বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পিএইচডি করার তথ্য-উপাত্ত নেই ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে: তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২২, ১০:২৩
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পিএইচডি করার তথ্য-উপাত্ত নেই ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে: তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি শুধুই নাম নন- প্রজ্বলিত নক্ষত্র। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশর মহাকাব্য। লাখো কোটি বাঙালির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ঐশ্বর্য। ‌‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী নন্দিত এক মহানায়কের নাম বঙ্গবন্ধু। তিনি বাঙালি জাতির পিতা। এই মহামানবের জন্ম না হলে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রেরই জন্ম হতো না।



বঙ্গবন্ধুর আজীবনের স্বপ্ন ছিল বাংলার স্বাধীনতা ও বাঙালির জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা করা। এ বোধে তিনি শৈশব থেকে নিজেকে তৈরি করেছেন। বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য জেল খেটেছেন। অত্যাচার সহ্য করেছেন। আন্দোলন, লড়াই-সংগ্রাম করে বাঙালির স্বাধীনতাও এনে দিয়েছেন। কিন্তু বাঙালির কী দুর্ভাগ্য! আজীবনের স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশেই বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারহত্যা করলো ঘাতকের দল। তারপরেও বঙ্গবন্ধুই বাঙালির চেতনার রাজ্যের মহারাজা, মননের শেষ আশ্রয়।



এমন মহামানব ও দেশপ্রেমী রাষ্ট্রনায়কের জীবনগাঁথা নিয়ে অনেক বই প্রকাশিত হলেও সেগুলো অনলাইন ভার্সন তেমন একটা নেই। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, শৈশব-কৈশোর, যৌবন, শিক্ষাজীবন, রাজনৈতিক জীবন, ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে হত্যা এসব তথ্য ভার্চুয়ালি থাকলেও নতুন প্রজন্মের পঠন-পাঠনের জন্য, উচ্চতর ডিগ্রির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত কম বলে মতামত দিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।


ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য জীবনসহ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যেসব তথ্য রয়েছে, সেগুলো নতুন প্রজন্মের জানা ও শেখার জন্য কতটা উপযুক্ত, পর্যাপ্ত কি-না, তথ্যগুলো কতটুকু সঠিক, কী করলে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক সকল তথ্য একত্রে পাওয়া যাবে, এইসব তথ্য-উপাত্ত অনলাইনে সুরক্ষিত রাখতে করণীয় কী হতে পারে- এসব বিষয়ে বিবার্তার সাথে কথা বলেছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞসহ খাতসংশ্লিষ্টরা।



তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে যে পরিমাণে গবেষণা হওয়ার দরকার তা হচ্ছে না। খোকা থেকে মিয়া ভাই তারপর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা, তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ইতিহাস- এসব বিষয়গুলো নিয়ে আরো গবেষণা হওয়া দরকার। জাতির পিতার বর্ণাঢ্য জীবন ও হত্যাকাণ্ডের যেসব তথ্য এখন ইন্টারনেটে আছে, সেগুলোকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে শুধু লেখা আকারে তথ্য-উপাত্ত রাখলেই হবে না। সেগুলোকে ভিজুয়াল করে তরুণ প্রজন্মের কাছে আর্কষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে হবে। তাহলেই তারা দেখবে, জানবে ও শিখবে। আর এসব তথ্য-উপাত্ত সুরক্ষিত করতে নিতে হবে সময়োপযোগী উদ্যোগ।



এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) জেনারেল সেক্রেটারি মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বিবার্তাকে বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ক্লাউডে যেসব তথ্য রয়েছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন এবং অগোছালো। একটা অথেনটিক এবং দায়িত্বশীল প্লাটফর্মে তথ্যগুলো গোছানো অবস্থায় থাকা দরকার। যেমনটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে আমরা দেখতে পাই। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এখানে যেসব তথ্য থাকবে সেগুলোর সঠিক যথাযথ সূত্র প্রয়োজন। যা অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না।



তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটা বই যেমন ইতিহাসের দলিল, তেমনি বঙ্গবন্ধু হত্যা বিষয়ে কিছু মৌলিক রেফারেন্স প্রয়োজন। এতে তথ্যসূত্র যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি সেগুলো ইতিহাসকে পোক্ত করবে। এই সব তথ্যসূত্র সংযুক্তিসহ কোনো অভিন্ন ওয়েব মাধ্যমে প্রকাশিত হবে। সেইজন্য একটি রিসার্চ কমিটি থাকবে যারা দায়িত্ব নিয়ে কাজটি করবে এবং যথাযথ প্রমাণসহ সব তথ্যের বিষয়ে ঘোষণ দিবে এবং প্রকাশ করবে।


সারাদেশের লাখো নারী উদ্যোক্তাদের স্বপ্নদ্রষ্টা ওম্যান অ্যান্ড ই-কমার্স ট্রাস্ট্রের (উই) প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার নিশা বিবার্তাকে বলেন, ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে এখন বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনসহ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যেসব তথ্য রয়েছে সেগুলো নতুন প্রজন্ম সঠিকভাবেই জানতে পারছে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, সিআরআইসহ বেসরকারি পর্যায়েও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার বিষয়টি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সঠিকভাবে জানাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আমার মনে হয় আরো বড় আঙ্গিকে অনলাইন প্লাটফর্মে বিষয়টিকে জানানোর সুযোগ রয়েছে। আমার বিশ্বাস, একদম স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলে স্কুলে যদি জাতির পিতার জীবনের নানা বিষয় নিয়ে নিয়মিত আলোচনামূলক অনুষ্ঠান হয়, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আরো জানতে পারবে জাতির পিতাকে।



তথ্যগুলোকে আরো সমৃদ্ধ করবার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) জয়েন সেক্রেটারি ও স্টার্ট-আপ রেভারি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিমা আক্তার নিশা আরো বলেন, অনলাইনে ১৫ আগস্টের শোক দিবসের তথ্যগুলোকে আরো সমৃদ্ধ করবার সুযোগ রয়েছে। অনলাইন প্লাটফর্মে পজেটিভ কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমেও শোক দিবসের ঘটনাপ্রবাহ মানুষকে বড় পরিসরে জানানোর সুযোগ আছে। ভার্চুয়াল লাইভে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিয়ে, শোক দিবস বিভিন্ন ডকুমেন্টারি এবং প্রচারপত্র প্রকাশের সুযোগ আছে। অনলাইনে বঙ্গবন্ধুর জীবনের নানা বিষয় প্রচার করতে পারলে আমাদের জানার আরো বড় সুযোগ তৈরি হবে।



জানতে চাইলে ই-ক্যাবের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি রাজিব আহমেদ বিবার্তাকে বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির পিতা। তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড শুধু নিন্দনীয় নয়, বরং বাঙালির জন্য চিরস্থায়ী ক্ষতি আর শূন্যতা তৈরি করেছে। আশার কথা, অনেক বছর পরে হলেও এই হত্যাক্যাণ্ডের বিচার হয়েছে।


ই-কমার্স সেক্টরের এই গবেষক বলেন, ইন্টারনেটে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক তথ্য রয়েছে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে, ব্লগে, ফেসবুকে ও ইউটিউবে। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর সঠিক ইতিহাস জানার জন্য অনলাইনে পর্যাপ্ত তথ্য আছে। বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির পিতা এবং ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। এসব বিষয় নিয়ে সরকারিভাবে একটি ওয়েবসাইট থাকলে ভালো হতো। যেখানে এ নিয়ে সবধরনের তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। আর সেটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজে মানুষ জানতে পারবে।



