বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খুনিরা '৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছিল
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২২, ১৯:২৩
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খুনিরা '৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছিল
ডা. মুরাদ হাসান
প্রিন্ট অ-অ+

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটায় আক্রান্ত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগার ৩২ নম্বরের বাড়িটি। চারদিক থেকে বৃষ্টির মতো গুলির আওয়াজ। বাড়িটি তখনও জেগে ওঠেনি, সপরিবার ঘুমিয়ে ছিলেন বাঙালির জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।



গুলির আওয়াজ শুনে বঙ্গবন্ধু দোতলার শোবার ঘর থেকে নেমে আসেন নিচতলার অভ্যর্থনা কক্ষে। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মহিতুল ইসলাম টেলিফোনে তখন বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। পুলিশ কন্ট্রোল রুম,সেনা সদরদপ্তর ও গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টার একপর্যায়ে মহিতুলের কাছ থেকে রিসিভার টেনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই চেষ্টা করতে থাকেন।



ভোর তখন প্রায় ৫টা ৫০ মিনিট। বঙ্গবন্ধুর দোতলার শোবার ঘরে আর বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ঘাতকরা। দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসতেই বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ফেলে ঘাতকরা। নামিয়ে আনতে থাকে নিচে। সিঁড়ির মুখে মেজর হুদাকে দেখে বঙ্গবন্ধু চিৎকার করে ওঠেন, ‘তোরা কী চাস? তোরা কি আমাকে মারতে চাস?’ মেজর হুদা বলে, ‘আমি আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি?’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তুই আমাকে মারতে চাস? কামাল কোথায়? তোরা কামালকে কী করেছিস?’ উত্তরে হুদা বলে, ‘স্যার, কামাল তার জায়গায়ই আছে। আর আপনি তুই তুই করে বলবেন না। আপনি বন্দি। চলুন।’



এবার গর্জে উঠলেন বঙ্গবন্ধু ‘কী, তোদের এত সাহস! পাকিস্তান আর্মিরা আমাকে মারতে পারেনি। আমি বাঙালি জাতিকে ভালোবাসি। বাঙালি আমাকে ভালোবাসে। কেউ আমাকে মারতে পারে না।’




সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে দাঁড়াতেই সিঁড়ির নিচে অবস্থান নেয় বজলুল হুদা ও মেজর নূর। নূর কিছু একটা বললে সরে দাঁড়ায় মহিউদ্দিন। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে হুদা ও নূরের হাতের স্টেনগান। আঠারটি গুলি ঝাঁজরা করে বঙ্গবন্ধুর বুক ও পেট। বিশালদেহী মানুষটি ধপাস করে পড়ে যান সিঁড়ির ওপর। বঙ্গবন্ধু তখন মৃত। তার বুকের রক্তে ভেসে যায় সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকা সেই রক্তস্রোত গিয়ে মিশে বঙ্গোপসাগরে।


১৯৭৫ সালের সেই কালো সকালের ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপে বর্ণনা করলে এমনই ছিল। আমরা যারা সেইসময় সদ্য জন্মগ্রহণ করেছিলাম বা পরবর্তীতে যারা জন্মগ্রহণ করেছে বিভিন্ন বইতে লেখা '৭৫ সালের সেই সকালের এমন চিত্রই দেখতে পেয়েছি।



জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চারিত শেষ লাইনগুলো বিভিন্ন বইয়ের পৃষ্ঠায় কালো অক্ষরে বিন্যস্ত হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু’র শেষ উচ্চারিত লাইনগুলো পড়ার সময় আমার মানসপটে একটি ‘বিস্মিত চোখ’ ভেসে ওঠে। যে চোখে ছিল অপার বিস্ময়, অবিশ্বাস আর এই জাতির প্রতি গভীর করুণা। বিস্ময় ছিল এটা কী করে সম্ভব? যে জাতিকে স্বাধীন করতে ৪৬৮২ দিন কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে পার করেছেন তারা তাঁর দিকে বন্দুক তাক করে আছেন? বঙ্গবন্ধু নিজের চোখের বিশ্বাস করতে পারেন নাই, কথোপকথনের শেষ পর্যায়ে নিশ্চয় তাঁর এই জাতির করুণা হয়েছিল। নিজের অজান্তেই জাতির পিতা আমাদের অভিশাপ দিয়েছিলেন কি না তাও মাঝে মাঝে মনে হয়।



