‘স্কয়ারে চিকিৎসায় আমার স্বপ্ন দূরে থাক, জীবন নিয়ে টানাটানি’
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০১৯, ২০:৩৪
‘স্কয়ারে চিকিৎসায় আমার স্বপ্ন দূরে থাক, জীবন নিয়ে টানাটানি’
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

বুকভরা আশা আর চোখ জুড়ানো স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ভর্তি হয়েছিলাম। পরিবার ,সমাজও আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো। সবাই চাইতো আমি যাতে বিসিএস ক্যাডার হতে পারি। আমিও সেটাকে লক্ষ্য হিসেবে নিলাম। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ বাধল বিপত্তি। ২০১৮ সালের আগস্টের ২৮ তারিখ আমি মাথা ঘুরে পড়ে যাই। এরপর সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আমার বন্ধুরা আমাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করায়। সেখানে আমার প্রাথমিক চিকিৎসার পর জানানো হয় আমার শরীরে বেশকিছু গুরুতর সমস্যা রয়েছে , যা অতিদ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে। এরপরে আমি উন্নত চিকিৎসার জন্য স্কয়ার হাসপাতালে যাই।আর এ যাওয়াটা আমার জীবনে কালো অধ্যায় নিয়ে আসলো। সেখানে অপারেশনের নামে আমাকে ভুল চিকিৎসা দেয়া হলো। আর এ ভুল চিকিৎসায় আমার বাম পাশ পুরোটা প্যারালাইজড হয়ে গেছে। আমি ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারিনা। স্কয়ারের কারণে আজকে আমার স্বপ্ন তো দূরে থাক, এখন জীবন নিয়ে টানাটানি।


বিবার্তার২৪ডট নেটের কাছে এসব অভিযোগের কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান শামীম।


শামীম বিবার্তাকে বলেন, ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর তিনি স্কয়ার হাসপাতালের ডা. কৃষ্ণা প্রভুর কাছে চিকিৎসার জন্য যান। সেখানে তার শরীরের অবস্থা দেখান , এর সমাধান কি তা জানতে চান। এ রোগের জন্য তাকে বিদেশে যেতে হবে কিনা তাও তিনি ডাক্তারের কাছে জানতে চান। এসময় ডা.কৃষ্ণা প্রভু তাকে বলেন,বিদেশ যাওয়ার কোনো দরকারই নেই। আমি সিএমসি ভেলোরের হেড, আমি নিউরো সার্জন। আমি এটা করতে পারবো।


শামীম বলেন, ডাক্তার বললেন আমার মারাত্মক সমস্যা। এ জন্য অপারেশন করতে হবে। আর অপারেশন না করলে আমি মারা যাবো। ডাক্তারের একথা শুনে আমি এরমধ্যে কয়েকবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, অপারেশনে রিস্ক আছে কিনা? তিনি জানালেন কোনো রিস্ক নেই।


তিনি আরো বললেন, অপারেশনের পরদিনই তুমি ওয়াশরুমে যেতে পারবা। তিনদিন পর তোমাকে রিলিজ দিতে পারবো। তুমি তোমার হলেও চলে যেতে পারবা। এসব শুনে আমার আব্বা লোন করে টাকার ব্যবস্থা করেন। অপারেশন করতে আমাদের সাড়ে তিন লাখ টাকা লেগেছে।


অপারেশন বিষয়ে জানতে চাইলে শামীম বলেন, ডাক্তার আমাকে আশ্বস্ত করলেও এরপরে আমি যখন জানুয়ারিতে হাসপাতালে গেলাম তখন আবারো জিজ্ঞেস করলাম অপারেশনে রিস্ক আছে কিনা? তখন আমি পূর্বের ন্যায় একই উত্তর পেলাম। তারপর ডাক্তারের কথানুযায়ী, চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি স্কয়ার হাসপাতালে আমার অপারেশন হলো। পরে আমাকে আইসিইউতে রাখা হলো।২৫ জানুয়ারি যখন আমাকে ক্যাবিনে আনা হয়, তখন আমি বললাম ওয়াশরুমে যাবো। এরপর আমার ছোট ভাইকে কল দিয়ে আনা হলো। আমার ছোট ভাই যখন আসলেন তখন সেখানের ডিউটি ডাক্তার তাকে বললেন, আপনার ভাইতো প্যারালাইজড হয়ে গেছে। এর আগে এ ব্যাপারে আমার ভাইকে কিংবা পরিবারকে কিছুই জানানো হয়নি। এরপর তারা আমার কি সমস্যা, কি হচ্ছে- না হচ্ছে, কিছুই বলতেছিল না। তারা লুকোচুরির আশ্রয় নিয়েছিল। এরপরে আমিও বুঝতে পারি যে, আমার বাম পাশ পুরোটা অবশ হয়ে আছে। ২৭ জানুয়ারি আমাকে রিলিজ দেয়া হয়।


ঢাবির এ শিক্ষার্থী বলেন, ফেব্রুয়ারির ৩ তারিথ আমি সেলাই কাটতে যাই, তখনও তারা আমার বাম পাশ অবশ হওয়ার ব্যাপারে কিছু বলে নাই। এসময় তারা আরেকটা চিট করে, অপারেশনের পর নামেমাত্র সিটিস্ক্যান করে , যা আমি পরে জানতে পারি।এপ্রিলের ২৮ তারিখ আমি এমআরআই করাই। আর সেটা দেখাই বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক হেড একেএম আনোয়ার উল্লাহ স্যারকে। উনি এটা দেখে বললেন, ভুল অপারেশনের কারণে তোমার স্ট্রোক হয়েছে। এটাকে তারা লুকিয়ে গেছে তোমাদের কাছে। সাথে সাথে ব্যবস্থা নিলে স্ট্রোকের ক্ষতি কমানো যেত।


