ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও সাধারণে অতিসাধারণ শেখ রেহানা
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৩৪
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও সাধারণে অতিসাধারণ শেখ রেহানা
ডা. মুরাদ হাসান
প্রিন্ট অ-অ+

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের কনিষ্ঠকন্যা শেখ হাসিনা।বঙ্গবন্ধু পরিবারে তিনি চতুর্থ সন্তান। বাংলাদেশের চারবারের সফল প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার অতি আদরের ছোট বোন তিনি। ১৯৫৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ রেহানা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি ‘ছোট আপা’ হিসেবে পরিচিত।


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বড় বোন শেখ হাসিনার সাথে তাঁর স্বামীর কর্মস্থল জার্মানিতে বেড়াতে যাওয়ার কারণে ঘাতকের বুলেট থেকে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। তা না হলে হয়ত তাঁকেও তাঁর বাবা-মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের মত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হতো। ‘৭৫ এর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বাবা-মা স্বজনহারা দুইবোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। এরপর শেখ রেহানা ভারত থেকে লন্ডনে চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন আর তাঁর বড় বোন শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুর দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাল ধরেন।



রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে হিসেবে এবং সুযোগ থাকার পরও সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বড় পদে আসীন হয় নাই তিনি। তাঁকে একজন প্রচারবিমুখ, নিভৃতচারী মানুষই বলা যায়। তিনি তাঁর বড় বোন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় ভরসার জায়গা। বড় বোনের সকল কাজের প্রেরণার উৎস আর সংকটে পরামর্শদাতা ও পথপ্রদর্শক হিসেবে তিনি সবসময় পাশে থাকেন।



বঙ্গবন্ধু যেমন সারাজীবন শুধু মানুষের কথা চিন্তা করেছেন, তাদের মুক্তির গান গেয়েছেন, তেমনি এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর সেই অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে এদেশের মানুষের জন্য কাজ করছেন তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা। একজন কাজ করে যাচ্ছেন জীবন বাজি রেখে পর্দার সামনে, অপরজন পর্দার অন্তরালে থেকে বোনকে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়ে, উৎসাহ দিচ্ছেন। যেমনটি পেয়েছিল বাঙালি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাছ থেকে। জাতীয় জীবনে নানা সময়ের নানা সংকট বা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সবসময় বোনের পাশে অতীতে যেমন ছিলেন এবং এখনও আছেন বঙ্গবন্ধুর ছোটকন্যা শেখ রেহানা।



প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছায়াসঙ্গী হিসেবে নীরবেই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর বিভিন্ন ছবিতে যে স্নেহ ও ভালবাসার নিদর্শন মেলে তাতে কখনও কখনও মনে হয় বড় বোনকে ছাপিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেন মায়ের মমতায় আগলে রাখেন তাঁর প্রাণপ্রিয় ছোট বোনকে। আরেকটা বিষয় রাজনৈতিক মহলে বেশ প্রচলিত তা হলো- মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে দুর্বল জায়গা তাঁর ছোট বোন। ছোট বোনের কোন আব্দার বা কথাই তিনি ফেলতে পারেন না। বড় বোনের কাছে এতোটা প্রাধান্য পাওয়ার পরেও এবং রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও নির্মোহ শেখ রেহানা সবসময়ই অন্তরালেই থেকেছেন।



ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও শেখ রেহানা একজন সৎ, একজন সংগ্রামী মানুষ, অতি সাধারণ জীবনযাপন তাঁর। প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন, কিন্তু নিরহংকারী সাদাসিধে সাধারণ বেশভুষা, সাধারণ জীবন তাঁর। নিজে চাকুরি করে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছেন, বুঝিয়েছেন জীবনবোধ। সংগ্রাম করেছেন জীবনের প্রতিটি স্তরে। এইজন্যই মা হিসেবেও তিনি স্বার্থক। তাঁর তিনজন সন্তানের বায়োডাটা ও কর্মজীবন দেখলে সে স্বার্থকতার সত্যতা মেলে। নিরহংকারের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ শেখ রেহানা। তার বড়বোন এই বাংলাদেশের চারবারের প্রধানমন্ত্রী অথচ তাঁর আচরণে কোনো অহমিকা বা দাম্ভিকতার ছাপ নেই। পাবলিক গাড়িতে করে নিজের অফিসে আসা-যাওয়ার খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে সারাদেশের মানুষ তা অবগত আছেন। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত যে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক তাঁদের যেকোন সমস্যায় সহযোগীতার জন্য শেখ রেহানার কাছে সহজেই যেতে পারেন।



কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহের দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি উদাহরণ হয়ে থাকবেন। একবার ভাবা যায়, নিজের বোন প্রধানমন্ত্রী অথচ তিনি অন্যের অফিসে কাজ করেন। সততার এমন দৃষ্টান্ত সত্যিই এ যুগে বিরল। তাঁর নির্মোহতার পরিচয় মেলে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ২০০ কোটি টাকা মূল্যমানের ঢাকার ধানমন্ডির ৬ নম্বর রোডের ২১ নম্বর বাড়িটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের জন্য তিনি উৎসর্গ করেন। এছাড়াও বড় বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িটি স্মৃতি জাদুঘর করে দেশের জনগণের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছেন শেখ রেহানা।


মানবিক মানুষ হিসেবও তিনি অনন্য, সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকলেও নানা ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি মানুষের জন্য কাজ করে থাকেন। আসলে ‘রক্ত কথা বলে’- জাতির পিতার রক্তের উত্তরসূরি তিনি, কাজেই মানুষের জন্য কিছু করার তাড়না তাঁর জ্বিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই পেয়েছেন।


মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলের পাশে থেকেছেন এবং সংকটকালে কাণ্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তিনি একাধিকবার। বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি অনন্য ভূমিকা রাখেন। সেসময় শেখ হাসিনার মুক্তির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও জনমত তৈরী করতে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।


এছাড়াও ১৯৭৯ সালে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত সর্ব ইউরোপীয় বাকশালের এক সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। শেখ হাসিনা তখন রাজনৈতিক আশ্রয়ে ভারতে অবস্থান করছিলেন। ভারত থেকে সুইডেন পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলো না বলে শেখ হাসিনার পক্ষে ছোট বোন শেখ রেহানা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে এরকম একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথম বক্তব্য প্রদান করেন। এ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনিই প্রথম বিশ্ববাসীর কাছে ‘৭৫ এর নির্মম-ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবী করেন। এখানেও তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার ছাপ পাওয়া যায়।


পরিশেষে বলব, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক জ্ঞান-প্রজ্ঞা থাকার পরেও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ রাজনীতিকে ক্ষমতা বা অর্থ বিত্ত ইনকামের হাতিয়ার মনে না করে তিনি সাধারণ-সরল জীবনযাপন করেন। আমরা যারা রাজনীতিতে সক্রিয় তাঁরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনাচরণকে অনুসরণের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠকন্যা, আমাদের ছোট আপা শেখ রেহানার জীবনদর্শন অনুসরণ করলেও আমরা নতুন জীবনবোধের দেখা পাব যা আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে পাথেয় হয়ে থাকবে।


“জন্মদিনে আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।”


লেখক: ডা. মুরাদ হাসান, সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com