গুলশানে অবৈধভাবে বাড়ি নির্মাণ সালাম মুর্শেদীর, তদন্তে প্রমাণ
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১৯:৩১
গুলশানে অবৈধভাবে বাড়ি নির্মাণ সালাম মুর্শেদীর, তদন্তে প্রমাণ
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী রাজধানীর গুলশানে অবৈধভাবে প্লট দখল করে বাড়ি নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন।


সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি অবৈধ দখলভুক্ত প্লটটি অবিলম্বে সরকারের দখলে আনয়ন করা ও একইসাথে তৎকালীন এ জাল জালিয়াতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করেছে।


জানা যায়, রাজধানীর গুলশান-২ এর ১০৪ নম্বর সড়কে সিইএন (ডি) ২৭ এর ২৯ নম্বর বাড়ির অবস্থান। ১৯৮৬ সালের অতিরিক্ত গেজেটে ‘খ’ তালিকায় এই প্লটটি পরিত্যক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত। কিন্তু প্লটটি অবৈধভাবে দখল করে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন আব্দুস সালাম মুর্শেদী।


পরিত্যক্ত এই সম্পত্তি দখলে নিতে নানা কৌশল নেয়ার প্রমাণ পেয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত তিন সদস্যের কমিটি। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তৈরি করা হয়েছে নানান নথি। এমনকি প্লটটির দখলে নিতে নথিতে বদলে ফেলা হয়েছে সড়কের নাম্বারও। গুলশান আবাসিক এলাকায় রাজউকের লে-আউট নক্সায়ও এই বাড়িটির অস্তিত্ব নেই। সৃজিত কাগজপত্রের আলোকে তর্কিত বাড়িটির হস্তান্তর প্রক্রিয়াও বিধিসম্মত হয়নি।


আরও পড়ুন: অবৈধভাবে দখলে রাখা জমিতে সালাম মুর্শেদীর বাড়ি; দখলমুক্ত করতে সুপারিশ


গত বছরের ৩০ অক্টোবর সরকারি সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়ে বাড়ি বানানোর অভিযোগে আব্দুস সালাম মুর্শেদীর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।


পরে গত বছরে ১ নভেম্বর আব্দুস সালাম মুর্শেদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ওই সম্পত্তি সম্পর্কিত সব কাগজপত্র ১০ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে রাজউক, গণপূর্ত বিভাগ ও সালাম মুর্শেদীকে নির্দেশ দেন বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের আদালত।


এ বিষয়ে জানতে ২৪ জানুয়ারি, মঙ্গলবার ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন এর মুঠোফোনে কল, এসএমএস ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


জানা যায়, গুলশান আবাসিক এলাকার সিইএন (ডি) ব্লকের ১০৪নং রোডের ২৯নং হোল্ডিংস্থিত ২৭নং প্লট/বাড়ি পরিত্যক্ত ‘খ’ তালিকা হতে অবমুক্তির জন্য ২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় বরাবর আব্দুস সালাম মোর্শেদী আবেদন করেন। ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল পরিত্যক্ত বাড়ির তালিকা থেকে বাড়িটি অবমুক্ত না হওয়ার পরও আব্দুস সালাম মুর্শেদী কীভাবে বাড়িটি দখল করে আছেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর চেয়ারম্যানের কাছে সেই ব্যাখ্যা চায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সে চিঠি আমলে না নেয়ায় ২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি ও গত বছরের ৪ জুলাই আবার রাজউক চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।


এরপর গত বছরের ২২ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনের চিঠির প্রেক্ষিতে ৮ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখা-৯ এর যুগ্মসচিব মো. মাহমুদুর রহমান হাবিবকে আহবায়ক করা হয়। এছাড়া কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) মুহম্মদ কামরুজ্জামান এবং সদস্য হিসেবে ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং শাখা-১১ এর উপসচিব জহুরা খাতুন।


গত ১৩ সেপ্টেম্বর কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর কমিটি বর্ণিত প্লটের মূল নথি প্রেরণের জন্য রাজউক চেয়ারম্যান অনুরোধ করে। বর্ণিত প্লটের ১৯৬৩ সালে সম্পাদিত ৪৫০নং লিজ দলিলের সার্টিফাইড কপি, ১৯৭৫ সালে সম্পাদিত ২২৬৪১নং বিক্রয় দলিলের (Deed of Sale) এর সার্টিফাইড কপি এবং গুলশান মডেল টাউনের ব্লক ওয়াইজ অনুমোদিত নক্সার প্রতিলিপি প্রেরণের জন্য রাজউক চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা হয়। বর্ণিত এসব প্রয়োজনীয় নথি/কাগজপত্রাদি রাজউকসহ অন্যান্য দফতর/সংস্থা হতে যথাসময়ে সরবরাহ করতে না পারায় তদন্ত কার্যক্রম যথাসময়ে শেষ হয়নি বলে প্রতিবেদনে জানা যায়। সর্বশেষ তদন্ত কমিটি প্লটটি সরেজমিন পরিদর্শন করে গত ২০ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।


