অস্তমিত সূর্যোদয়ের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২১, ১৮:৩৪
অস্তমিত সূর্যোদয়ের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
গুলশাহানা ঊর্মি
প্রিন্ট অ-অ+

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীন নবাবের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ স্বাধীন সূর্য অস্তমিত হয়। এরপর বাংলার আকাশে স্বাধীন সূর্য উদয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ২০০ বছরের বেশী সময়। কাকতালীয়ভাবে সেই ঐতিহাসকি ২৩ জুন তারিখেই এ উপমহাদেশে জন্মলাভ করে একটি রাজনৈতিক দল, পরবর্তীতে সেই দলের নেতৃত্বে দীর্ঘ ২৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং নয় মাস মরণপণ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ২০০ বছরের বেশী সময় পরে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সূর্য উদিত হয়।


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ দেশের বৃহত্তম, প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় এবং দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। ভৌগলিক সীমারেখাগত বিস্তর দূরত্ব থাকার পরও আমাদেরকে পাকিস্তানের সাথে বেঁধে দেয়া হয়। ফলে জন্ম হয় পাকিস্তানের দুইটি অংশ- ‘পুর্ব পাকিস্তান’ও ‘পশ্চিম পাকিস্তান’এর। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতেই পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালি জাতির উপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, নির্যাতন, চরম অবহেলা ও দুঃশাসনে নিষ্পেষণের স্ট্রিম রোলার চলতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকের রক্তচক্ষুকে রুখে দাঁড়ানোর প্রয়াসে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠাকালীন এই সংগঠনের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকায় ঐতিহাসিক ‘রোজ গার্ডেন’ এ জননেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী মুসলিম লীগের প্রগতিশীল কর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’নামে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধীদলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রতিষ্ঠাকালে মাওলানা ভাসানী সভাপতি ও শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং জেলে থাকা অবস্থায় যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান।


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শুধু এ দেশের বৃহত্তম, প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠনই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির মূলধারাও। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একসূত্রে গাঁথা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সুদৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ১৯৪৮ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন সমাপ্ত হয় ১৯৫২ সালে। যা পৃথিবীর ইতিহাসে ‘ভাষা আন্দোলন’ নামে সম্মানের সাথে স্বীকৃত। তরুণ সংগ্রামী জননেতা শেখ মুজিব সেই সময়ে কারান্তরীণ অনশনে থেকে ভাষা আন্দোলনের প্রেরণাদাতার ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলনের মহান বিজয়ের পরে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় হয়। তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানি বর্বর-কুচক্রীমহল আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব থেকে দূরে রাখে। নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় নিশ্চিত হয় মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ। আওয়ামী লীগের উদ্যোগেই মাতৃভাষা বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার আনুষ্ঠানিক মর্যাদা লাভ করে, ২১ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হয় ‘শহিদ দিবস’হিসেবে এবং জাতীয় ‘ছুটির দিন’এর মর্যাদা লাভ করে। ‘শহিদ মিনার’এর নির্মাণ কাজও প্রায় সম্পন্ন হয় এই সরকারের উদ্যোগেই। প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলা একাডেমি’। এছাড়াও, আইয়ুব খানের এক দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬২ ও ’৬৪ এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৪ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ, ’৬৬ এর ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৮ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ৬-দফাভিত্তিক ’৭০ এর নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চের কালরাতের নৃশংস হত্যাকান্ড, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।


আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বঙ্গবন্ধু সরকার স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় যখন যুদ্ধে প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া দেশকে পুনর্গঠন করে অর্থনীতির চাকা সচল করার সংগ্রামে নিবেদিত ছিল ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। স্তব্ধ-স্থবির হয়ে যায় দেশ, থেমে যায় উন্নয়নের চাকা। মুখ থুবড়ে পড়ে গণতন্ত্র, ভোট ও ভাতের অধিকার। শুধু সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকেই না, জাতীয় চার নেতাকেও কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে গুলি করে হত্যা করা হয়। জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সমূলে উৎপাটনের নীল নকশা করা হয়।


