আজ হানাদারমুক্ত লক্ষ্মীপুর দিবস
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৫:৫১
আজ হানাদারমুক্ত লক্ষ্মীপুর দিবস
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

আজ ৪ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত লক্ষ্মীপুর দিবস। ১৯৭১ সালের এইদিনে লক্ষ্মীপুর জেলা হানাদারমুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে লক্ষ্মীপুরেও হয় সম্মুখ যুদ্ধ। ফলত চলতে থাকে মুক্তিাকামী জনতার ওপর হানাদার বাহিনীর নির্যাতন।


১৯৭১ সাল স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লক্ষ্মীপুরের বাগবাড়ী বীজ গোডাউনে ক্যাম্প তৈরি করে। সেখানে টর্চার সেল স্থাপন করে নিরীহ বাঙালিদের ধরে এনে নির্যাতন চালাত। নির্যাতনের পর মুক্তিযোদ্ধাদের ও ধর্ষণ শেষেনারীদের হত্যা করে মৃতদেহ আশপাশের বাগানে পুঁতে ফেলতো হানাদার বাহিনী। ৫১ বছর আগের সেই বীজ গোডাউনটি এখনো আছে। পাশেই রয়েছে একটি গণকবর। সেই সময়কার নির্যাতনের আত্মচিৎকার যেন এখনও ভেসে আসছে।
নির্যাতন এবং হত্যার আরেকটি নির্মম স্থান পাশ্ববর্তী রহমতখালী খালের উপর থাকা মাদাম ব্রীজ। ব্রীজের পাশে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বাংকার ছিল। ব্রীজের উপর মুক্তিকামী এবং সাধারণ বাঙালিদের ধরে এনে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হতো। লাশগুলো খরস্রোতা খালে ভাসিয়ে দিত হানাদাররা। কিছু লাশ আবার ব্রীজের পশ্চিম পাশের একটি গর্তে ফেলে দেওয়া হতো। যুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে লক্ষ্মীপুর জেলায় বর্বর পাকিস্তানি হানাদার ও এ দেশীয় রাজাকার বাহিনী হত্যা, লুট, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়।



লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ১১নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ মজুপুর গ্রামের পাল বাড়ি নামক একটি হিন্দু বাড়িতে বর্বর তাণ্ডব চালায় হানাদাররা। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বাড়ি-ঘর। এসময় বেশ কয়েকজনস্থানীয় হিন্দু ও মুসলিমকে হত্যা করে তারা।


তবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লক্ষ্মীপুর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আত্মসমর্পণ করে তাদের সহযোগী রাজাকার ও আলবদর সদস্যরা। ৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর সদর হানাদারমুক্ত হয়।


মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের দিকে পাকিস্তানি বাহিনী লক্ষ্মীপুরে আসা শুরু করে। এরপর থেকেই শুরু হয় তাদের তাণ্ডবলীলা।


হানাদারের প্রতিহত করতে মে মাসের দিকে লক্ষ্মীপুর শহরের সার্কিট হাউস সংলগ্ন রায়পুর-লক্ষ্মীপুর সড়কের রহমতখালী খালের উপর থাকা ব্রীজটি গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দেয় মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা। পরে হানাদার বাহিনী সেখানে একটি বেইলি ব্রীজ নির্মাণ করে। ব্রীজের পাশেই তাদের একটি বাংকার ছিল। আর ব্রীজের উপর হাজার হাজার মানুষকে ধরে এনে হত্যা করে লাশ ফেলে দিত। মাদামের ভগ্নদশা ব্রীজটি এখনো হত্যা এবং নির্যাতনের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


এদিকে, লক্ষ্মীপুরকে পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধারা একটি পরিকল্পনা আঁকে।কমান্ডার রফিকুল ইসলাম মাস্টারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ২ ডিসেম্বর রাতে হানাদারদের ক্যাপ ঘিরে ফেলে। এতে পাকিস্তানি বাহিনীরা পালিয়ে যায় এবং ক্যাম্পে থাকা রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করে।


সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাহবুবুল আলম রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, লক্ষ্মীপুর থানা থেকে শুরু করে উত্তর মজুপুর, সাহাপুর, বাগবাড়িসহ পুরো এলাকাকে কর্ডন করে ফেলি। ৩ ডিসেম্বর হানাদারদের সাথে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল সংঘর্ষ হয়। তখন হানাদাররা টিকতে না পেরে তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদেরকে ক্যাম্পে রেখে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দিকে পালিয়ে যায়। এদিন আমরা হানাদারদের ক্যাম্পে থাকা রাজাকারদের আত্মসমর্পণ করার জন্য বলি। তারা আত্মসমর্পণ না করায় আমরা মুক্তিকামী স্থানীয় লোকজনকে সাথে নিয়ে একটি মিছিল বের করি।


