ফসল শুকানো হচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৮, ১২:৩৭
ফসল শুকানো হচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
নড়াইল প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

খেসারি-মসুরডালসহ মৌসুমী ফসল শুকানো হচ্ছে নড়াইলের সড়ক-মহাসড়ক ও গ্রামীণ সড়কগুলো। সড়ক ও জনপথের ১৭০ কিলোমিটার এবং এলজিইডির ২ হাজার ২৯৫ কিলোমিটার পাঁকা ও কাঁচা সড়কের বেশিরভাগে প্রায় ছয়মাস বিভিন্ন মৌসুমী ফসল শুকানো হচ্ছে। এর ফলে এই রাস্তাগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। চাকাসহ যন্ত্রাংশে ফসল জড়িয়ে নষ্ট হচ্ছে ছোট যানবাহনগুলো।


বিভিন্ন যানবাহনের চালক, যাত্রী ও পথচারীরা জানান, চাকায় ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ফসল জড়িয়ে যানবাহনগুলোর যেমন ধীরগতি হচ্ছে, তেমনি দুর্ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে বাইসাইকেল, ভ্যান, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও অটোরিক্সা চলাচলের ক্ষেত্রে বেশি সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি সময়ের অপচয় হচ্ছে।


গাড়ির চালক, যাত্রী ও পথচারীরা আরো জানান, সড়কে ফসল শুকানোর প্রতিবাদ করলে স্থানীয় কৃষকেরা তাদের লাঞ্ছিত করেন। এমনকি মারধরের শিকার হতে হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করতে হয়।


চলতি মাসের প্রথম দিকে লোহাগড়া উপজেলার এড়েন্দা-আমাদা-লুটিয়া সড়কে খেসারি কলাই (ডাল) মাড়াইয়ের প্রতিবাদ করায় ভ্যানচালকসহ এক যাত্রীকে মারধর করে এলাকার এক যুবক। এছাড়া অন্যান্য সড়কেও প্রতিনিয়ত স্থানীয় কৃষকেরা পথচারী ও যাত্রীসাধারণের সঙ্গে অশালীন আচরণসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।


ফাইল ছবি


নড়াইল-কালিয়া সড়কের অটোরিক্সা চালক নাসির বলেন, সড়কগুলোতে অনেক উঁচু করে কলাইসহ বিভিন্ন ফসল মাড়াই করা হচ্ছে। এতে গাড়ির চাকা ও মোটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ফসল জড়িয়ে চলাচল বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। যানবাহনেরও ক্ষতি হচ্ছে।


বাসচালক তারা মিয়া বলেন, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কেও ফসল শুকানো হচ্ছে। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই পথ চলতে হয়। পাশ (সাইড) কাটতে গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বেড়ে যাচ্ছে।


ট্রাকচালক ফসিয়ার জানান, সড়কে কলাই বা গম জাতীয় ফসল রাখার কারণে যানবাহনের চাকা এলোমেলোভাবে চলতে থাকে, ঠিকমত নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। দুই বা তিন চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রে আরো বেশি সমস্যা হয়।


নড়াইল-কালিয়া সড়কের দিঘলিয়া এলাকার আক্কাস মোল্যা (৪৭) বলেন, সড়ক-মহাসড়কসহ সব ধরণের রাস্তায় ফসল শুকানো এবং মাড়াই বন্ধে সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করছি। একই গ্রামের নয়ন মোল্যা (১৭) জানান, সড়কগুলোতে ফসল শুকানোর কারণে মোটরসাইকেল চালাতে বেশি সমস্যা হচ্ছে। হঠাৎ গতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হলে ফসলের ওপর চাকা দাঁড়াতে পারে না। এতে মোটরসাইকেল পিছলে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে।