ভুক্তভোগী এ শিক্ষার্থী বলেন, যখন আমার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হলো যে, ভুল চিকিৎসাই আমার জন্য কাল হলো। তখন আমি স্কয়ার হাসপাতালের কর্তৃপক্ষকে বললাম যে, আমাকে চিকিৎসা করতে বিদেশ পাঠাতে। তারা পারবে না বলে জানালো। তখন তারা আমাকে স্কয়ারে কয়েকদিন থেকে ফিজিওথেরাপি নিতে বললো, এর বেশি তারা কিছু করতে পারবে না বলে জানিয়ে দিলো।


হাসপাতালের চিফ এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার মো. ইশাম ইবনে ইউসুফ সিদ্দিকীর কথা উল্লেখ করে শামীম বিবার্তাকে বলেন, আমাকে নিয়ে করা প্রত্যেকটি মিটিংয়ে ইউসুফ সিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন। তিনি তিনদিন সময় নিয়েছিলেন আমার ব্যাপারে স্কয়ার গ্রুপের এমডির সাথে কথা বলার জন্য। কথা বলে তিনি আমাকে জানালেন, এমডি বলেছে, প্রয়োজনে হাসপাতাল বন্ধ করে দেবে, তারপরেও ক্ষতিপূরণ দেবেন না। তারপর তাদের আমার ব্যাপারটা যতবারই বলেছি তারা রিজেক্ট করেছে। এক পর্যায়ে মানবিক দিকে বিবেচনার কথা বলে ২ লাখ টাকা দিতে চায় তারা। তখন আমি বললাম ,এটা তো কোনো বিচার হতে পারে না। আপনারা আমার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিবেন। এটা তো ভিক্ষার পর্যায়ে পড়ে। টাকা না নেয়ায় তখন তারা উল্টো থ্রেড দিয়ে বলেছে, স্কয়ারের বিরুদ্ধে বিচারও পাবা না। যা দিচ্ছি সেটা মেনে নাও। এর বাহিরে গেলে কিছুই পাবা না।


ভুক্তভোগী শামীম তার অপারেশন ডাক্তার প্রসঙ্গে বলেন, আমি যখন ডা.কৃষ্ণা প্রভুর সাথে সাক্ষাত করে আমার ভুল চিকিৎসার ব্যাখা চাই তখন তিনি আমাকে বললেন, তোমার ভাগ্য ভালো যে, তুমি বেঁচে আছো, অন্য কেউ হলে মারা যেত। বাংলাদেশের কোনো ডাক্তার চিকিৎসা জানে না, ওরা তোমাকে মেরেই ফেলতো। আমি তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। কাজেই তুমি পঙ্গু হলেও সন্তুষ্ট থাকো। এ ধরণের কথা কোনো ডাক্তারের ইথিকসের মধ্যে পড়ে না বলে অভিযোগ করেন শামীম।


স্কয়ারের সঙ্গে তার বর্তমান যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিবার্তাকে বলেন, ফ্রি চিকিৎসা দেয়ার কথা থাকলেও গত মে মাসে গেলে তারা আমাকে চিকিৎসা দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয়। সর্বশেষ জুনের ২৪ তারিখ আমি হাসপাতালে যাই। তখন তারা আগের ন্যায় চিকিৎসা দিবে না বলে জানিয়েছে। এরপরে ফোন দিলে তারা রিসিভ করে না।


আপনি এখন কি চান এ প্রশ্নের জবাবে শামীম বিবার্তা প্রতিবেদককে বলেন, স্কয়ার হাসপাতাল অনেক মানুষের ক্ষতি করেছে। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো কি কেউ নেই? তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। যাতে আর কারো ভুল চিকিৎসা করতে তাদের বুক কাঁপে। আর আমাকে যে তারা পঙ্গু করেছে, তাই তাদের এ দায় নিয়ে আমাকে বিদেশ নিয়ে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা করাতে হবে। এক্ষেত্রে আমার পছন্দ আমেরিকার বিখ্যাত ডা. জাস্টিন এম ব্রাউন।


ভুক্তভোগীর অভিযোগ জানিয়ে এ বিষয়ে হাসপাতালের বক্তব্য জানতে চাইলে স্কয়ারের হাসপাতালের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট নওশাদ পারভেজ বিবার্তাকে বলেন, তিনি জরুরি মিটিংয়ে আছেন। এবিষয়ে তিনি কথা বলতে পারবেন না। একথা বলে তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।


অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্কয়ার হাসপাতালের চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার মো. ইশাম ইবনে ইউসুফ সিদ্দিকীকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।


উল্লেখ্য, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফিন্যান্স বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবীর স্বাধীন শুক্রবার (২৬ জুলাই) এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। হাসপাতালে ২২ ঘণ্টার কম সময় চিকিৎসা নেয়ার পর মারা যান স্বাধীন।এই সময়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিল করেছে ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকার উপরে।এতো কম সময়ে এতো মাত্রাতিরিক্ত বিল আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাসহ দেশের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে স্কয়ার হাসপাতাল।


বিবার্তা/রাসেল/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com