বৃষ্টি হলেই ঢাবিতে হয় জলাবদ্ধতা, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা!
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:৩৪
বৃষ্টি হলেই ঢাবিতে হয় জলাবদ্ধতা, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা!
ঢাবি প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

এক ঘণ্টার বৃষ্টিও হয়নি। অথচ এর মাধ্যমে এখানকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ বিভিন্ন জায়গায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। রাস্তার গর্তে গর্তে জমাটবদ্ধ ময়লা পানি, ডাস্টবিনের আশেপাশেও একই ধরণের পানি জমে রয়েছে। এই দৃশ্য দেখে সহজে বুঝা যায়, এই এলাকায় সামান্য ‍বৃষ্টি হলেই এখানকার মানুষের শুরু হয় চরম ভোগান্তি।


বলছি, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কথা। এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অনেক জায়গায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকা, কোথাও উঁচু-নিচু রাস্তা, আবার কোথাও সড়কে বড় বড় গর্ত থাকা, ড্রেন অপরিচ্ছন্ন থাকাসহ প্রভৃতি কারণে এখানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। যার ফলে ‍বৃষ্টি হলে এখানকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।


শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টায় এই এলাকায় বৃষ্টি হয়, যার ব্যাপ্তি এক ঘণ্টারও কম সময় ছিল। পরে এদিন সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন সংলগ্ন প্রক্টর অফিসের সামনের রাস্তায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বৃষ্টি হলেই এটা এখানকার নিত্যদিনের চিত্র বলে জানা যায়। এদিকে কলা ভবন ও ডাকসুর মাঝখান দিয়ে মধুর ক্যান্টিনে যাওয়ার রাস্তার অবস্থাও আরো ভয়াবহ। এখানের রাস্তায় বড় বড় গর্তে ময়লাযুক্ত পানি আর পানি! রাস্তায় স্পিড ব্রেকারের উভয় পাশে জলাবদ্ধতা থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের আসা- যাওয়াতে সমস্যা তৈরি হয়েছে।



অথচ এই রাস্তা ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া, মধুর ক্যান্টিন, সমাজবিজ্ঞান ভবন ও কেন্দ্রীয় মসজিদে যাওয়া আসা করেন। এক্ষেত্রে এই জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীদের চলাফেরায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের সামনেও একই চিত্র দেখা গেছে। এ যেন দেখার কেউ নেই!


সরেজমিনে আরো দেখা যায়, সামাজিক বিজ্ঞান ভবন চত্ত্বরেও জলাবদ্ধতা রয়েছে। শুধু তাই নয়, এখানের কফি হাটের আশেপাশে নানা জায়গায় ময়লাও জমে রয়েছে। যেখানে মশার উপদ্রবও লক্ষ্য করা গেছে।


গ্রন্থাগারে পড়তে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাকির হোসেন বিবার্তাকে বলেন, লাইব্রেরিতে দীর্ঘক্ষণ পড়ার মাঝে ব্রেক নিতে আমরা বন্ধুরা মিলে নিচে চা-কফি খেতে আসি। কিন্তু একটু বসে বা দাঁড়িয়ে তা খাওয়ার একটা পরিবেশ থাকে না। বিশেষ করে মশার উৎখাত বেশি। এখানে কিছু খেতে গেলে মশার কামড়ও খেতে হয়। আবার মশা মারতে গিয়ে হাত থেকে চা মাটিতে পড়ে যাওয়ারও একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। এছাড়া মসজিদে যেতে অর্ধেক রাস্তায় জলাবদ্ধতা থাকার কারণে সমস্যা তো হয়। আবার রাস্তার পাশ দিয়ে যেতে গেলেও পিছলে পড়ার ঘটনাও কম ঘটে না!



মলচত্বরে গিয়ে দেখা যায়, সর্বোচ্চ জলাবদ্ধতা এখানে। বৃষ্টি নামার সাথে সাথে এখানের একেকটা চত্বর যেন আলাদা হাওড়ে পরিণত হয়ে যায়। মল চত্বরের মাঝ দিয়ে যেসব সরু রাস্তা রয়েছে, তা একপাশে শুকনো থাকলেও অন্যপাশে জলেপূর্ণ থাকে। শুকনো রাস্তা দিয়ে কোনোরকম হেঁটে আসলেও পরের মাথায় এসে লাফ ঝাঁপ দিয়ে রাস্তা পার হতে হচ্ছে।


এদিকে সূর্যসেন হলের পাশে এবং ক্যাফেটেরিয়ার অপর পাশে দুইটি চত্বরে পানি জমতে দেখা যায়। দুইটি চত্বরে ময়লা আবর্জনা রাখা হয় নিয়মিত। কিন্তু পাশের ক্যাফেরিয়ায় খেতে গেলে এই ময়লার স্তুপ থেকে গন্ধ আসার পাশাপাশি মশার আক্রমণ তৈরি হয় অতিমাত্রায়। এরই পাশে অবস্থিত চায়ের স্টলে কর্মরত আরিফ বিবার্তাকে বলেন, নতুন করে এখানে ডাস্টবিন তৈরি করা হচ্ছে। এখন সাধারণত খোলামেলা জায়গাতে ময়লা রাখা হয়।