কমিটি বলছে, গুলশান আবাসিক এলাকার ১০৪নং রাস্তার সিইএন (ডি) ব্লকের ২৭নং বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা হতে অবমুক্ত ব্যতিরেকে যে সকল কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে তার বৈধতার বিষয়ে সুস্পষ্ট দালিলিক প্রমাণাদি অনুপস্থিত। সৃজিত কাগজপত্রের আলোকে তর্কিত বাড়িটির হস্তান্তর প্রক্রিয়া বিধিসম্মত হয়নি। এমতাবস্থায়, অবৈধ দখলভুক্ত প্লটটি অবিলম্বে সরকারের দখলে আনয়ন করা যেতে পারে। একই সাথে তৎকালীন এ জাল জালিয়াতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।


তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বিবার্তাকে বলেন, প্রথমত আমি সংসদ সদস্য হয়ে এই প্লটটি পাইনি। আমি ১৯৯৭ সালে রাজউকের কাছ থেকে চতুর্থ লিজ গ্রহীতা হিসেবে সব ধরণের ফরমালিটিজ মেনে নিয়েছি। মেরিটেশন দেখা এবং এটা যে পরিত্যক্ত সম্পত্তি না সেটা দেখা রাজউকের কাজ। পরিত্যক্ত সম্পত্তি হলে রাজউক ট্রান্সফারই করতে পারবে না।


তিনি বলেন, জমিটি ১০৩ নম্বর রাস্তার ২৯নং হোল্ডিং-এ ২৭ কাঠার প্লট। আমরা যখন কিনি, তখন এটি বিভাজিত প্লট হয়েছে। একটি হলো ২৭ এর বি আর আমি হলাম ডি। তখন অটোমেটিকেলি ১০৪-এ চলে গেছে। কর্ণার প্লটের কারণে ১০৪ হয়েছে।


আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, প্লট বিভাজন, বাড়ি বানানোর পারমিশন, প্ল্যান সব রাজউক থেকে নিতে হয়। চার পাঁচ মাস লাগে। ফরমালিটি সব মেইনটেইন করতেই ৪ বছর চলে গেছে। রাজউক প্রসিডিউর মেনে পেয়েছি। আমি বাড়ি বানিয়ে উঠেছি ২০০৭ সালে। যা করণীয় সব করেছি। পরিত্যক্ত হলে তখন গণপূর্ত চিঠি দিলো না কেন?


তিনি আরও বলেন, আমি অন্য জায়গায় বাড়ি বানাতে পারতাম। এখানে বানাতে হলে তো রাজউকের অনুমতি লাগে। যদি পরিত্যাক্ত হতো তাহলে তো বাড়ি করতে পারতাম না। আমি ইনফ্লুয়েন্স করিনি, ক্ষমতা বলে পাইনি। ট্যাক্স দেয়াসহ সব মেনে পেয়েছি। আমি ২৬ বছর ধরে এখানে বাস করছি। বিষয়টি বিচারাধীন আছে। মূল নথি এখনো পাওয়া যায়নি। এটা কি আমার দোষ? মূল নথি দেখলে বোঝা যাবে কে ঠিক। সেই পর্যন্ত ওয়েট করি।


এ বিষয়ে জানতে তদন্ত কমিটির আহবায়ক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখা- ৯ এর যুগ্মসচিব মো. মাহমুদুর রহমান হাবিবকে কল করে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর তিনি বিবার্তাকে বলেন, আমার কথা বলার সময় নাই। এরপর তিনি কলটি কেটে দেন।


তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) মুহম্মদ কামরুজ্জামানের সাথে যোগাযোগের চেষ্ঠা করলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।


আর এ বিষয় তদন্ত কমিটির সদস্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং শাখা-১১ এর উপসচিব জহুরা খাতুন বিবার্তাকে বলেন, প্রতিবেদন জমা দিয়ে দিয়েছি। এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই, তাই মন্তব্য করতে পারব না।


বিবার্তা/সোহেল/রোমেল/এমএইচ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com