ধর্মান্ধদের সাথে আপস আওয়ামী লীগের সর্বনাশ ডেকে আনবে
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২২, ০৮:৪০
ধর্মান্ধদের সাথে আপস আওয়ামী লীগের সর্বনাশ ডেকে আনবে
বাণী ইয়াসমিন হাসি
প্রিন্ট অ-অ+

'৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিছক একটি ভূখণ্ড লাভ কিংবা পতাকা বদলের জন্য হয়নি। নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধ ছিল প্রকৃত অর্থেই মুক্তিযুদ্ধ। দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষ এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন সার্বিক মুক্তির আশায়। জনগণের এই আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়েছিল ’৭২-এর সংবিধানে।


বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের দর্পণ ’৭২-এর সংবিধান। এই সংবিধান কার্যকর থাকলে বাংলাদেশে আজ ধর্মের নামে এত নির্যাতন, হানাহানি, সন্ত্রাস, আগুন, রক্তপাত হতো না। বাংলাদেশের ৫০ বছর এবং পাকিস্তানের ৭৪ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যাবতীয় গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসের জন্য দায়ী জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সমগোত্রীয় মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক দলগুলো, যা তারা করছে ধর্মের দোহাই দিয়ে।


বঙ্গবন্ধু যে সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন, তাতেই তিনি আমাদের মাতৃভূমিকে 'সোনার বাংলায়' রূপান্তরিত করে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক তৎপরতা এবং দেশ পুনর্নির্মাণে ব্যস্ত বঙ্গবন্ধু সবকিছুর সঙ্গে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধার, চর্চা এবং দেশ ও বিদেশে উপস্থাপনার উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে রূপান্তরিত করলেন ১৯৭৪ সালে। তিনি চেয়েছিলেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতিকে যথার্থরূপে তুলে ধরে তাকে সমৃদ্ধ করার জন্য। দেশের সর্বত্র এই শিল্পকলা চর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই এ ধরনের সংস্কৃতি কেন্দ্র জেলায় জেলায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কার্যক্রমও গ্রহণ করেছিলেন।


কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর সেই কর্মচাঞ্চল্য একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর তারপর থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এইচএম এরশাদ রাষ্ট্র পরিচালনায় যে সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে গেছেন তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, তাতে রাজনীতির পাশাপাশি সংস্কৃতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর বহুমুখী বিরূপ প্রভাব সমাজে পরিলক্ষিত হতে থাকে। এ ক্ষেত্রে চরম অবহেলা দেখা যায় এবং এ কারণেই এই শাখার কোনো উন্নতি সামরিক শাসনের সময় হয়নি।


বিএনপি শাসনামলে খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও তাঁর সমন্বয় কমিটিকে যেভাবে হেনস্তা করতে চেয়েছিলেন তাতে বাংলার মাটিতে উদার গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি বাধাগ্রস্ত হলো পুনর্বার। তাই আমরা দেখেছি সংস্কৃতি অঙ্গনকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে যে ধরনের রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও অর্থ বরাদ্দ দেওয়া উচিত ছিল, তা আদৌ হয়নি সেই সময়ে।


আমাদের সংস্কৃতিকে শুধু রক্ষাই নয়, এর ব্যাপক প্রসারে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। সব অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে সামাজিক অনাচার ও নানা দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশের মানুষকে জাগ্রত করার জন্য দরকার একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ। জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাসী তৎপরতা, সামাজিক নানা দুষ্কর্ম এবং নানা ধরনের বিকারগ্রস্ত মানসিকতা থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য সংস্কৃতির বিকাশ ও চর্চার কোনো বিকল্প নেই, এ কথা সবাইকে মনে রাখতে হবে। আমাদের সংস্কৃতির যে পুষ্টধারা সেটার সঠিক চর্চাই পারে সব অন্ধকার দূর করে আলোর সন্ধান দিতে।


