‘ত্রাণ চাই না, দ্রুত বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা চাই’
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৮, ১৬:১৬
‘ত্রাণ চাই না, দ্রুত বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা চাই’
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রিন্ট অ-অ+

চতুর্দিকে সমুদ্রের লোনাজলে বেষ্টিত কক্সবাজারের মহেশখালীর ধলঘাটা গ্রাম। শেষ ভরসা অরক্ষিত বেড়িবাঁধেও এখন তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। ফলে ইউনিয়নের পন্ডিতের ডেইল, সাপমারারডেইল, বেগুনবনিয়া শরইতলা, উত্তর সুতরিয়া, বনজামিরা ঘোনা, নাছির মোহাম্মদ ডেইলসহ বলতে গেলে গ্রামটি এখন পানির নিচে ডুবন্ত। এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।


দীর্ঘদিন যাবত ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামতে সরকার কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দিলেও কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে চেয়ারম্যান ও ধলঘাটাবাসী।


সরেজমিন জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ওয়াপদা) ৭০ নং পোল্ডারের অধীনে থাকা ধলঘাটার বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধের অর্ধেকেরও বেশি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।


নতুন করে আরো ফাঁটল সৃষ্টি হওয়ায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানির তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাবে এমন আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে। এসব ঝুঁকিপুর্ণ জায়গায় কাজ করতে সরকার তড়িত গতিতে বরাদ্দ দিয়েছিলো। কিন্তু অদৃশ্য কারণে কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরব ভুমিকা হতাশ করেছে এলাকাবাসীকে।



ধলঘাটা গ্রাম মূলত বঙ্গোপসাগরের সাথে সংযুক্ত। গ্রাম রক্ষা বাধেঁর একাধিক পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে গিয়ে পাশ্ববর্তী এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল আজ পানির নিচে। ঘরবাড়ি, মাছের ঘের, লবণের গর্ত, ফসলি জমি ডুবে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে এলাকার মানুষ।


কয়েকটি ঠিকাদারের অবহেলায় বেড়িবাঁধের অবস্থা এমন সংকটাপন্ন বলে জানা যায়। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধীনে প্রায় ৭০ কোটি টাকার কাজ চলছে কাগজে দেখা যায়। শুধুমাত্র কিছু ব্লক পাথর তৈরি করলেও মূল বাঁধের কাজে নেই কোনো অগ্রগতি।


চেয়ারম্যান কামরুল হাসান ও এলাকাবাসী হাজার অনুরোধ করেও বাঁধের কাজ শুরু করাতে পারিনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে পুর্বের তৈরি খসে যাওয়া বেড়িবাঁধও ভেঙে এখন পন্ডিতের ডেইল, বেগুনবনিয়াসহ এলাকার পাঁচশত পরিবারের বাড়িঘর পানির নিচে।


পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, আরসিসি ব্লক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রক্ষার উদ্দেশে গত অর্থবছরে প্রায় ৮৫ কোটি টাকার বরাদ্দ হয়। আর এসব ঠিকাদারি কাজের দায়িত্ব পান চেয়ারম্যান মানিক ঠিকাদার, সিআইপি আতিকুল ইসলাম। কিন্তু এসব ঠিকাদার দায়সারাভাবে কাজ করতে থাকেন আবার কেউ কাজই শুরু করেননি। ফলে সরকার ও জনগণের কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ জলে ভাসছে। কিছু ঠিকাদার কৌশলে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে না পেয়ে উল্টো সময় বাড়িয়ে নিয়েছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।



কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, কিছু বস্তার মধ্যে বালু ভর্তি করে বেড়িবাঁধের উপর রেখে দিয়েছে। সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় দেয়ার ব্যাপারেও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।


পন্ডিতের ডেইল গ্রামের বারেক মিয়া (৫৫), উত্তর সুতরিয়া গ্রামের কলিম উল্লাহ (৩০), বনজামিরা ঘোনা গ্রামের মাস্টার আমিনুল হক (৫৭), বেগুনবনিয়া গ্রামের শেখ জিয়াবুল (২৭), শরইতলা গ্রামের মোক্তার আহম (৪৮) ও মোহাম্মদ ডেইলের আরো কয়েকজন জানান, দীর্ঘদিন যাবত ধলঘাটা ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক ও খারাপ।


তারা জানান, বেড়িবাঁধ ভাঙতে ভাঙতে চিকন হয়ে গেলেও ঠিকাদারের কনোন দেখা থাকে না। যে কোনো মুহূর্তে বেড়িবাঁধ একেবারে ভেঙে যেতে পারে। এমন আশঙ্কায় ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে রাতে ভয়ে ঘুমাতে পারে না জনগণ।


স্থানীয় ফরিদুল আলম (৩৫) বলেন, বিগত অমাবস্যায় জোয়ারের সময়ও বেড়িবাঁধ উপচে পড়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। মনে হয়েছিল এবার আর গ্রাম রক্ষা পাবে না।


ফোরকান আহমদ (৪৯) বলেন, বাঁধের অবস্থা খুব খারাপ। কন্ট্রাক্টর বেড়িবাঁধ এ মাটি ফেলবে বলে কথা দিলেও অনেকদিন তাদের কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি। বর্ষাকালে বড় জোয়ার হলে কোনোভাবেই রক্ষা পাওয়া যাবে না বলে জানান তিনি।


এমন শঙ্কায় পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রামে বসবাস করছে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। দিনে কোনো রকমে সময় পার করলেও রাতটা নারীদের কাছে বেশ ভয়ের বলে জানান। কেননা যেকোনো সময় গ্রাম তলিয়ে যেতে পারে এমন আশংকা বিরাজ করছে।


একই গ্রামের কাইসার হামিদ (৪৯) বলেন, ভেঙে গেলে হয়তো এমপি বা সরকারের লোকেরা ত্রাণ নিয়ে হাজির হবেন। কিন্তু আমরা পানির মধ্যে ঘরবাড়ি, জমি জায়গা ডুবে যাওয়ার পর ত্রাণ নিয়ে বাঁচতে চাই না। দ্রুত বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা চাই।


কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাউবো প্রধান প্রকৌশলী সবিবুর রহমানের ফোনে কয়েকবার ও সাংবাদিক পরিচয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



তবে নাম প্রকাশ না করা পাউবোর এক র্কমর্কতা ধলঘাটা বেড়িবাঁধের অবস্থা সংকটাপন্ন রয়েছে স্বীকার করে জানান, বাঁধ মেরামতের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ তৈরি ও সংস্কারের জন্য কাজ করছেন। আপাতত ভাঙন কবলিত স্থানে বালুর বস্তা ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া আরো টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।


কাজে তদারকির দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ার সাজিদ জানান, আমরা ইতোমধ্যে ব্লক তৈরির কাজ শেষ করেছি, বর্ষার পরে বাকি কাজ শুরু করব। চুক্তি অনুযায়ী যথাযথভাবে কাজ করছি। দায়সারা কাজ কিংবা গাফিলতির বিষয় তিনি অস্বীকার করেন।


স্থানীয়দের দাবি, ঠিকাদার আতিকুল ইসলাম জিও ব্যাগ দিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকার কাজ এখনো শুরু না করায়, শরইতলা, উত্তর সুতরিয়া, বনজামিরা ঘোনা, নাছির মোহাম্মদডেইল ৪ টি গ্রামের প্রায় ১ হাজার পরিবার আজ প্লাবিত।


ঠিকাদার আতিকুল ইসলাম মুঠোফোনে জানান, তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ধলঘাটায় কোনো কাজ করছে না বলে দাবি করেন তিনি।


বিবার্তা/জাহেদ/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com