
ব্রাজিলের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। অক্টোবরের শুরুর দিকে হওয়া প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে পড়ার পরও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে এ জয় পেয়েছেন তিনি।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৯টার কিছু পর ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্ট লুলাকে বিজয়ী ঘোষণা করে। তিনি ৫১ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলার পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৬ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি ভোটার।
অন্যদিকে বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ শতাংশ ভোট। তাকে ভোট দিয়েছেন ৫ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি ভোটার। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ৪০ লাখেরও বেশি।
এই জয়ের মাধ্যমে ইতিহাস গড়লেন লুলা। আধুনিক ব্রাজিলের ইতিহাসে আর কোনো রাজনীতিবিদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম পর্বে হেরে যাওয়ার পর দ্বিতীয় দফার ভোটে জয়ী হতে পারেননি। যেটা করে দেখিয়েছেন এই বামপন্থি রাজনীতিবিদ।
বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান এদিনিয়ো সিলভা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।’ পোস্টের সঙ্গে তিনি একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। যেখানে সমর্থকদের ‘ওলে, ওলে, ওলে, ওলে, ওলা! লুলা, লুলা!’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।
তবে কিছু এলাকায় গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেয়ার খবর সামনে আসার পর ভোটারদের ভোটদানে বাধা দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এতে পুরো ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
লুলার সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন, বলসোনারোর সমর্থকরা বাস চলাচল কমিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে প্রেসিডেন্টের সমর্থক শ্রমিক-শ্রেণির ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারেন। এছাড়া ভারী বৃষ্টির কারণে দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বলসোনারোর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
এর আগে লুলা ও বলসোনারো—উভয় প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারশিবির ভোট দেয়ার সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। পরে দেশজুড়ে ভোটকেন্দ্রগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই ঘণ্টা বেশি খোলা রাখা হয়। ব্রাসিলিয়া সময় সন্ধ্যা ৭টা (জিএমটি রাত ১০টা) পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে।
এ জয়ের মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকছেন লুলা। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ এক নির্বাচনে জয় থেকে বঞ্চিত হলো অঞ্চলটির ডানপন্থি রাজনৈতিক শিবির।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেরু, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও ইকুয়েডরের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থি নেতারা জয়লাভ করেছেন। তাদের অনেকেই ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনমনে থাকা অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছেন।
ধাতুশ্রমিকদের সাবেক ইউনিয়ন নেতা ৮০ বছর বয়সী লুলা ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রে ফেরার পর ব্রাজিলের সবচেয়ে বেশি বয়সে শপথ নেয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেরই রেকর্ড ভাঙবেন তিনি।
এই জয়ের মাধ্যমে লুলা চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করলেন। এর আগে ২০০২, ২০০৬ এবং ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।
রবিবারের চূড়ান্ত পর্বে (রান-অফ) লুলা কিছুটা পিছিয়ে থাকা অবস্থায় লড়াইয়ে নেমেছিলেন। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে তিনি সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও, গত ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে তিনি বলসোনারোর চেয়ে পিছিয়ে পড়েছিলেন।
প্রথম দফায় লুলা ৪৫ শতাংশ ভোট পান, যেখানে ডানপন্থি সিনেটর বলসোনারো পান ৪৭ শতাংশ। ওই নির্বাচনে কোনোপ্রার্থীই ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় রান অফে গড়ায়।
১৯৮০-র দশকে, অর্থাৎ ব্রাজিলে সামরিক স্বৈরশাসনের শেষ পর্যায়ে রাজনীতিতে আসা লুলা এ পর্যন্ত সাতবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
২০০২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। এরপর ২০২২ সালে তিনি তৃতীয় মেয়াদে জয়লাভ করেন; আধুনিক ব্রাজিলের ইতিহাসে সেটি ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি নির্বাচন।
ওই নির্বাচনে লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কট্টর ডানপন্থি সাবেক প্রেসিডেন্ট জায়ার বলসোনারো। আর এবারের নির্বাচনে লুলার প্রতিপক্ষ সিনেটর বলসোনারো হলেন সেই জায়ার বলসোনারোরই সন্তান।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]