আগে গ্রামে যেসব নির্মল বিনোদন ব্যবস্থা যেমন গ্রামীণ খেলা, যাত্রাপালা, জারি-সারি গান, নৌকাবাইচ, পুঁথিপাঠের আয়োজন ছিল কালের পরিক্রমায় সেগুলো আজ নির্বাসিত। এখন গ্রামীণ মেলা বলতেই যেখানে মদ ও জুয়ার আসর বোঝায়। মেলাকে সেই জায়গা থেকে উদ্ধার করতে হবে। যাত্রামঞ্চকে করতে হবে শালীন ও কলুষতামুক্ত। গ্রামে গ্রামে গড়ে তুলতে হবে সংস্কৃতি চর্চার এক একটি শক্তিশালী কেন্দ্র। সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করবে কিন্তু আয়োজনগুলো চলবে স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। ভাটি অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে যখন থাকে অখণ্ড অবসর সেই সময়ে গ্রামে গ্রামে সংস্কৃতিকেন্দ্রগুলো যাতে সরব হতে পারে সেজন্য নিতে হবে পরিকল্পনা। একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সাংস্কৃতিক জাগরণ যখন ঘটবে তখন খারাপ বহু উপসর্গ সমাজদেহ থেকে দূর হয়ে যাবে।


২৪ মার্চে কেউ কিন্তু আন্দাজও করতে পারেনি হায়েনার দল ২৫ মার্চের কালো রাতে কী অঘটন ঘটাতে যাচ্ছে। ১৪ আগস্টও কারো কল্পনায়ও ছিল না এত বড় আঘাত বাঙালির জন্য অপেক্ষা করছে। সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ রইলো, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বা ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করার এটাই মোক্ষম সময়। দেশকে উলটোপথে নিয়ে যাওয়ার সকল রাস্তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিন। লোহা গরম থাকতে থাকতেই বাঁকাতে হয়। এখন সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে— বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন/দর্শন নাকি অন্ধকারের পথে হাঁটা ?


সব সহিংসতার স্থায়ী মূলোৎপাটনের দিকে আরো গভীরভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন এখন। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করা হোক; ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য বাধ্যতামূলক করা হোক। পাশাপাশি জাতীয় সংগীত গাওয়া এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন বাধ্যতামূলক করা হোক। সাপের লেজ পর্যন্ত বিনাশ নিশ্চিত করা হোক।


এদেশের সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। এ পর্যন্ত যত জায়গায় সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে কোথাও কিন্তু বিএনপি জামাতের জনপ্রতিনিধি নেই। দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দিন দিন সাম্প্রদায়িকতার দিকেই আগাচ্ছে। গত ১৪ বছরে দেশের সংস্কৃতি উল্টো পথে হাঁটছে। খুব সূক্ষভাবে গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। জারি সারি, ভাটিয়ালি, যাত্রাপালা, লাঠি খেলা, পালাগান সব হারিয়ে গেছে। আবহমানকাল ধরে চলে আসা যে বাঙালি সংস্কৃতি সেটাকে পরিকল্পিতভাবেই মেরে ফেলা হয়েছে। তাই তো ধর্মের নামে অধর্মের এতটা আস্ফালন। শান্তির ধর্ম ইসলাম অন্যের জানমালের ক্ষতিকে বরদাশত করে না। এভাবে বেহেশত পাওয়া যায় না।


নড়াইল জেলাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অপরাজেয় দূর্গ হিসেবেই জেনে এসেছি এতকাল। জননেত্রী শেখ হাসিনা একবার নড়াইলের সংসদীয় আসন থেকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। সেই নড়াইলে কীভাবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে বা ঘটতে দেয়া হয়? এমন একটা জায়গা আগলে না রাখতে পারার ব্যর্থতা কাদের? সর্ষের ভিতরেই কি তাহলে ভূত ঢুকে পড়েছে?


আওয়ামী লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা হেফাজত লীগের ব্যাপারেও সোচ্চার হতে হবে। অনেকে মনে করেন তৃণমূলের চাপের কারণে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকের হেফাজত প্রীতি থাকলেও সেটা নিয়ে নেগোসিয়েশনের সাহস করেননি। মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের সাথে ‘আপস’ শব্দটা ঠিক যায় না। কর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। বরং আপসহীন আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। সকল প্রকার ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে অবস্থান অসাম্প্রদায়িক মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগকে আরো জনপ্রিয় করবে। ধর্মান্ধদের সাথে আপস বাংলাদেশকে অনিরাপদ করছে। আর এই আপস আওয়ামী লীগের সর্বনাশ ডেকে আনবে।


লেখক: বাণী ইয়াসমিন হাসি, সম্পাদক, বিবার্তা২৪ডটনেট ও পরিচালক, জাগরণ টিভি।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com