মধুর সম্পর্কের পাশাপাশি ঝগড়াও হতো : কবরী
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৯, ১৩:৫৮
মধুর সম্পর্কের পাশাপাশি ঝগড়াও হতো : কবরী
বিনোদন ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশি সিনেমার পর্দায় ঈর্ষণীয় এক জুটি রাজ্জাক-কবরী। পর্দায় তাদের প্রেমময় সংলাপ পর্দার বাইরের দর্শকদের সব সময় ভীষণভাবে আন্দোলিত করেছে। প্রেমিক-প্রেমিকারা রাজ্জাক-কবরীর সেসব সংলাপ সব সময়ই নিজের মনে করেছেন। দেশের সিনেমার অলিগলি ঘুরতে গিয়ে রাজ্জাক-কবরী জুটি নিজেরাও একসময় নিজেদের ভেতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন। নিজেদের মধ্যে গড়ে ওঠে প্রেম-ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের গল্প। আর তা ভক্তদের কাছে এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছিল যে তারা নাকি এই পর্দা জুটির বিয়ে হলে ভালো হতো বলে মনে করতেন। রাজ্জাক-কবরী জুটির পর্দা ও পর্দার বাইরের সম্পর্ক একটি রহস্য।


ষাটের দশকের বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের নায়িকা কবরী রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে প্রেম ও বন্ধুত্ব নিয়ে স্মৃতিচারন করেছেন। বলেছেন, রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে যখন আমার প্রথম দেখা তখন আমি কিছুই ফিল করিনি। তখন রাজ্জাক সাহেব ওতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। আমিও জনপ্রিয় হয়ে উঠিনি। রাজ্জাক সাহেব আগে থেকেই সিনেমায় কাজ করে আসছেন আর আমি ‘সুতরাং’ সিনেমার কাজ শেষ করেছি।


গাজী মাজহারুল আনোয়ার ‘যোগাযোগ’ নামের একটি সিনেমা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তার বাসায় আমাকেও ডেকেছেন আর রাজ্জাক সাহেবকেও। সেদিনই আমাদের প্রথম সামনা-সামনি কথা হয়। শেষ পর্যন্ত ওই সিনেমাটি আর নির্মাণ হয়নি। এর পরে ‘ময়নামতি’ সিনেমার কাজের সময় আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। একে অপরের কাছ থেকে শিখেছি। আমরা নিজেদের মধ্য ভাবের আদান-প্রদান করেছি। বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা এক্সচেঞ্জ করেছি। সিনেমার চরিত্র নিয়ে কথা বলেছি। সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব হয়েছে। বিষয়টি এমন না যে, উনার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমার প্রেম হয়ে গেল। বরং কাজ করতে গিয়ে দুজনের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। দুজনই পেশাদারিত্বের সঙ্গে, ভক্তির সঙ্গে কাজ করেছি আমরা। এভাবেই অভিনেতা-অভিনেত্রী, বন্ধু হিসেবে ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত একসঙ্গে কাজ করেছি। এর মধ্যে কত কথা হয়েছে। এর মধ্যে ভালোবাসা তৈরি হতেই পারে। আমরা শুধু জুটি হিসেবে সফল হয়েছি তা নয়, আমরা পেশাদার শিল্পী হিসেবেও স্বাক্ষর রাখতে পেরেছি।


আমাদের মধ্যে মধুর সম্পর্কের পাশাপাশি ঝগড়াও হতো। আমাদের ঘনিষ্ঠ একজন পরিচালক কামাল আহমেদ ছিলেন। উনি আমাকে ছাড়া কাউকে ভাবতে পারতেন না। একবার রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে এমন কঠিন ঝগড়া হয়েছে যে, আমরা একসঙ্গে আর কাজ করবো না। কামাল ভাই একটা স্ক্রিপ রেডি করলো। আমাকে যখন বললো ‘অধিকার’ সিনেমার কাজের জন্য, আমি কামাল ভাইকে বলে দিয়েছি- কামাল ভাই আমিতো রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে কাজ করবো না। রাজ্জাক সাহেবও বললো- আমিও আর করবীর সঙ্গে কাজ করবো না। সবাইতো মাথায় হাত। এর পরে আমি বললাম- আমি এই সিনেমা করতে পারি তবে রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে করবো না। এরপর এই সিনেমায় তিনি আমার সঙ্গে বুলবুল আহমেদকে নিলেন আর রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে শাবানা। আমাদের মধ্যেকার ঝগড়ার কারণেই এরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। তবে সিনেমাটি দারুণ হিট হয়েছিল।


