
দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক-রেল-নৌ ও আকাশপথের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথ দুর্ঘটনায় ১৩ হাজার ৪০৯ জন নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় ক্রাইম রিপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেভ দ্য রোড-এর মহাসচিব শান্তা ফারজানা এক প্রতিবেদন পাঠ ও সংবাদ সম্মেলনে উপরোক্ত তথ্য জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সড়কপথে চরম নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা আর আইন না মেনে বাহন চলাচলের কারণে ছোট-বড় মোট ৫৭ হাজার ৭৯৬ টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫৮ হাজার ৪৯১ এবং নিহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬৯৪ জন। অন্তবর্তীকালীন সরকারের এই ১৭ মাসে সড়কে নেমেছে প্রায় ২ লক্ষাধিক মোটরসাইকেল ও ৫ লক্ষাধিক অবৈধ ব্যাটারি চালিত রিকশা। ঢাকাসহ সারাদেশে ১৩ হাজার ৮২৩ টি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৩ হাজার ৮৩২ ও নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৩৮ জন। সেই সাথে উল্টোপথের বাহন হিসেবে ব্যাপক সামালোচিত ব্যাটারি চালিত অটো রিকশা, নসিমন, করিমন, পিকআপসহ এই শ্রেণির বাহনে ২১ হাজার ৬৩১ টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৩ হাজার ৬০৩ ও নিহত ৩ হাজার ৬৪৮ জন। নির্ধারিত গতিসীমা না মেনে, বিশ্রাম না নিয়ে টানা ১২ থেকে ২০ ঘণ্টা বাহন চালানোসহ নির্ধারিত ট্রাফিক আইনসহ প্রয়োজনীয় নিয়ম না মানায় ১২ হাজার ৭৪৬ টি বাস দুর্ঘটনায় আহত ১১ হাজার ৬৯৭ এবং নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৮৪ জন। ট্রাক-লড়িসহ ভাড়ি মালবাহী বাহনে নিয়ম না মেনে দ্রুতগতি ও অতিরিক্ত মালামাল বহনের কারণে ৮ হাজার ৯৬৮ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯৩৫৯ এবং নিহত ২ হাজার ৬২৪জন; যার অধিকাংশই পথচারী বা স্থানীয় নাগরিক। প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, সেভ দ্য রোড-এর চেয়ারম্যান মো. আখতারুজ্জামান, প্রতিষ্ঠাতা ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মোমিন মেহেদী, মহাসচিব শান্তা ফারজানা, ভাইস চেয়ারম্যান বিকাশ রায়, সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিদুল মল্লিকসহ সংশ্লিষ্ট গবেষণা সেল সদস্যদের তত্ত্বাবধানে ১৭ টি জাতীয় দৈনিক, ২০ টি টিভি-চ্যানেল, ২২ টি নিউজ পোর্টাল এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী-সেভ দ্য রোড-এর স্বেচ্ছাসেবী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া তথ্যানুসারে এই প্রতিবেদন দুর্ঘটনামুক্ত পথ-এর লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। আকাশ-সড়ক- রেল ও নৌপথ দুর্ঘটনামুক্ত করার জন্য নিবেদিত দেশের একমাত্র সচেতনতা-গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য রোড-এর পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়- ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সড়কে চরম নৈরাজ্য-আইন না মানার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। যা ক্রমশ সড়কে দুর্ঘটনা যেমন বৃদ্ধি করছে, তেমন আহত এবং নিহতের সংখ্যাও বাড়াচ্ছে।
সেভ দ্য রোড-এর দাবি অনুযায়ী প্রতি ৩ কিলোমিটারে পুলিশ বুথ বা ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন না করা ও হাইওয়ে পুলিশসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের পুলিশ-প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার কারণে সড়কপথে গত ১৭ মাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৪১১ টি, এতে ডাকাতদের হামলায় আহত ২৫৭ এবং নিহত হয়েছেন ২ জন। এছাড়াও নৌ, সড়ক ও রেলপথে নারী শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে ৮২৫ টি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৫ টি। যার অধিকাংশই থানা-পুলিশের শরণাপন্ন হয়ানি বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও সেভ দ্য রোড-এর স্বেচ্ছাসেবীদের তথ্যে উঠে এসেছে। নৌপথে কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের দায়িত্ব