পান্থকুঞ্জ পার্ক, অপরাধের অভয়ারণ্য
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২২, ০০:২৩
পান্থকুঞ্জ পার্ক, অপরাধের অভয়ারণ্য
এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

প্রায় সাড়ে চার বছর থেকে পার্কটি পরিত্যক্ত। পার্কের ভেতরে উঁচু-নিচু গর্ত ও ঝোপজঙ্গল মিলে এক ভূতুড়ে পরিবেশ। পার্কের ঝোপজঙ্গলে চলছে নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। সন্ধ্যা নামলেই বাড়ে ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের অবাধ আনাগোনা। এমনকি রাতের অন্ধকারে পার্কটি ভাসমান পতিতালয়ে পরিণত হয়। বলছি রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পান্থকুঞ্জ পার্কের কথা।



রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও পান্থপথ। জনবহুল ঢাকার একটু স্বস্তির জায়গা ছিল পান্থকুঞ্জ পার্ক। যেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় শরীর চর্চা চলত। অনেকে প্রখর দুপুরে ক্লান্ত শরীরে বিশ্রাম নিতেন এই পার্কে। বছর পাঁচ আগেও খুব ভালো পরিবেশ না থাকলেও পার্কটি উন্মুক্ত ছিল সবার জন্য।



দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ পার্কটির আধুনিকায়নে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে পার্কের চারপাশ টিন দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। পরিকল্পনা ছিল এক বছরের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শেষে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। কিন্তু কাজ শুরুর কয়েকদিন পর দক্ষিণ সিটি জানতে পারে, পার্কের এক পাশে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা উড়ালসড়ক প্রকল্পের দুই-তিনটি পিলার এখানে বসতে পারে। সাথে সাথে বন্ধ করে দেওয়া হয় পার্কের উন্নয়ন কাজ।


এভাবে প্রায় চার বছর পার হলেও এখনো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় শুরু হয়নি। শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পার্কটির একপাশে কাজী নজরুল ইসলাম রোড অন্যপাশে বীরউত্তম সি আর দত্ত রোড। দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লা রাখার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন। পাশে পাবলিক টয়লেট। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব পাশ ময়লার ভাগাড়ে পরিণিত হয়েছে। সংস্কারের লক্ষ্যে নিরাপত্তা বেষ্টনীর জন্য দেওয়া টিনের বেড়ার বেশিরভাগ অংশ হাওয়া হয়ে গেছে। ফলে যে-কোনো দিক দিয়ে পার্কে প্রবেশ করা যায়।



প্রথম দেখায় মনে হবে এটি একটি ভাগাড়। পার্কের ভেতরে ঢুকবার কোনো রাস্তা নেই। কিন্তু নিশাচর মানুষের পায়ের ছাপে বিভিন্ন জায়গা রাস্তায় পরিণত হয়েছে। রাস্তা ধরে ভেতরে এগুতেই দেখা গেল জঙ্গলের মাঝে কিছু যুবক দলবেঁধে বসে কিছু একটা করছে। এছাড়াও অনেককে জঙ্গলের ভেতর বসে থাকতে ও ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। পার্কটি বন্ধ থাকায় বীরউত্তম সি আর দত্ত রোডের ফুটপাতে হকার ও অস্থায়ী দোকান বসেছে। তার পাশাপাশি ভাসমান মানুষের বসতিও দেখা যায়।


পার্কের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে পাথরের স্তূপ, পাইপ ও নানা নির্মাণ সামগ্রীস্তূপ করে রাখা। অযত্ন অবহেলার কারণে সেগুলোকে ঘিরে নানা ধরনের লতাপাতায় জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। ভেতরে পূর্বে নির্মিত সাধারণ মানুষের বসার একটি ছাউনি টিন দিয়ে ঘিরে রাখা, পার্কের বিভিন্ন জায়গা ড্রেনের মত গর্ত কাটা ও পার্ক সংস্কারের জন্য তৈরি করা কিছু টিনের ঘর।



