করোনায় ঢাকা ছাড়ছেন অনেকেই, বিপাকে ভাড়াটিয়ারা
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২০, ১৬:২০
করোনায় ঢাকা ছাড়ছেন অনেকেই, বিপাকে ভাড়াটিয়ারা
খলিলুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

সাবানা বেগম। রাজধানীর পশ্চিম তেজতুরী বাজারের বাসিন্দা। তিনি ওই এলাকায় দুটি ভবনে তিনটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে হোস্টেলের ব্যবসা করেন। কারওয়ান বাজারের ভাসমান ব্যবসায়ীরা তার বাসায় থাকেন। বিনিময় প্রতিদিন ১৫০ টাকা করে দিতে হয়ে প্রতিজনকে। কিন্তু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে ভাসমান ব্যবসায়ীরা গ্রামে যাওয়া শুরু করেন।


বিশেষ করে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর সবাই গ্রামে ছুটে যান। তার ফ্ল্যাটগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। তাই গত তিন মাসে বাসা ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। বিবার্তার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এমন তথ্যই জানান সাবানা।


সাবানা জানান, তিনি দীর্ঘ তিন বছর থেকে ওই এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া করে নিজে স্বপরিবারে বসবাস করছেন। পাশাপাশি ভাসমান ব্যবসায়ী, ছাত্র ও কর্মজীবী মানুষের জন্য খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করছেন তিনি। একদিন থাকা ও খাবারের জন্য প্রতিজন ১৫০ টাকা করে দিয়ে থাকেন। মাস শেষে ওই টাকা থেকে বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও পানি বিলসহ যাবতীয় খরচ বহন করেন সাবানা।


সাবানা আরো জানান, গত ৮ মার্চ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে অস্থায়ী ভাড়াটিয়ারা গ্রামে যাওয়া শুরু করেন। বিশেষ করে সরকার যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে; তারপর থেকে সবাই গ্রামে চলে যায়। বর্তমানে তিনটি ফ্ল্যাটই ফাঁকা পড়ে আছে। কিন্তু প্রতিমাসে ওই তিনটি ফ্ল্যাটে ভাড়া গুনতে হয় ৭০ হাজার টাকা। তবে এই মাসে ব্যবসা না হওয়াতে কোথা থেকে বাসা ভাড়া দিবেন ওই দুচিন্তায় দিন কাটছে সাবানার।


তিনি জানান, করোনাভাইরাসের কারণে রাজধানীতে অনেক বাড়ির মালিক ভাড়া মওকুফ করেছেন। এ ধারাবাহিকতায় তার বাড়ির মালিক এক মাসের বাসা ভাড়া মওকুফ করেছেন। তবে বাকি দুই মাসের ভাড়া এখনো দিতে পারেননি।


একই এলাকায় ভাড়া করে বসবাস করেন লিংকন নামের আরেক ব্যক্তি। তিনি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসা ও অফিসে গিয়ে কম্পিউটার মেরামত করেন। সেই সুবাদে পশ্চিম তেজতুরী বাজার এলাকায় একটি বাসা ভাড়া করেন থাকেন। কিন্তু করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকার ছুটি ঘোষণার পর তার ওই ব্যবসা বন্ধ রয়েছে। তিনিও চলে গেছেন গ্রামের বাড়িতে।


গ্রামের বাড়ি থেকে মোবাইল ফোনে তিনি বিবার্তাকে জানান, করোনাভাইরাসের কারণে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে অনেকেই। এছাড়া এ ভাইরাস প্রতিরোধে বর্তমানে কেউ বাসা ও বাড়িতে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তাই গত তিন মাস থেকে তিনি একটি কাজও পাননি।


তিনি জানান, কাজ না পাওয়ায় খাবারের টাকাও ছিল না তার কাছে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনিও গ্রামে চলে যান। তবে তিন মাস শেষ হয়েছে; নতুন মাসের ১৯ দিন চলে গেছে। এখনো বাসা ভাড়া দেননি। কিন্তু কোথা থেকে বাসা ভাড়া দিবেন এটা নিয়ে দুচিন্তায় রয়েছেন লিংকনও।