জাতির পিতার দুই কন্যা বিদেশে অবস্থানের ফলে প্রাণে বেঁচে গেলেও তাদের দেশের মাটিতে আসতে দেয়া হয় না। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দীর্ঘ ৬ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকন্যাকে ফিরে পেয়ে প্রাণ ফিরে পান নেতা-কর্মীগণ, নব উদ্যমে সংগঠিত হতে থাকেন তারা। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাঙালির মূল্যবোধ ও হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন করে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুকন্যার শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ-সুদৃঢ় নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি ফিরে পান ‘ভাত ও ভোটের অধিকার’।


বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ’৭৫ সালে হোঁচট খাওয়ার পর আবারও চলতে শুরু করে উন্নয়নের চাকা। অর্থনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠে বিশেষ করে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকল্পে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘সেইফটি নেট’কার্যক্রম শুরু করেন। গ্রহণ করা হয় ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ এর মতো দারিদ্র বিমোচনে যুগান্তকারী কর্মসূচি। বয়স্কভাতা ও বিধবাভাতার মত কর্মসূচিগুলোর সূচনাও ঘটে এ সময়ে। তথ্য প্রযুক্তিখাতে আমদানিশুল্ক কমিয়ে তথ্য প্রযুক্তিকে জনগণের কাছে সহজলভ্য করে তোলে, ‘ডিজিটাল যুগ’ এ প্রবেশের সূচনা হয় মূলত এর মাধ্যমেই। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সাথে ‘গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তি’, ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর স্বীকৃতি, জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচন বিশ্ব আঙিনায় বাংলাদেশকে মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে নতুনভাবে উপস্থাপন করে।


২০০১ সালের নির্বাচনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দেশে শুরু হয় খুন, ধর্ষণ, হামলা, লুটপাট, সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের মহোৎসব। রাজাকার মন্ত্রিসভায় স্থান পায় আর রাজাকারের গাড়িতে উড়ে ৩০ লক্ষ শহিদের রক্ত ভেজা পতাকা। যুদ্ধ করে স্বাধীন একটি জাতির জন্য এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে। দুর্নীতি, চুরি আর লুটপাটের ফলে লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো মুখ থুবডে পড়ে, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়, বিশ্ব দুর্নীতির র‌্যাংকিং এ চ্যাম্পিয়নের খাতায় নাম ওঠে, জন্ম হয় ‘বাংলা ভাই’ এর মতো সাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠীর। সারাদেশে একসাথে চলে সিরিজ বোমা হামলা, পরিচালিত হয় ইতিহাসের নির্মম-বর্রোচিত গ্রেনেড হামলা। দেশকে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জনগণের ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্র্জন করে ২০০৮ সালে আবারও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।


বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি দেশরত্নশেখ হাসিনার নেতৃত্বে একযুগের অধিক মেয়াদে পরিচালিত হচ্ছে দেশ। ইতোমধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করতে পেরেছি। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ একটি প্রত্যয়ী ও মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে আমাদের অগ্রগতি বিস্ময়কর। ’ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর সুবিধা আজ শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড সুবিধা পৌঁছে গেছে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’এর সুবিধা কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিখাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। সারাদেশে একশত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। এসব বাস্তবায়ন হলে কর্মসংস্থান তৈরিসহ আমাদের অর্থনীতিতে আরও গতি সঞ্চার হবে। পৃথিবীর বুকে এখন আর আমরা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, মঙ্গা, ক্ষুধা, দারিদ্যপীড়িতের দেশ না। খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ।


এ দেশের সকল গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দলের নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে উদ্ধারকারীর ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়েছে।


জনমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে এ সংগঠনের নীতি, আদর্শ ও কর্ম পরিকল্পনায়। নেতা-কর্মীদের ইস্পাতসম মনোবল ও ঐক্যবদ্ধতার ফলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র সফল হয় নাই।


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ সংগঠনটি অতীতের মতো সামনের দিনগুলোতেও এ দেশের মানুষের সকল গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই সবার প্রত্যাশা। শুভকামনা জানাচ্ছি ‘অস্তমিত সূর্যোদয়ের দলকে’।


লেখক- বিসিএস (তথ্য), সংযুক্তি- প্রেস উইং, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।


বিবার্তা/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com