বর্তমানের ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে যেসব তথ্য আছে সেগুলো কতটা নির্ভুল? এমন প্রশ্নে ই-ক্যাবের সাবেক এই সভাপতি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক তথ্য অনলাইনে আছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্য দেয়া আছে। যারা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বা তাদের সমর্থক অথবা বঙ্গবন্ধুর বিরোধী, তারা নানাভাবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে জাস্টিফাই করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা এবং বিকৃত তথ্য দিয়েছে। এজন্য আসলে সরকারিভাবে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ব্লগ আর্টিকেল, মিডিয়ার আর্কাইভ, ইউটিউব ভিডিওর লিঙ্ক এসব থাকলে সবার বুঝতে সুবিধা হয়। সরকারিভাবে ওয়েবসাইটে তথ্য সংরক্ষণ করা হলে সেটি নির্ভুল ও সঠিক হবে বলে আমি মনে করি।



বঙ্গবন্ধুর সবধরনের তথ্য সরকারি ওয়েবসাইটে সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলা ভাষায় অনেক তথ্য আছে। তবে বঙ্গবন্ধুর পরিচিতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দেশেই ছিল এবং আছে। তাই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সবধরনের তথ্য বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিসহ বিশ্বের আরো অন্তত ১০-১১টি ভাষায় রাখা উচিত।



সিটিও ফোরাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তপন কান্তি সরকার বিবার্তাকে বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যেসব তথ্য আছে, সেগুলো আগে শুধু বইপুস্তকে প্রিন্ট আকারে প্রকাশ হতো। সেগুলো এখন প্রযুক্তি ও ইন্টারন্টের কল্যাণে ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে। যে কেউ জাতির পিতার বিষয়ে জানতে চাইলে অনলাইনে সার্চ করে জানা সম্ভব হচ্ছে। সেসব তথ্য জাতি কোনদিনই জানতো না, সেগুলোও এখন ইন্টারনেটে আসছে। সহজে মিলছে। আমার দৃষ্টিতে বর্তমানে ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের যেসব তথ্য/ইতিহাস রয়েছে সেগুলো সংখ্যায় অনেক বেশি। তবে অপরিকল্পিতভাবে রয়েছে। আর একটা লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, জাতির পিতাকে নিয়ে যে পরিমাণে গবেষণা করার দরকার, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।


তথ্যগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে সহজে পৌঁছে দিতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন তথ্য প্রযুক্তিবিদদের জাতীয় এই সংগঠনটির সভাপতি। তিনি বলেন, এখন এসব তথ্যগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে নিয়ে যেতে হলে একটু বিভিন্নভাবে প্রেজেন্টেশন করা দরকার। তরুণরা সৃজনশীলতাকে পছন্দ করে। জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের তথ্যগুলো সঠিক এবং নির্ভুলভাবে বিভিন্ন প্লাটফর্মে উপস্থাপন করা হলে, তাহলে তরুণরা সহজে দেখবে, জানবে। সরকারিভাবে ব্লগ বা ওয়েবসাইট তৈরি করে সেখানে ইউটিউবের মাধ্যমে, নাটক বা সিনেমার তৈরি করে তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তাহলে এই প্রজন্ম সেগুলো দেখে জাতির পিতা সম্পর্কে শিখতে ও জানতে পারবে।


বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেসব তথ্য রয়েছে সেগুলোকে সুরক্ষিত করার বিষয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রযুক্তির এ যুগে তথ্যগুলো সুরক্ষিত রাখা বেশ কঠিন । কেননা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে তথ্যগুলো ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে রাখছে। এখন এসব তথ্যগুলো সরকারিভাবে একটা জাতীয় প্লাটফর্মে রাখতে পারলে এর নিরাপত্তাটা নিশ্চিত করা যেতো। যেমন, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের অধীনে বা অন্য যেকোনো একটা জাতীয় প্লাটফর্মে সব তথ্যগুলো যদি একসাথে করা যেতো, তাহলে দেশ-বিদেশের যেকেউ সহজে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে জানতে পারতো এবং ওই তথ্যগুলো সুরাক্ষাও নিশ্চিত করা যেতো।


টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তিখাতের গ্রাহক অধিকার নিয়ে সোচ্চার সংগঠন বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বিবার্তাকে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের এক যুগ পূর্তি হলেও ডিজিটাল মাধ্যমে এখনো সুনির্দিষ্টভাবে ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে একটি ডিজিটাল লাইব্রেরি তৈরি করা হয়নি। আমরা এমন একটি ডিজিটাল লাইব্রেরির কথা বলছি, যেখানে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপের মাধ্যমে জাতির পিতার রাজনৈতিক জীবনের শুরু অর্থাৎ ছাত্ররাজনীতি বা তারও পূর্বে জন্মের ইতিহাস থেকে শুরু করে ১৫ আগস্ট জাতির কলঙ্কময় দিন পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা ও তথ্য একটি ক্লিকের মাধ্যমে পেয়ে যাবো। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা যতটুকু ডিজিটালি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তথ্য পাই তা মানসম্পন্ন নয়। এই তথ্যগুলো সুনির্দিষ্ট ভাবে বা সিরিয়াল অনুযায়ী পাওয়া যায় না।



মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস (এমএফএস) সেক্টর এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে ভিত্তি জাতির পিতা ১৯৭৫ সালে ১৪ জুন বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে শুরু করে গিয়েছিলেন, যার ধারাবাহিকতায় তার সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আজ সত্যিই বাংলাদেশ ডিজিটাল হয়েছে কিন্তু যিনি ভিত্তি রচনা করে গেলেন তার জীবনী এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেস থাকবে না, তা হয় না। আমরা চাই সরকার যেনো একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করে তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব তথ্য সুনির্দিষ্ট ভাবে উপস্থাপন করে। এর মাধ্যমে সারাবিশ্বের সকল মানুষ হাতের মুঠোয় জাতির পিতার সকল তথ্য পাবেন।


ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি এবং অপটিম্যাক্স কমিউনিকেশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমদাদুল হক বিবার্তাকে বলেন, দেখুন, আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলবো ক্লাউডে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস, জন্ম-বেড় ওঠা, শিক্ষা জীবন, রাজনৈতিক জীবন, জীবন দর্শন, সংগ্রামের জীবন, নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, নেপথ্যের কারণ, খুনিদের জীবনী এসব তথ্য ধারাবাহিকভাবে কোথাও নেই।



এরপরে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সত্য ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা, ইতিহাসকে বিকৃত করার ষড়যন্ত্র এসব তথ্য সম্পর্কে জানার জন্য যেসব তথ্য রয়েছে তা ‍খুবই অপ্রতুল। যেসব তথ্য আছে তা বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। এমন কোন ডকুমেন্টরি করা হয়নি যেখানে বঙ্গবন্ধুর পুরো জীবনী রয়েছে। যেটা দেখে নতুন প্রজন্ম জাতির পিতা সম্পর্কে জানতে পারবে, শিক্ষা নিতে পারবে। আমি ছাত্রজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। আমিও অনেক সময় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিভিন্ন কিছু জানা ও পড়ার জন্য যখন অনলাইনে যাই, তখন এখানে সেখানে সার্চ করতে হয়। সহজে পাওয়া যায় না। বেশির ভাগ তথ্যই পাই না। আর আমাদের সন্তানরা তো জানেই না কোন ওয়েবসাইটে গেলে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে জানা যাবে।



তথ্যগুলোকে গুছিয়ে একটা প্লাটফর্মে নিয়ে আসার পরামর্শ দিয়ে সংগঠনটির এই নেতা বলেন, যে মানুষটা দেশকে ভালোবেসে জীবনের লম্বা সময় জেলে বন্দি জীবনযাপন করেছেন। দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন এমন মহমানবের বর্ণাঢ্য জীবন কাহিনী আমাদের নতুন প্রজন্মের জানাটা খুবই জরুরি। বাঙালি জাতি হিসেবে এটা প্রতিটা নাগরিকের জানাটা আবশ্যকীয় বিষয়। আর এই জানার জন্য জাতির পিতার সমস্ত তথ্যগুলোকে সহজ করে দেয়াটা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমার পরামর্শ হলো, নতুন প্রজন্ম জাতির পিতা সম্পর্কে তথ্য জানতে যখন অনলাইনে যাবে, তখন যেনো একটা জায়গায় সমস্ত ইতিহাস পেতে পারে। এই জন্য সরকারিভাবে একটা ওয়েবসাইট করা সময়ের দাবি।