ফার্মগেট এলাকায় সেলুন ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম বিবার্তাকে জানান, তিনি সেখানে একটি রুম ভাড়া করে সেলুন ব্যবসা করছেন। এছাড়াও সেই এলাকায় সেলুনের কর্মচারীদের নিয়ে একটি বাসা ভাড়া করে বসবাস করেন তিনি। কিন্তু গত তিন মাস থেকে সেলুন বন্ধ রয়েছে। এছাড়া কর্মচারীরাও বাড়ি চলে গেছেন। এমতাবস্থায় দোকান ভাড়া ও বাসা ভাড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি।


জাহিদুল ইসলাম নামের আরেক স্টেশনারী ব্যবসায়ী জানান, ওই দোকান থেকে পরিবারের সব খবর চলে। কিন্তু গত কয়েক দিন থেকে দোকান বন্ধ রয়েছে। এতে দোকান ভাড়া ও বাসা নিয়ে বিপদে পড়েছেন তিনি।


শুধু সাবানা, লিংকন, আশরাফুল ও জাহিদুল নয়, তাদের মতো কয়েক লাখ মানুষ রাজধানীতে বাসা ভাড়া করে বসবাস করেন। এছাড়া দোকান ভাড়া করে ব্যবসা করেন। কিন্তু করোনাভাইরাসে সব কিছু বন্ধ থাকায় আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দোকান ভাড়া ও বাসা নিয়ে মহাবিপদে পড়েছেন তারা।


এছাড়াও রাজধানীতে নিম্ন আয়ের মানুষগুলোতে বাসা ভাড়া নিয়ে অসহায়ের মত মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে দেখা গেছে। গতকাল আবুল হোসেন নামের এক ব্যক্তি রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় বাসা ভাড়ার জন্য ভিক্ষা করতে দেখা গেছে।


আবুল বিবার্তাকে জানান, তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে মিরপুরে একটি বস্তিতে বসবাস করেন এবং নগরীতে রিকশা চালান। কিন্তু গত তিন মাস থেকে তার আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। এত ঘরে খাবারের কিছু নেই। তবে পুলিশ ও এলাকার বিত্তবান লোকজন দুটি দিন খাদ্য সামগ্রী দিয়েছেন। এইগুলো দিয়ে কয়েক দিন খেয়েছেন।


তিনি জানান, মাস শেষে বাসা বাড়া বাবদ তিন হাজার টাকা দিতে হয়। কিন্তু ছুটি থাকায় তিনি গত দিন মাস রিকশা চালাতে পারেনি। তাই এখন কোনো টাকা নেই। তাই বাসা ভাড়া নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন।


হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা সোহান জানান, ঢাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে অনেক মালিক অত্যাচার নতুন কিছু নয়। তারা কোনো সমস্যা বুঝতে চায় না। এমনকি করোনা পরিস্থিতিতেই বাড়ি ভাড়া দ্রুত দেয়ার জন্য তাগিদও দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি ভাড়া না দিতে পারলে বাসা থেকে বের করে দেয়ার সম্ভবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।


রজম আলী নামের এক নির্মাণ শ্রমিক জানান, তিনি রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় সাড়ে চার হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে একটি মেসে থাকেন। সেখানে থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের কাজ করেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ রয়েছে। তাই গত তিন মাস থেকে কাজে যাইনি। তবে এখন বাসা ভাড়া কোথা থেকে দিবেন তা নিয়েও দুঃশ্চিতায় রয়েছেন তিনি।


ডিএমপি সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগরীর ৫০টি থানায় ৬২ লাখ ৩৪ হাজার ৫৪৭ জনের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (সিআইএমএস) সংরক্ষণ করেছে। এর মধ্যে বাড়িওয়ালা দুই লাখ ৪১ হাজার ৫০৭ জন, ভাড়াটিয়া ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯৪ জন, মেস সদস্য এক লাখ ২১ হাজার ৪০ জন, পরিবারের সদস্য ৩১ লাখ ৬৬ হাজার ৮২১ জন, চালক ও গৃহকর্মী আট লাখ ৮৩ হাজার ৯৮৪ জন রয়েছেন।


বিবার্তা/খলিল/উজ্জ্বল/জাহিদ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com