অবহেলার সুযোগে অন্যান্য বছরের তুলনায় ডাকাতি বেড়েছে। ২১৬ টি ডাকাতির ঘটনায় সর্বশেষ ১৮৮ জন আহত ও ১ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও সড়ক- রেল ও নৌপথে প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েই চলছে। গত ১৭ মাসে সারাদেশে ১৭ হাজার ৪১২ টিরও বেশি ছিনতাই ঘটনা ঘটেছে বলেও জানানো হয় এই প্রতিবেদনে। সেই সাথে জানানো হয়- ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত- নৌপথে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০৫২ টি। আহত ১৭৫৪ জন, নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন এবং নিখোঁজ আছেন ৪৬ জন; রেলপথে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে ১১০৬ টি। আহত হয়েছে ১০৭৬ জন, নিহত হয়েছে ৪৯২ জন; আকাশপথে ১ টি দুর্ঘটনায় ৩৬ জন নিহত এবং ১৭২ জন আহত হন। সেই সাথে বিমানবন্দরের কর্মরতদের দ্বারায় হয়রানি, নির্যাতন ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন ১৭ জন।
নতুন করে বছর বছর দাবি বা সুপারিশ উপস্থাপন না করে, সেভ দ্য রোড গত ১৮ বছর যাবৎ ৪ পথ দুর্ঘটনামুক্ত করতে ৭ দফা দাবি নিয়ে কাজ করছে। ৭ দফা- ১. মিরেরসরাই ট্রাজেডিতে নিহত অর্ধশত শিক্ষার্থীর স্মরণে ১১ জুলাইকে ‘দুর্ঘটনামুক্ত পথ দিবস’ ঘোষণা ও পঞ্চম শ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ে সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে চলাচলের নিয়ম-নীতি যুক্ত করতে হবে। ২. ৩ কিলোমিটার অন্তর পুলিশ বুথ স্থাপন, প্রতিটি সড়ক সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, সড়ক প্রশস্ত করার পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত করে যাত্রীদের চলাচলের সুবিধা দিতে হবে। ৩. সড়ক পথে ধর্ষণ-হয়রানি রোধে ফিটনেস বিহীন বাহন নিষিদ্ধ এবং কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যতীত চালক-সহযোগী নিয়োগ ও হেলপারদ্বারা পরিবহন চালানো বন্ধে সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ৪. সড়ক-নৌ-রেল ও আকাশ পথ দুর্ঘটনায় নিহতদের কমপক্ষে ১০ লাখ ও আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত ও ৩ লাখ টাকা সরকারিভাবে দিতে হবে। ৫. ‘ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স রুল’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সত্যিকারের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ‘ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৬. পথ দুর্ঘটনার তদন্ত ও সাজা ত্বরান্বিত করণের মধ্য দিয়ে সতর্কতা তৈরি করতে হবে এবং ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত হাইওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশ সহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা-সহমর্মিতা-সচেতনতার পাশাপাশি সকল পথের চালক-শ্রমিক ও যাত্রীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সকল পরিবহন চালকের লাইসেন্স থাকতে হবে। ৭. ইউলুপ বৃদ্ধি, পথ-সেতুসহ সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যাতে ভাঙা পথ, ভাঙা সেতু আর ভাঙা কালভার্টের কারণে আর কোন প্রাণ দিতে না।
উল্লেখ্য, ‘সেভ দ্য রোড-এর অঙ্গীকার পথ দুর্ঘটনা থাকবে না আর...’ স্লোগানকে সামনে রেখে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে ২০০৭ সালের ১৪ আগস্ট প্রাথমিক ও ২৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করে আকাশ-সড়ক- রেল ও নৌপথ দুর্ঘটনামুক্ত করার জন্য নিবেদিত দেশের একমাত্র সচেতনতা-গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য রোড। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সেভ দ্য রোড-এর চেয়ারম্যান শ্রদ্ধাজন মো. আখতারুজ্জামান, প্রতিষ্ঠাতা ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মোমিন মেহেদী, মহাসচিব শান্তা ফারজানা, ভাইস চেয়ারম্যান বিকাশ রায়, সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি, সমাজসেবি ও পথ বন্ধু আনিসুর রহমান মাস্টার, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিদুল মল্লিক প্রমুখ।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]