তথ্যগুলো সঠিক ও নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করার বিষয়ে তিনি বলেন, আসলে অনলাইনে কতভাবেই তো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা-লেখি হয়েছে এবং হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, যে লেখাটা হচ্ছে বিষয়টা কতটা সঠিক ও নির্ভুল সেটা বিচারের মানদণ্ড কী? কারা এটা যাচাই করবে? কোনটা সঠিক সেটা যদি না জানা যায় তাহলে নতুন প্রজন্মও ভুলটা পড়ে ভুল শিখবে। একটা আর্টিকেল লিখে দিলাম আর প্রকাশ হলো। সেটা করলে নতুনরা ভুলটা জানবে। তাই এ বিষয়েও একটা সেল গঠন করা যেতে পারে, যারা এসব তথ্যগুলো দেখে অনলাইনে প্রকাশ করবে। এসব বিষয়েও পরিকল্পনা করতে হবে।


বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সুব্রত সরকার বিবার্তাকে বলেন, এক মহাকাব্যের নাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক মহামানবের নাম বঙ্গবন্ধু। এমন মানুষ সম্পর্কে জানতে যেসব তথ্যের প্রয়োজন সেগুলো লিখিত আকার বইপুস্তকে থাকলেও সেটা যথেষ্ট না। উনাকে নিয়ে প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। লেখালেখির প্রয়োজন আছে। আর ভার্চুয়াল প্লাটফর্মেও সেগুলোর উপস্থিতি অনেকটা কম। আর যা আছে সেগুলো বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ হয়েছে।


তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ বাণিজ্যিক সংগঠনটির এই নেতা বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের পুরোটাই গবেষণার বিষয়। বিশেষ করে ১৫ আগস্টের কালো অধ্যায়ের নেপথ্যে কে বা কারা জড়িত, তাদের পরিচয়, কতদিন থেকে নীল নকশা করে আসছিল, পুরো ষড়যন্ত্রের পেছনে কার হাত ছিল, এসব ব্যক্তিদের নিয়ে বিস্তারিত লিখে জাতির সামনে তুলে ধরলে এবং সংরক্ষণ করলে নতুন প্রজন্ম সঠিক তথ্যগুলো জানতে পারবে। তাদের কাছে সঠিক ইতিহাসটা পৌঁছে দিতে না পারলে তারাও ভুলটা জানবে, শিখবে। এর জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। অনলাইনে জাতির পিতার সব তথ্যগুলো একটা জায়গায় রাখার উদ্যোগ নিলে যখন যা জানার প্রয়োজন হবে, তখন সেখানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে পড়তে ও জানতে পারবে।



বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং গিগা টেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরা জুবেরি হিমিকা বিবার্তাকে বলেন, অনলাইনে জাতির পিতার বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে লেখা যে পরিমাণে তথ্য আছে, আমার কাছে মনে হয়েছে, যথেষ্টই আছে। আর এসব তরুণ প্রজন্ম পড়ছে এবং জানছেও। এখনকার যুগে ছেলে-মেয়েরা অনলাইনে সব তথ্য সহজে খুঁজে বের করতে পারে। সারাদেশে আমাদের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানাতে স্কুল-কলেজে যদিও নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আরও বেশি করে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে পড়ানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। আর অনলাইনে যেসব তথ্যগুলো বিভিন্ন জায়গায় আছে, সেগুলো একটা জায়গায় এনে রাখলে আগ্রহীদের তথ্যগুলো খুঁজে পেতে সহজ হবে। তথ্যগুলো যেহেতু রাষ্ট্রীয় সম্পদ, তাই একসাথে আনার কাজটা সরকারিভাবে করা যেতে পারে।



বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. বিকর্ণ কুমার ঘোষ বিবার্তাকে বলেন, দেখুন বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন মহামনব। তিনি এমন একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন যিনি বাঙালি জাতিকে ভালোবেসে জাতির জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। জাতি প্রতি তার অবদান অতুলনীয়। এসব বিষয়ে আমরা কতজনই কতটুকু জানি। বিগত সময়ে উনাকে নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। এখনও হচ্ছে। তবে উনাকে নিয়ে অনলাইনে তথ্য রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম।



জাতির পিতার তথ্যগুলোকে সংরক্ষিত করার বিষয়ে ডা. বিকর্ণ কুমার ঘোষ বলেন, বঙ্গবন্ধুর ছোটবেলা থেকে, শৈশব-কৈশোর, যৌবন, পরিণত বয়স, ছাত্ররাজনীতি, খোকা-থেকে মুজিব, বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা, রাজনৈতিক জীবনাদর্শন, জাতি গঠনে ভূমিকা এই যে ইতিহাস- এইগুলো একসাথে করে একটা প্লাটফর্ম করলে খুব ভালো হয়। আমার মতে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, এছাড়াও বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট রয়েছে তারা পরিকল্পনা করলে জাতির পিতার পুরো জীবন নিয়ে একটা ডিজিটাল লাইব্রেরি করতে পারেন। তাহলে কেউ যদি বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও জীবনাদর্শ এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মানুষের প্রতি কেমন ভালোবাসা ছিল এসব বিষয়ে পিএইচডি করতে চান তাহলে করতে পারবেন। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা ও সেই অনুসারে কাজের বাস্তবায়ন। এটা সময়ের দাবি। কেননা, নতুন প্রজন্ম আগামী দিনের দেশের নেতৃত্বে আসবে। তারা যদি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন, দেশের প্রতি ভালোবাসা, আত্মত্যাগ সম্পর্কে না জানতে পারে তাহলে তারা দেশের জন্য নিঃশর্তভাবে কাজের অনুপ্রেরণা পাবে না।


ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বিবার্তাকে বলেন, দেখুন, ভার্চুয়াল প্লাটফর্মটা কারো ব্যক্তিগত বিষয় না। কিংবা সরকারেরও এমন কোনো বিষয় না। ভার্চুয়াল প্লাটফর্মগুলো নরমালি যাদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেয়া আছে, তারা সে দায়িত্বগুলো তাদের মতো করে পালন করে থাকে। আমাদের নিজস্ব প্লাটফর্ম থেকে বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কিছু কর্মীবাহিনী আছে, যারা এসব তথ্যগুলো প্রকাশ করে থাকে। আমি মনে করি, অনলাইনে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে প্রচুর তথ্য আছে। প্রচুর বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রচুর ভিডিও আছে, ছবি আছে। এসব তথ্যগুলো ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে অবশ্যই সমন্বিতভাবে দেয়া উচিত।


তথ্যগুলো সংরক্ষণের কিছু পরামর্শ দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি বিকাশের অগ্রদূত মোস্তাফা জব্বার। তিনি বলেন, এসব তথ্য-উপাত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো সংরক্ষণ করতে পারে। যেমন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, বঙ্গবন্ধু জাদুঘরসহ আরো যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ তাদের অঙ্গ-সংগঠন আছে সবাই মিলে দায়িত্ব পালন করলে তথ্যগুলো আরো সমৃদ্ধ হবে। আমি এটা স্বীকার করবো যে, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যে পরিমাণ তথ্য ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে থাকার দরকার, সে পরিমাণ তথ্য এখনও পর্যন্ত সন্নিবেশিত হয়নি। তবে এটা হওয়া উচিত।


বিবার্তা/গমেজ/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com