এই ডাস্টবিনের পাশ দিয়ে সোজা রাস্তা দিয়ে বিজয় একাত্তর হল, কবি জসীম উদদীন হল, জিয়াউর রহমান হল, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে যায় শিক্ষার্থীরা। এখানেও রয়েছে জলাবদ্ধতা। বিজয় একাত্তর হলের গেইটের সামনের নিচু জায়গায় জমে রয়েছে পানি। এর সামনে বঙ্গবন্ধু হলের প্রধান গেইট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ছোট ছোট গর্তে জমাটবদ্ধ পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছে।



বিজয় একাত্তর হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাহবুবুর রহমান বিবার্তাকে বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেও আমাদের হলের সামনে গর্তের মধ্যে পানি জমে যায়। এদিকে হল থেকে বের হয়ে ডান দিকে একটু সামনে যেতেই ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দেখা যায়। যেখানে মশা মাছির বংশ বিস্তার ঘটছে। এভাবে প্রতিটি হলের আশপাশে জলাবদ্ধতাসহ নানা সমস্যা বিরাজমান।


তিনি বলেন, এখন ডেঙ্গুর প্রকোপ চলছে। কাজেই এই সময়ে ময়লা পানি জলাবদ্ধ হয়ে থাকা, ড্রেন-ডাস্টবিন পরিষ্কার না থাকা আমাদের জন্য হুমকি স্বরূপ। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবিলম্বে এই বিষয়ে নজর দেয়া উচিত।


ক্ষোভ প্রকাশ করে সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী রাশেদ উদ্দীন বিবার্তাকে বলেন, শিক্ষকরা আমাদের অভিভাবক। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে তারা আমাদের জন্য কী করেন? হলের খাবারে সমস্যা, থাকার সমস্যা, এখন আবার বৃষ্টির সময়ে যাতায়াত ভোগান্তি আমাদের ভোগাচ্ছে।



তিনি বলেন, এতো সমস্যা মোকাবিলা করে আমরা পড়াশোনা করবো কখন? শিক্ষকরা যদি আমাদের বিষয়গুলো আন্তরিকতার সাথে দেখে সমাধান করতেন, তাহলে আমরা আরো নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করতে পারতাম।


বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও একই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। শামসুন নাহার হলের ভেতরে বিভিন্ন আঙ্গিনায়ও জলাবদ্ধতা তৈরি হয় বলে জানা যায়। হলে অবস্থানরত ছাত্রীদের অভিযোগ,বৃষ্টি হওয়ার ফলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। অধিক বৃষ্টি হলে দীর্ঘদিন এই জলাবদ্ধতা থাকে। শুধু হলের ভেতরে নয়, হল গেইটের সামনেও মাঝে মাঝে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এসব কারণে মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয় এখানে- সেখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ৭ই মার্চ ভবনের সামনেও বৃষ্টি হওয়ার ফলে পানি জমে আছে বলে জানা যায়। একইসাথে বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল, ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের ছাত্রীরাও একই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।


বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলের ছাত্রী আফসানা খাতুন বিবার্তাকে বলেন, এমনিতে আমাদের হল ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে। এরপর আবার সামান্য বৃষ্টি হলে হলের সামনের রাস্তাসহ এরআশপাশের এলাকা বৃষ্টির পানিতে নাজেহাল হয়ে যায়। ফলে যাতায়াতে ভুক্তভোগী হচ্ছি আমরা।



তিনি বলেন, বৃষ্টির সময়ে এই পরিস্থিতির জন্য অনেকেই রিক্সা দিয়ে যাতায়াত করে৷ এক্ষেত্রে যাদের অর্থনৈতিক সমস্যা আছে, তাদের নানা বিড়ম্বনা সহ্য করেও যাতায়াত করতে হচ্ছে। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পূর্ণ জলাবদ্ধতামুক্ত করতে প্রশাসনকে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।


বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের জলাবদ্ধতার বিষয়ে অবগত করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা অফিসের পরিচালক সরদার ইলিয়াস হোসেন বিবার্তাকে বলেন, বৃষ্টির কারণে হওয়া জলাবদ্ধতা নিরসনে আমাদের পরিকল্পনা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যানের মধ্যে এটা রয়েছে। আমরা ফার্স্ট পেইজে এই কাজটা করবো। আপনি এই বিষয়ে বিস্তারিত ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের কাছে পাবেন।


বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী বিবার্তাকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে আমাদের পরিকল্পনা আছে। এটা নিয়ে বৎসর ওয়ারি একটা কাজ চলে।


তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা বিভিন্ন কারণে হয়। ক্যাম্পাসটাকে আমরা গারবেইজ হিসেবে ব্যবহার করি। এক্ষেত্রে বহিরাগতদের খুবই উপদ্রব। তারা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে যায়। পরে বৃষ্টি হলে বিভিন্ন জায়গায় ময়লা জমে জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ত, এগুলো নিয়মিত মেইনটেনেন্স করতে হয়। সেটি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বৃষ্টির অনুপাতের উপর নির্ভর করে অর্থাৎ কখনো বেশি বৃষ্টিপাত আবার কখনো কম বৃষ্টিপাত হয়। তারপরেও শহরের অন্যান্য জায়গার চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। তবে এটাকে আরো উন্নত করতে পারলে আমরা সবাই সুবিধাটা পাবো।


বিবার্তা/সাইদুল/রাসেল/বিএম

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com