৩ বছরে বদলে গেছে দাসিয়ারছড়া ছিটমহল
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০১৮, ১০:০৮
৩ বছরে বদলে গেছে দাসিয়ারছড়া ছিটমহল
ফাইল ছবি
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

ছিটমহল বিনিময়ের ৩ বছরের মাথায় ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো, প্রশস্ত মসৃণ পাকা রাস্তা, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, সরকারি উদ্যোগে নির্মিত সৃদৃশ্য মসজিদ-মন্দির, বিটিসিএল অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল সেন্টার, স্কুল-কলেজ।


এ যেন আলাদীনের চেরাগের স্পর্শে বদলে গেছে এক নতুন জনপদ কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া। ১ আগস্ট ছিটমহল বিনিময়ের ৩ বছর পূর্তিতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রাপ্তি থাকায় খুশি বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা।


দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের অধিবাসীরা ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের মূল ভূ-খণ্ডের সাথে মিশে গিয়ে তাদের ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটে। মূল ভূ-খন্ডে যুক্ত হওয়ার তিন বছরের মধ্যে বর্তমান সরকারের ব্যাপক হারে উন্নয়ন বঞ্চিত ছিটবাসীদের কল্পনাকেও হার মানিয়েছে।


এখন আর কোনো অবরুদ্ধ জীবন নয়, স্বাধীনভাবে বাংলাদেশী নাগরিক হয়ে জীবন-যাপন করছে পুরো ছিটমহলবাসী। প্রতিটি পরিবারের ছেলেমেয়ে স্থানীয় স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ ছাড়াও দেশের বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ছে। অনেকেই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছে। এখন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যে সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, তার সবই পাচ্ছে সাবেক ছিটমহলের অধিবাসীরা।



এলজিইডি সুত্রে জানা গেছে, গত দু’বছরে বিশেষ বরাদ্দ প্রায় ২২ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ হয়েছে দাসিয়ারছড়ায়। এর মধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন, ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডির মাধ্যমে ২৪ কিলোমিটার পাকা রাস্তা তৈরি হয়েছে দাসিয়ারছড়ায়। ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে কালিররহাটে কমিউনিটি রির্সোস সেন্টার, ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি মসজিদ, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মন্দির, ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ব্রিজ, ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি হত দরিদ্র পরিবারের বসতবাড়ি নির্মাণ উল্লেখযোগ্য।


অন্যদিকে ভূমি জটিলতার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিরসন হয়ে গেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর ও সরকারি খাস খতিয়ান ভুক্ত ৯ একর জমির প্রাক জরিপ শেষ করে খতিয়ান হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকল্পে স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে।
দাসিয়ারছড়াসহ বিলুপ্ত ছিটমহলে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তির ৭৫ দিনের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫৬২ পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এখন আর কোনো বাড়িই নেই বিদ্যুৎবিহীন। দেয়া হয়েছে দ্রুত গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সরকারের সর্বোচ্চ মহল এখানকার সুবিধা অসুবিধার খোঁজ নিচ্ছেন । ডিজিটাল সাব সেন্টার থেকে স্বল্পমূল্যে দেয়া হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তির সেবা।


ইউনিসেফের অর্থায়নে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি স্থাপন করেছে ১৫টি প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে ১৪টি মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কেন্দ্র। উপজেলা কৃষি অফিসার অর্থায়নে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি দেয়া হয়েছে।


দাসিয়ারছড়ায় ঘরে ঘরে সুপেয় পানি আর স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদফতর বেকার যুব ও যুব মহিলাদের দেয়া হয়েছে নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ।



দাসিয়ারছড়া বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ মোট ছয়টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এগুলো হলো দাসিয়ারছড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, দাসিয়ার ছড়া নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, দাসিয়ারছড়া সমন্বয়পাড়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মইনুল হক নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মিশকাত আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ফজিলাতুন্নেছা দাখিল মাদ্রাসা। এই ৬ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দাসিয়ারছড়ার প্রায় ৭০০ জন ছাত্র-ছাত্রী পাঠদান করছে।


দাসিয়ারছড়ার সাবেক পঞ্চায়েত প্রধান নজরুল ইসলাম, আব্দুল হাকিম, আব্দুল জলিল, নুর আলম মাস্টার জানান, এখন তারা বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয় দিতে পেরে আনন্দিত ও গর্বিত। তবে সর্ববৃহৎ ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় প্রায় ৬ হাজার লোক বাস করলেও পৃথক ইউনিয়নের দাবি উপক্ষিত থেকেছে।


ছিটমহল আন্দোলনের নেতা গোলাম মোস্তফা খান বলেন, আমাদের প্রাণের দাবি দাসিয়ারছড়া ইউনিয়ন ঘোষণা না হলেও যেভাবে উন্নয়ন কাজ তিন বছরে হয়েছে তাতেই আমরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।


ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও বলেন, বিলুপ্ত ছিটমহলের অবরুদ্ধ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর। এছাড়াও গত তিন বছরে বিলুপ্ত ছিটমহলে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং উন্নয়নের কাজ চলতে থাকবে।


কর্মসূচি: ছিটমহল বিনিময়ের ৩ বছর পূর্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দারা। এর মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মোমবাতি প্রজ্জলন ও বঙ্গবুন্ধর প্রতিকৃতিত্বে পুস্পমাল্য অর্পণ, প্রতিটি বাড়িতে আলোক সজ্জাসহ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ১৮টি মসজিদে মিলাদ মাহফিল ও তিনটি মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা।


বিবার্তা/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com