২০১৬ সালে সোনারগাঁ হেটেলের সার্ক ফোয়ারার পাশে স্থাপন করা হয়েছিল ডিজিটাল এলইডি বোর্ড। সেটির অবস্থা একেবারেই নড়বড়ে। যে-কোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। তার পাশেই শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে অনেকে। আবার সেখানেই দুই শিশু ঘুড়ি উড়ানোর চেষ্টায় মগ্ন।



তাদের সাথে কথা হয় বিবার্তার। তারা হাতিরপুলের স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইমরান হাসান ও মো.আশরাফুল আলম। দুজনেই পড়াশোনা করেন তৃতীয় শ্রেণিতে। ইমরান বলেন, আমাদের স্কুলে খেলার কোনো মাঠ নেই। আমাদের বাসার আশেপাশেও কোনো মাঠ নেই, পার্ক নেই। সারাদিন ঘরের ভেতর ভালো লাগে না। এই পার্কের অবস্থাও ভালো না, ভেতরে যাওয়া যায় না জঙ্গলে ভর্তি, ভয় লাগে। আর সব জায়গায় ময়লা ও দুর্গন্ধ ভরা।


শুধু ইমরান, আশরাফুল না—ঢাকায় বসবাসরত বেশিরভাগ শিশুদের খেলার জায়গা নেই এই শহরে। নেই কোনো শরীর চর্চা বা বিশ্রামের জায়গা। কংক্রিটের শহরে একটু বিশ্রাম নিতে, হাঁটতে কিংবা খেলতে অনেকই এখনো এই পার্কে আসে।


পার্কের কারওয়ান বাজার সিগন্যালের কোনায় বসার কিছু জায়গা আছে। শিশুরা সেই কোনায় ক্রিকেট, ফুটবল খেলে। তার চারপাশে প্রশ্রাব-পায়খানার দুর্গন্ধে নিশ্বাস নেওয়া কষ্টকর। সেখানেই বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন অনেকে। তাদের মধ্যে বয়স্ক একজন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কথা হয় তার সাথে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী মো. হাইবর মিয়া (৭০)। হাতিরপুল কাঁচা বাজারে ছেলের সাথে থাকেন। বয়স হয়েছে, তাই বাসায় একা একা ভালো লাগে না। ছেলে অফিসে গেছে। ছেলের বউ নাতি-নাতনিদের নিয়ে গেছে স্কুলে। এই পার্কে মাঝেমধ্যেই এসে সময় কাটান বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এখন যেখানে ময়লার স্টেশন বানিয়েছে সেখানে খেলার মাঠ ছিল। স্কুলের ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করত। এলাকার অনেক মানুষ পার্কে এসে শরীর চর্চা করত, হাঁটাহাঁটি করত। অথচ এখন দেখেন কীঅবস্থা। এর ভেতর দিয়ে মানুষ হাঁটতেও ভয় পায়। আর রাতে এলাকাটি মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের দখলে চলে যায়। এছাড়াও নানান স্থান থেকে হিজড়া ও মহিলারা এখানে আসেন, অনৈতিক কাজে লিপ্ত হন বলে জানান।



কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পার্কের ভেতর অনেক অনৈতিক কাজ চলে। দিনেও ভেতরে গেলে গাঁ শিউরে ওঠে। আর সন্ধ্যার পর ছিনতাইয়ের ঘটনাে তো আছেই। কারওয়ান বাজার, বাংলামোটরের আশেপাশে হকারি করে পানি বিক্রি করেন মো. কাশেম মিয়া। তিনি বিবার্তাকে জানান, এখান দিয়ে সন্ধ্যার পর হেঁটে যাওয়া খুবই বিপদজনক। এমনকি সিগন্যালে অপেক্ষামান গাড়ির ভেতরেও নিরাপদ নয়। গত মাসখানেকের মধ্যে আমি তিনটি ছিনতাইয়ের ঘটনা দেখেছি। এমনও দেখেছি স্বামী-স্ত্রী একসাথে হেঁটে যাচ্ছিলেন। স্ত্রীর চেইন গলা থেকে টান দিয়ে ছিঁড়ে নিয়ে নিমিষেই পার্কের ভেতর চলে যায়।


নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, পাবলিক টয়লেট ও বক্স কালভার্টের কেন্দ্রস্থলের জটিলতার পর যোগ হয়েছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সমন্বয়হীনতা। পার্কের সংস্কার কাজ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অপেক্ষায় আছে।


পার্কটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের আওতায়। পার্কের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিবার্তার কথা হয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সাথে। তিনি বলেন, এই পার্ক নিয়ে আমি নিজেও বিরক্ত হয়ে গেছি। অনেকবার নিজের টাকা দিয়ে লাইট লাগিয়েছি কিন্তু চুরি হয়ে যায়। এমনকি পার্কের চারপাশের টিন পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে।


আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা যখন একটা কাজ করি তখন তা যাতে অনেকদিন টিকে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি করি। আগের যে ডিজাইন ছিল তা সংশোধন করে আবার পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে কনসাল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ডিজাইনও তৈরি করা হয়েছে। বছরের জুন-জুলাই মাসে আমাদের ক্লোজিং ছিল। আশা করছি আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ পার্কের কাজ শুরু হবে।


পার্কের ভেতরে কোনো স্থাপনা থাকবে না বলে জানান আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, শুধু পার্ক হবে। যেখানে মানুষ সকাল-সন্ধ্যায় হাঁটতে পারবে, শরীর চর্চা করতে পারবে, ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করতে পারবে। পার্কের ভেতর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মত বিভিন্ন বৃক্ষ রোপণ করা হবে। ব্যায়ামের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা করা হবে। এজন্য আমাদের পার্কের উন্নয়ন কাজ করতে দেরি হচ্ছে।


এছাড়াও পুরো পার্ক সবুজায়ন করা হবে বলে জানান আসাদুজ্জামান। কারণ, এমনিতে ঢাকায় গাছের সংখ্যা কম, তাই নানা ধরনের গাছ রোপণ করা হবে। আগে যারা ডিজাইন করেছিল সেখানে অনেক স্থাপনা ছিল। নতুন ডিজাইনে কোনো ধরনের স্থাপনা পার্কের ভেতরে করা হবে না।


তিনি আরও বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারণে পার্কের জায়গা কমবে। তাই ভেতরে কোনো স্থাপনা করা হবে না। আর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ না হওয়ায় আমাদের কাজ দেরি হচ্ছে।



দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকা পান্থকুঞ্জ পার্ক সংস্কার নিয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদের সাথে কথা হয় বিবার্তার। তিনি বলেন, আপনারা জানেন পার্কের উন্নয়নে অনেকদিন ধরে একটা জটিলতা ছিল। কারণ পার্কের ভেতর দিয়ে উড়াল সড়ক হবে। যা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এলামেইন্টের মধ্যে পড়েছে। এ কারণে একাধিকবার পার্কের উন্নয়ন কাজ পিছিয়েছে। এটা নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এই পার্কের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কথা। তাহলে আর পার্কের অস্তিত্ব থাকবে না। এটা নিয়ে দেন দরবার করার কারণে এতদিন দেরি হয়েছে।



তিনি আরও বলেন, গত সপ্তাহে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে। পার্কটাকে রক্ষা করে তারা যদি সাইট দিয়ে চারটি পিলার করে নিতে পারে তাহলে সিটি করপোরেশন অনুমতি দিবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর ইতোমধ্যে আমরা আমাদের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছি—পার্কটির ড্রয়িং ডিজাইনের জন্য। তারা আগামী ২ মাসের মধ্যে আমাদের ডিজাইন দিয়ে দিবে। ডিজাইন হাতে পেলে আমরা টেন্ডারে চলে যাব।


ফরিদ আহমেদ আরও বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যদি চারটা পিলার এখানে করে নিতে পারে তাহলে নিবে। না হলে মাননীয় মেয়র মহোদয় এর বেশি পিলার পার্কের ভেতরে করতে দিবেন না।


বিবার্তা/রিয়াদ/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com