'৭৫-এর এই কালো অধ্যায়ের পর জাতি হিসাবে আমরা সারাবিশ্বে বীরের জাতির পাশাপাশি বেইমানের জাত বলেও পরিচিতি পাই। বিশ্বে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের অন্যতমগুলো হলো ভারতের মহাত্মা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, চিলির সালভাদর আলেন্দে, যুক্তরাষ্ট্রের আব্রাহাম লিংকন, মার্টিন লুথার কিং ও জন এফ কেনেডি, মিয়ানমারের জেনারেল অং সান ও সিংহলের প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দর নায়েক, ঘানার নক্রুমা, ইন্দোনেশিয়ার আনোয়ার সাদাতসহ আরও অনেকে।


কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে ছাড়িয়ে যেটি সবচেয়ে বর্বরোচিত সেটি হচ্ছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যদেরকে হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ড থেকে বাদ যায়নি নারী এমনকি শিশুও, মানবতাবিরোধী অপরাধের চরমতম পর্যায়। এটি কোনো ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড বলা যায় না, এটি হচ্ছে সদ্য স্বাধীন একটি দেশকে তার পূর্বের ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য এবং এই জাতিসত্তা যার হাত ধরে বিশ্বে প্রকাশ পেয়েছে সেই জাতিসত্তার পরিচয় মুছে ফেলার জন্য এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। তাই এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়,এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বের বুক থেকে একটি জাতিগোষ্ঠী ও জাতিসত্তার সমূলে ধ্বংস করার অপপ্রয়াস ছিল। এটি আরও পরিষ্কার হয় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এই হত্যার মাস্টারমাইন্ড ও পরবর্তী সুবিধাভোগী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।



হত্যাকারীরা শুধুইবঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারত। মূলত তাদের লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু নয়, তাদের লক্ষ্য আরও সুদূর পরাহত ছিল। তারা ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীন হওয়া বাঙালির ওপর তাদের মূল ক্ষোভ ছিল। তাই তারা চায়নি বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ বেঁচে থাকুক। থাকলে এই রক্ত মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেই। এজন্য এই হত্যাকাণ্ড ছিল বিশ্বের বুকে নজিরবিহীন ঘটনা।



বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করা শুধু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ছিল না, এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে খুনিরা মূলত তাদের '৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছিল। স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিনবছরে ধ্বংসস্তুপমস একটি দেশকে বঙ্গবন্ধু যেভাবে চালিত করেছিলেন তা খুনীদের চক্ষুশুল ছিল। জাতির পিতাকে হত্যা করার পর থেমে যায় উন্নয়নের চাকা, দেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। জাতির ভাগ্যাকাশ ছেয়ে যায় কালো মেঘে। দীর্ঘদিন এই দেশ পরিচালিত হয় ঘাতক-খুনী ও তাদের দোসরদের মাধ্যমে। খুনীরা দেশের ও দেশের মানুষের উন্নয়নের চেয়ে তাদরে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগী ছিল।



পৃথিবীতে যুগে যুগে বহু ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের উদয় ঘটেছে। এদের মধ্যে যারা তাদের সংগ্রামের ফসল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন একটি রাষ্ট্র, একটি জাতিসত্তা। আমাদের ইতিহাসের মহানায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যিনি মানবের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। যতদিন এই দেশ, মানচিত্র, ভাষা ও জাতিসত্ত্বা থাকবে ততদিন বাঙালির মানসপটে তিনি অম্লান হয়ে থাকবেন।


লেখক: ডা. মুরাদ হাসান, সংসদ সদস্য।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com