বিএনপির ফাঁদে পা দেবে না আওয়ামী লীগ
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:০৬
বিএনপির ফাঁদে পা দেবে না আওয়ামী লীগ
সোহেল আহমদ
প্রিন্ট অ-অ+

রাজপথ দখলে নেয়ার ঘোষণা দিয়ে রাজধানীতে টানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি। চলতি মাসের ১১ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর ১৬টি স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছে দলটি। এসব প্রতিবাদ সভা, মিছিলে বাঁশ, লাঠি নিয়ে অংশ নিচ্ছেন দলটির নেতা-কর্মীরা। এর পাশাপাশি দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা ছোট লাঠিতে না হলে মোটা মোটা বাঁশের লাঠি নিয়ে রাস্তায় নামার জন্য দলের নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্যে আহবান জানাচ্ছেন।


দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১৫ মাস আগে বিএনপির এমন কার্যক্রমকে মোটেই হালকাভাবে নিচ্ছে না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বিএনপি নেতা-কর্মীদের হাতে লাঠি, বাঁশ ও রড নিয়ে অংশগ্রহণ সহিংসতার উপাদান হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। দলটির নেতারা বলছেন, বিএনপি পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করে নৈরাজ্য এবং গণতন্ত্রের পরিবেশকে নষ্ট করতে চায়। উসকানি দিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায়। নির্বাচন বানচাল করার পাশাপাশি অরাজক পরিবেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে দেশকে ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যেতে চায়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য বলেছেন, সেই চেষ্টাকরা হবে।



এদিকে বিএনপির এসব কর্মসূচির বিপরীতে রাজধানীতে থানাভিত্তিক শান্তি সমাবেশ ও মিছিল কর্মসূচি পালন করছে আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে দলটির সহযোগী সংগঠনগুলোও।



জানা যায়, জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং পুলিশের গুলিতে দলের তিন কর্মী নিহতের প্রতিবাদ ও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজধানীতে টানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বনানীতে মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ইট-পাটকেল, লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন বিএনপির নেতারা। হামলায় বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়ালসহ একাধিক নেতা আহত হয়েছেন বলে জানায় বিএনপি। এরপর থেকে রাজধানী ঢাকার প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলোতে বাঁশ, লাঠি, রড হাতে নিয়ে হাজির হচ্ছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।


বিএনপির পক্ষ থেকে হামলার অভিযোগ করা হলেও আওয়ামী লীগ নেতারা এধরণের অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, বিএনপির নেতা-কর্মীরা নিজেরা মারামারি করে আওয়ামী লীগের ঘাড়ে দোষ চাপায়। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ বাধা দেয় না। এছাড়া শেখ হাসিনা কোনো দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা না দেয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।


ক্ষমতাসীন দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হচ্ছে না। বিএনপি নিজেরা মারামারি করে মিথ্যাচার ও অভিযোগের রাজনীতি করছে। বিএনপি দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়। দেশকে অস্থিতিশীল করে অসাংবিধানিক সরকার আনতে চায়।


গত ১৯ সেপ্টেম্বর মহাখালীর ওয়্যারলেস গেইট এলাকার কর্মসূচিতে বিএনপির কর্মীরা বাঁশ, লাঠি নিয়ে আসেন। এছাড়া ২১ সেপ্টেম্বর মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনে ঢাকা মহানগর উত্তর (মিরপুর জোন) প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও বাঁশ, লাঠি, রড হাতে নিয়ে অংশ নিয়েছেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। এই সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, শেখ হাসিনার সরকার যেখানে ক্ষমতায়, সেখানে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিয়ে কি কিছু হবে? আজকে আপনারা পতাকা বাঁধা ছোট ছোট লাঠি নিয়ে এসেছেন। পুলিশ সেই লাঠি নিয়ে নিতে চেয়েছিল। আপনারা দেন নাই। এর পরে মোটা মোটা বাঁশের লাঠি নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে।


জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন বিবার্তাকে বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, সম্প্রতি বিএনপির মিছিল, সমাবেশে লাঠি, কাঠ ও বাঁশ এর মধ্যে জাতীয় পতাকার মতো পবিত্র জিনিসকে সংযুক্ত করে নেতা-কর্মীরা জড়ো হচ্ছে। মিছিল থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উপর আক্রমণ করার জন্যই তারা এগুলো করছে। তারা উসকানি দিচ্ছে। দেশকে অস্থিতিশীল করে তারা ফায়দা লুটতে চায়।


তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল। দেশে যেকোনো রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ, প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে তার জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। বিগত নির্বাচনের আগেও বিএনপি সন্ত্রাস করেছে, নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। এবারও তারা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।



অতীতে মানুষ বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচি দেখেছে। জনগণই তাদের প্রতিহত করবে। ভোটেও মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে- বলে মন্তব্য করেন তিনি।



গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে বিএনপির ঢাকা উত্তরের মিছিলে হামলার অভিযোগে আওয়ামী লীগের প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদারসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে বিএনপি। মামলায় কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা, আগা খান মিন্টু, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ মান্নান কচি, ইসমাইল হোসেনসহ ২০ জন। এছাড়া মামলার আবেদনে আরো চার-পাঁচশ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। যদিও পরে মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।


ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি বিবার্তাকে বলেন, বিএনপি একটি অগণতান্ত্রিক দল। তারা অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় এসেছিল। তারা শুধু ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য যত ধরনের সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, জুলুম-অত্যাচার করা যায় তার সব বিরোধীদলের উপর করেছে। আমাদের দল এখন ক্ষমতায়, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। সভা, সমাবেশ করার অধিকার সবার আছে। তারা সেই সুযোগে বিভিন্ন রকমের আগ্নেয়াস্ত্র নিয়েও প্রকাশ্যে মিছিল, সমাবেশ করছে।


তিনি বলেন, আমাদের কথা হল আমাদের সমস্ত কিছুই জনগণের জন্য, জনগণ আমাদের সাথে আছে। আমরা গণতান্ত্রিক ভাবে তাদেরকে রাজপথে মোকাবেলা করব। কোনো নৈরাজ্য, সন্ত্রাসী কার্যক্রম করলে, জনগণের সম্পদ ধ্বংস করলে জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা গণতান্ত্রিক ভাবে তাদের মোকাবেলা করব।


এস এম মান্নান কচি বলেন, বিএনপি পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করে নৈরাজ্য এবং গণতন্ত্রের পরিবেশকে নষ্ট করতে চায়। আমরা লাঠি, বাঁশ দিয়ে তাদের মোকাবেলা করব না। আমরা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে হোক আমরা গণতন্ত্রকে নস্যাৎ হতে দিব না। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সুন্দর পরিবেশ, গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য বলেছেন। আমরা সেটাই চেষ্টা করব।


আন্দোলনের নামে রাজপথে সহিংসতা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিবে। তবে আন্দোলনের নামে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের দিকে কেউ চড়াও হলে দলের নেতা-কর্মীদের আত্মরক্ষার দায়িত্ব আছে বলে মনে করেন আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ নবী নেওয়াজ।


তিনি বিবার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা পৃথিবীব্যাপী প্রশংসা অর্জন করছে। সেই মুহূর্তে বিএনপি দেশে অরাজকতা করতে চায়। অরাজক পরিবেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে দেশকে ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যেতে চায়। বিএনপি কোনো কর্মসূচি দিলে মানুষ আতঙ্কে থাকে। তারা ছোট থেকে শুরু করে বড় ধরণের আঘাত করতে পারে। পুলিশের মাথা থেঁতলে দিতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। তাদের এধরণের রেকর্ড আছে, অতীতে তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা তাদের চরিত্র আবার দেখাতে চায়।


সাবেক এই এমপি বলেন, বিরোধী দলে থাকতে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন হরতাল, মানববন্ধন করেছি, লংমার্চ করেছি। এসব শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি মানুষ ভুলে যাচ্ছে। কারণ ২০১৩-২০১৪ সাল থেকে পেট্রোল বোমা আবিষ্কার করেছে, মানুষের গায়ে আগুন দিয়েছে। বিএনপির আতঙ্ক সৃষ্টির রাজনীতি সম্পর্কে মানুষের ধারণা আছে। যার ফলে মানুষ আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখতে চায়। মানুষ তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে রেহাই পেতে চায়।


চলতি মাসের শুরু থেকেই রাজধানীর পৃথক স্থানে সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবলীগ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নবী নেওয়াজ বলেন, আমরা নেতা-কর্মীদেরকে রাজপথে রাখতে চাই, যাতে করে কেউ দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে না পারে। যারা দেশে শান্তি চায় না, ভালো চায় না, উন্নয়ন চায় না- তাদেরকে অন্ততপক্ষে সন্ত্রাসী কার্যক্রম থেকে দূরে রাখার জন্য আমরা নিয়মিত কর্মসূচি দিচ্ছি। আমরা আমাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে চাই।


বিবার্তা/সোহেল/রোমেল/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com