আর একবার একটা ঘটনা ঘটেছিল। শুরুর দিকের সিনেমায় কবরী-রাজ্জাক নাম দেয়া হতো। হঠাৎ করে রাজ্জাক সাহেব বায়না ধরেছেন তার নাম আগে দিতে হবে। বলেন-এটা হতেই হবে তা না হলে আমি শুটিং করবো না। এটাতে আমি খুব রাগ করতে লাগলাম। আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে লাগলো। তবে এরকম কিছু দূরত্ব দুরন্ত আকারে বেরিয়ে এসেছে জনপ্রিয় জুটির মধ্য দিয়ে। রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে আমার গোপন কোনো প্রেম ছিল না। আমাদের প্রেম ছিল পর্দায়, আমাদের প্রেম হয়েছে অভিনয়ের মাধ্যমে। আমরা যখন অভিনয় করেছি তখন চোখে চোখে কথা বলতাম। আমরা বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বলতাম। আমাদের মনে হয়েছে একজন আর একজনের জন্য তৈরি হয়েছি। আমি বলতে পারি এই বোঝাপড়াটা ঢাকাই চলচ্চিত্রে আর কখনো আসবে কি না আমার সন্দেহ। ভালোলাগা, ভালোবাসার মধ্যে একটা ছেলে একটা মেয়ে শুধু কি প্রেম করে বিয়ে করার জন্য? শুধু কি বন্ধুত্ব হয় বিয়ে করার জন্যই? আমি বলবো, না। তার থেকেও উপরের প্রেমটা হবে শারীরিক কোনো লেনাদেনার সম্পর্ক থাকবে না সেখানে। একটা মেয়ে একটা ছেলের বন্ধুত্ব অনেক বেশি প্রগাঢ় হতে পারে বলে মনে করি। কারণ এতে কোনো শর্ত নেই। রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে আমার কোনো শর্ত ছিল না। শুধু ছিল আমাদের পেশাদারিত্ব। এটাই আমাদের শর্ত ছিল। আমরা দুজন দুজনকে প্রশংসা করতাম। উনি না করলে জোর করে আদায় করে নিতাম। আমরা আমাদের কাজের মধ্যে কার্পণ্য করিনি বলেই আজ পর্যন্ত টিকে আছি। আমাদের জুটি প্রথাটা পেশাদারিত্ব থেকে আমাদের দূরে সরাতে পারেনি। আমাদের মধ্যে যেমন বন্ধুত্ব ছিল, তেমনি প্রতিযোগিতাও ছিল।


রাজ্জাক ও কবরীকে কাজ করতে করতে একেকটি সিঁড়ি ওপরে উঠতে হয়েছে। এভাবেই তাদের মধ্যে একটি সময় দারুণ বোঝাপড়া তৈরি হয়। কাজের সময় পেশাদারির বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত। দুজনেরই নাকি পেশার প্রতি শ্রদ্ধাও ছিল সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের সিনেমার স্বর্ণযুগে একটা বড় সময় ধরে টানা কাজ করে গেছেন রাজ্জাক ও কবরী। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত একসঙ্গে করতেন তারা। এ কারণে একটা ভালোবাসার জায়গাও নাকি দুজনের মধ্যে তৈরি হয়েছিল।


সারাহ বেগম কবরী ষাটের দশকের বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের নায়িকা। চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলাতে জন্মগ্রহন করেন তিনি৷ কবরীর জন্মস্থান বোয়ালখালী হলেও শৈশব ও কৈশোর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম নগরীতে। তার আসল নাম মিনা পাল। এক সময়ের মানুষের হৃদয়কাড়া মিষ্টি মেয়ে হঠাৎ করেই যোগ দেন রাজনীতিতে।


বিবার্তা/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com