বগুড়ার মোস্তফা কামাল বলেন, প্রায় ছয়মাস যাবত সড়কের ওপর বিভিন্ন ফসল শুকানো এবং মাড়াই করা হয়। বর্তমানে সড়ক-মহাসড়কসহ গ্রামীণ রাস্তাগুলো ফসলের দখলে বলা যায়। আইন প্রয়োগ করে রাস্তায় ফসল শুকানো একেবারে বন্ধ করা উচিত।


লোহাগড়া উপজেলার আমাদা আদর্শ কলেজের প্রভাষক মঞ্জুয়ারা পারভীন বলেন, বর্তমানে সড়কগুলোতে চলাচল করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ফসল শুকানো, মাড়াই, অবশিষ্ট অংশ ফেলা, বস্তায় প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সবকিছুই সড়কের ওপর করা হচ্ছে। এমনকি ফসলের অবশিষ্ট অংশ সড়কের ওপর এবং পাশে ফেলে রাখায় হেটে চলাচলও দায় হয়ে পড়েছে ! হঠাৎ বৃষ্টি হলে ফসলের অবশিষ্ট অংশ পচে সড়কগুলো আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।


ফাইল ছবি


এদিকে সদর উপজেলার সারকেলডাঙ্গার কোহিনুর বেগম জানান, পাকা রাস্তায় ফসল শুকাতে সুবিধা হয়। তাই বাড়ির উঠানে না শুকিয়ে সড়কে ফসল মাড়াই করেন।


দিঘলিয়ার জিয়া-পলিনা দম্পতি দাবি করে বলেন, রাস্তায় ফসল শুকানোর ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয় না। গাড়ির চাকার চাপে ফসল দ্রুত মাড়াই হয়ে যায়। এ সুবিধার জন্য সড়কে ফসল শুকিয়ে থাকেন তারা।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) নড়াইল জেলা শাখার সভাপতি সৈয়দ খায়রুল আলম বলেন, বিভিন্ন মওসুমে স্থানীয় কৃষকেরা সড়ক, মহাসড়ক ও গ্রামীণ সড়কগুলো ফসল মাড়াইয়ের কাজে ব্যবহার করেন। ডাল, গম, ধান, খড়, সরিষা, ধনে, তিল থেকে শুরু করে সব ধরণের ফসল শুকানো হয়। প্রায় ছয়মাস সড়কে ফসল শুকানোর কাজ চলে। এ অবস্থা দেখে মনে হয় না, এটি কোনো সড়ক বা মহাসড়ক ! সড়কগুলো একেবারে উঠোনবাড়ির মতো করে ফেলেন স্থানীয় কৃষকেরা। জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আইন প্রয়োগ করে সড়কে ফসল মাড়াই এখনই বন্ধ করা প্রয়োজন।


তিনি আরো জানান, কয়েক বছর ধরে সড়কগুলোতে ফসল মাড়াইয়ের এ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এ কারণে ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিল লোহাগড়ার জয়পুর এলাকায় সড়কে গম শুকানোর সময় মোটরসাইকেল আরোহী লিটন সরদার (৩২) পিছলে পড়ে যায়। এ সময় ট্রাকচাপায় প্রাণ হারান লিটন। এ ঘটনায় অপর আরোহী নির্মল পোদ্দার আহত হন। এছাড়া সড়কের ওপর ফসল মাড়াইয়ের কারণে বিভিন্ন সময়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় গত তিন বছরে শতাধিক আহত এবং অন্তত পাঁচজন পঙ্গুত্ববরণ করেছেন।


জেলা প্রশাসক মোঃ এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, ইদানীং দেখতে পাচ্ছি জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কগুলোর ওপর স্থানীয় কৃষকেরা কলাই (ডাল জাতীয়), জব ও গম শুকাতে দিচ্ছে। এতে কৃষকদের ফসল শুকানোর কাজ হলেও, আমাদের স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনারও কারণ হয়ে থাকে। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের নির্দেশনা দিয়েছি, যাতে সড়কে ফসল শুকানো থেকে কৃষকদের বিরত রাখা হয়। এ ব্যাপারে সকলকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন জেলা প্রশাসক।


বিবার্তা/শরিফুল/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com