তিনি বলেন, চতুর্দিক থেকে মিছিলের শব্দ বের হয়, তখন তারা নিরুপায় হয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ৪ ডিসেম্বর তারা আত্মসমর্পণ করলেও ওই রাতে চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। পিয়ারাপুরের রাজাকার মাওলানা আব্দুল হাইর নেতৃত্বে কাউন্টার একটি হামলা করে হানাদাররা। হামলায় আবু ছায়েদ নামে আমাদের একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আহত হয় তিনজন মুক্তিযোদ্ধা। ওই রাতেই হানাদাররা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে টিকতে না পেরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা এই যুদ্ধে অংশ নেয়। এটাই ছিল লক্ষ্মীপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের হানাদারবিরোধী শেষ প্রতিরোধ।


মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ইতিহাস সূত্রে জানা গেছে, রাজাকারদের সহায়তায় হানাদার বাহিনী জেলার বিভিস্থানে ক্যাম্প তৈরী করে। শহরের মাদাম ব্রীজ এবং বাগবাড়ি সিড গোডাউন ক্যাম্প ছাড়াও দালাল বাজার গালর্স হাই স্কুল, মডেল হাই স্কুল, মদিন উল্যা চৌধুরী (বটু চৌধুরী) বাড়ি, পিয়ারাপুর বাজার, মান্দারী মসজিদ ও প্রতাপগঞ্জ হাই স্কুল, রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসা, এল এম হাই স্কুল ও ডাকাতিয়া নদীর ঘাট, রামগতির চর কলাকোপা মাদরাসা, ওয়াপদা বিল্ডিং, আলেকজান্ডার সিড গোডাউন, কমলনগরের হাজিরহাট মসজিদ, করইতলা ইউনিয়ন পরিষদ ভবন গোডাউন, রামগঞ্জ গোডাউন এলাকা, রামগঞ্জ সরকারি হাই স্কুল, জিন্নাহ হল (জিয়া মার্কেট) ও ডাক বাংলো ছিলো হানাদার ও রাজাকার ক্যাপ এবং গণহত্যার স্থান।


এদিকে, স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসে লক্ষ্মীপুর-বেগমগঞ্জ সড়কে প্রতাপগঞ্জ হাই স্কুল, মান্দারী মসজিদ, মাদাম ঘাট ও বাগবাড়ী, লক্ষ্মীপুর-রামগঞ্জ সড়কে দালাল বাজার, কাজীর দিঘীর পাড়, কাফিলাতলী, পানপাড়া, মিরগঞ্জ, পদ্মা বাজার, মঠের পুল এবং রামগঞ্জের হাই স্কুল সড়ক ও আঙ্গারপাড়া, লক্ষ্মীপুর- রামগতি সড়কে চর কলাকোপার দক্ষিণে জমিদার হাট সংলগ্ন উত্তরে, করুণানগর, হাজির হাট আলেকজান্ডার এবং রামগতি থানা ও ওয়াপদা বিল্ডিং এলাকা, রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসা ও এল.এল হাই স্কুল এলাকায় অধিকাংশ যুদ্ধ সংগঠিত হয়।


বীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ৯ মাসে লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাগণ ৩৭টি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। এতে শহীদ হন ৩৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। নিহত হন হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ।



যুদ্ধে বীর শহীদরা হলেন-মনসুর আহমেদ, রবীন্দ্র কুমার সাহা, আলী আজম, লোকমান মিয়া, জয়নাল আবেদিন, মোহাম্মদ হোসেন, আবদুল বাকির, জহিরুল ইসলাম, আহাম্মদ উল্লাহ, আবদুল মতিন, মাজহারুল মনির সবুজ, চাঁদ মিয়া, নায়েক আবুল হাশেম, মো. মোস্তফা মিয়া, নুর মোহাম্মদ, রুহুল আমিন, আবুল খায়ের, আবদুল হাই, মমিন উল্যা, আবু ছায়েদ, আব্দুল হালিম বাসু, এসএম কামাল, মিরাজ উল্ল্যা, মো. আতিক উলাহ, মো. মোস্তফা, ইসমাইল মিয়া, আবদুল্লাহ, আবুল খায়ের ভুতা, সাহাদুলা মেম্বার, আবুল কালাম, মোস্তাফিজুর রহমান, বেনু মজুমদার, আলী মোহাম্মদ, শহীদ নজরুল ইসলাম ও আবদুল রশিদ।


এছাড়া, দেশের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে অংশ নিয়ে লক্ষ্মীপুরের মোট ১১৪ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।


বিবার্তা/সুমন/জামাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com