেই এসে ফিরে যাচ্ছেন। পার্কের আশপাশের দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিনিয়তই দর্শনার্থীরা আসেন। অনেকেই জানে না শিশু পার্ক বন্ধ। তাদের অধিকাংশই ঢাকার বাইরের দর্শনার্থী।


জানতে চাইলে পার্কের গেটের দোকানদার মো. কামাল মিয়া বিবার্তাকে বলেন, পার্ক বন্ধ প্রায় চার বছরের বেশি সময় থেকে। এখনো প্রত্যেকদিন অনেক মানুষজন পার্কে আসে এবং খোঁজে। যখন দেখে পার্ক বন্ধ তখন মন খারাপ করে চলে যায়।


তিনি বলেন, পার্কের নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড গাড়ি পার্কিংয়ের যে কাজ তা এখন বন্ধ আছে। এখনো পার্কের কোন কাজ শুরু হয়নি। ভিতরে সব জায়গা জঙ্গলে ভরে গেছে।


টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি থেকে মো. শহিদুল ইসলাম দুই সন্তানকে নিয়ে শিশু পার্কে এসেছেন ঘুরতে। তিনি বিবার্তাকে বলেন, গতকাল ঢাকায় এসেছি বোনের বাসায় ঘুরতে। ছেলেরা আবদার করল শিশুপার্কে আসার জন্য, তাই এসেছি। কিন্তু অনেক খোঁজ করেও শিশুপার্কের দেখা পেলাম না। আর যখন পেলাম তখন জানলাম পার্ক বর্তমানে বন্ধ আছে। চালু করতে আরও অনেক সময় লাগবে।


তিনি বলেন, ঢাকায় যত মানুষের বসবাস, সে অনুযায়ী তেমন কোন খেলার মাঠ নেই। তারপর আবার পার্ক বন্ধ, শিশুরা কোথায় বিনোদন নিবে। এখন আর কি করার ছেলের আবদার তো পূরণ করতে পারলাম না। দেখি অন্য কোন পার্কে নিয়ে যেতে পারি কি না।


মো. রাশেদুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, ঢাকা বেড়াতে এসেছি অনেক জায়গা ঘুরেছি, সবখানে অনেক বড় বড় বিল্ডিং। কিন্তু কোন খেলার জায়গা নাই। একটুখানি ফাঁকা জায়গাও নাই, গাছপালা নাই। সবাই কোথায় খেলে, একটা পার্কও নাই। আমাদের গ্রামই অনেক ভালো।


জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বিবার্তাকে বলেন, শিশুদের প্রতি আমাদের ভবিষৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আমাদের মৌলিক অধিকার হিসেবে তাদের প্রতি করণীয় কি? এই বিষয়টি এখন অবজ্ঞা অবহেলার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।


তিনি বলেন, আমরা ভুলে যাই, যদি সত্যিই বিশ্বাস করি তারা ভবিষৎ প্রজন্ম তাদের মন ও দৈহিক বিকাশের সকল ব্যবস্থা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।


ইকবাল হাবিব আরো বলেন, এই শিশু পার্কটি সরকারিভাবে একমাত্র পার্ক ছিল। সেটিকে উন্নয়নের নামে এভাবে বছরের পর বছর বন্ধ করে রাখা অধিকার কারও নাই। যদি প্রকল্প পাশ না হয়েই থাকে তাহলে এতদিন থেকে পার্কটি বন্ধ করে রাখার যুক্তি কি? তাহলে উচিত ছিল প্রকল্প অনুমোদন পর্যন্ত এটা ব্যবহার উপযোগী রাখা। অতএব এ পুরো বিষয়টি কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং এক ধরনের অবজ্ঞা প্রদর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি।


এ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও "ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (৩য় পর্যায়)" শীর্ষক প্রকল্প পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, শিশুপার্কের বিষয়টা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় আছে। যতদূর জানি তারা এ নিয়ে একটি প্রকল্পের অনুমোদন করিয়েছে। এ বিষয়টি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রোকৌশল বিভাগ ভালো বলতে পারবেন।


পার্কটির নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড গাড়ি পার্কিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, আপনার নির্দিষ্ট কোন তথ্য জানার থাকলে আপনাকে মন্ত্রাণালয় থেকে লিখিতভাবে তথ্য নিতে হবে। আমি এ নিয়ে তথ্য দিতে অপারগতা জানাচ্ছি, আমার কাছে নির্দেশনা তেমনি আছে।


জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশিকুর রহমান বিবার্তাকে বলেন, শিশুপার্কের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আপনি আমাদের স্যারের সাথে এ নিয়ে কথা বলেন।


এ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (অ. দা.) মো. সিরাজুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, ঢাকায় শিশু-কিশোরদের খেলার উপযোগী তেমন মাঠ বা ফাঁকা স্থান নেই। হাতে গোনা কিছু পার্ক রয়েছে, তার মধ্যে শিশু পার্ক অন্যতম। শিশু পার্কে এখন গাড়ি পাকিংয়ের কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলে দ্রুত পার্কটির কাজ শুরু হবে এবং সবার জন্য খুলে দেয়া হবে।


ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন যান্ত্রিক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুব আলম বিবার্তাকে বলেন, এখনো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় পার্কটির নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড গাড়ি পার্কিংয়ের কাজ চলছে। পার্কের কাজ এখনো শুরু হয়নি। পার্কিংয়ের কাজ শেষ হলেই আধুনিক রাইডসহ পার্কের কাজ শুরু হবে।


জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন যান্ত্রিক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিছুর রহমান বিবার্তাকে বলেন, এখনো পার্কটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তর আন্ডারগ্রাউন্ড গাড়ি পার্কিংয়ের কাজ করছে। আমাদের শিশুপার্কের প্রজেক্ট পাশ হয়েছে। এরপর টেন্ডার হবে এবং তারপর আমরা কাজ শুরু করব। মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করতে মাস ছয়েক সময় লাগতে পারে।


আনিসুর রহমান আরও বলেন, শিশুপার্কের নতুন নাম করপোরেশনের সর্বোচ্চ ফোরাম, তথা বোর্ড সভায় অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই তারা পার্কের আধুনিকায়নের কাজ শেষ করবেন।


উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পার্কের সামনে একটি বিজ্ঞপ্তি টানিয়ে এটি বন্ধ ঘোষণা করেছিল ডিএসসিসি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ‘ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় শিশু পার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ মুক্তি যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন থাকায়, অনাকাক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় শিশু পার্ক সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে।’


বিবার্তা/রিয়াদ/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com